টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ফরাসি ক্রীড়ার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছে প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ (পিএসজি)। ৩০ মে বুদাপেস্টে ইংল্যান্ডের আর্সেনালের বিরুদ্ধে জয় ছিল নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ ক্রীড়া কৃতিত্ব। ১৯৯২ সালে ইউরোপিয়ান কাপের নাম বদলে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হওয়ার পর থেকে শুধুমাত্র জিনেদিন জিদানের অধীনে রিয়াল মাদ্রিদই পরপর একাধিকবার এই শিরোপা জিততে পেরেছিল। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তারা টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে পিএসজির এই সাফল্য ফরাসি ফুটবলের জন্য এক বিরাট প্রাপ্তি, বিশেষত এমন সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি।
ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর প্যারিসের রাস্তাঘাট এবং গোটা ফ্রান্সে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, কিংবা পরদিন প্যারিসের শঁ-দ্য-মার্সে খেলোয়াড়দের অভ্যর্থনা জানাতে যে জনসমুদ্র জমেছিল, তা এই শিরোপার গুরুত্বই তুলে ধরে। কিন্তু ২০২৫ সালের আগের শিরোপা জয়ের সময়ের তুলনায় আরও বিস্তৃত সহিংসতা উদ্যাপনকে ম্লান করে দেয়। রবিবার সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ জানান, একজন নিহত হয়েছেন, শত শত মানুষ আহত হয়েছেন এবং ৭৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ৪৫৭ জনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বড় কোনও ক্রীড়া সাফল্যের পর—বিশেষত পিএসজিকে ঘিরে—এ ধরনের সহিংসতা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
তবে লুইস এনরিকের দলের সাফল্য ফুটবলের আরেকটি বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারে না—খেলাটির অতিরিক্ত আর্থিকীকরণ। সত্যি বলতে, স্প্যানিশ কোচ এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন যেখানে ব্যক্তিগত তারকাখ্যাতি নয়, বরং সমষ্টিগত শক্তিই মুখ্য। এটি ২০১১ সালে কাতারের মালিকানায় যাওয়ার পর পিএসজির সেই পুরনো নীতির থেকে আলাদা, যখন বিশ্বের বড় বড় তারকাদের একত্র করা ছিল ক্লাবটির প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু এনরিকেরও সুবিধা ছিল এমন এক মালিকের, যার আর্থিক সামর্থ্যের কার্যত কোনও সীমা নেই। ২০১১ সাল থেকে পিএসজিতে ঢালা হয়েছে ১৪০ কোটি ইউরো। ফলে ফরাসি লিগের ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে এবং কয়েক বছর ধরেই লিগ আঁ-র প্রতিযোগিতা প্যারিসের ক্লাবটির কাছে প্রায় গৌণ হয়ে পড়েছে।
বাজেটের বৈষম্য চোখে পড়ার মতো। ২০২৫-২৬ মৌসুমে পিএসজির বাজেট ছিল ৮৫ কোটি ইউরো—যা লিগ আঁ-র সবচেয়ে দরিদ্র ক্লাব আঁজে বা ল্য আভরের বাজেটের ৩৪ গুণ। দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজেট ছিল অলিম্পিক মার্সেইয়ের, যা ক্রীড়া দৈনিক ল’একিপ-এর হিসাবে প্রায় ২৬ কোটি ইউরো। এমন বিপুল আর্থিক অসমতা প্রতি মৌসুমে প্রতিযোগিতার রোমাঞ্চকে হত্যা করে এবং জাতীয় লিগের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ সম্প্রচারকারীরাও আগ্রহ হারায় এবং টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য কমে যায়। অথচ ফরাসি ফুটবলের অর্থনৈতিক কাঠামো এই সম্প্রচারস্বত্বের উপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল।
আসলে পিএসজির আধিপত্য কোনও বিচ্ছিন্ন বা শুধুমাত্র ফরাসি ঘটনা নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের বৃহত্তর এক বিবর্তনের প্রতিফলন। ১৯৯৫ সালে ইউরোপীয় বিচার আদালতের ঐতিহাসিক ‘বসম্যান রায়’ খেলোয়াড়দের চুক্তির মেয়াদ শেষে স্বাধীনভাবে ক্লাব বদলের অধিকার দেয় এবং ইউরোপজুড়ে তাঁদের অবাধ চলাচলের পথ খুলে দেয়। ধনী ক্লাবগুলো সঙ্গে সঙ্গেই এই সুযোগ কাজে লাগায়। তারা ক্রমাগত বেশি অর্থ ব্যয় করে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের দলে টানতে শুরু করে, যার ফলে ফুটবল ক্রমে আরও জল্পনামূলক ও অর্থনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে পিএসজির যেসব প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হয়—রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার সিটি বা লিভারপুল—তাদের আর্থিক সামর্থ্যও প্যারিসের ক্লাবটির সমকক্ষ। প্রতি বছর নরওয়ের বোদো/গ্লিম্ট বা পর্তুগালের স্পোর্তিংয়ের মতো কিছু অপ্রত্যাশিত দল চমক দেখালেও, তা প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভারসাম্য বদলাতে পারে না। যেসব ক্লাবের সম্পদ বেশি, তাদের ক্রীড়া সাফল্যও সাধারণত বেশি। ফলে যে প্রতিযোগিতাকে উন্মুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা ক্রমশ পরিণত হয়েছে অতি-ধনীদের এক বদ্ধ অভিজাত ক্লাবে।