বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব অন্য যেকোনো ফুটবল প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি। ক্লাব ফুটবলে একটি খারাপ ম্যাচ কয়েক দিনের মধ্যেই ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বকাপে একটি ভুল বা একটি গোল দশকের পর দশক ধরে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে। তাই স্পেন-ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার মতো সেমিফাইনাল শুধু দুই দলের লড়াই নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি, গৌরব ও মানসিকতারও সংঘর্ষ।
বিশ্বকাপের ম্যাচের গুরুত্ব অন্য যেকোনো ফুটবল ম্যাচের চেয়ে আলাদা। ইংল্যান্ড এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে মাত্র ৮০টি ম্যাচ খেলেছে। অর্থাৎ ১৯৫০ সালে প্রথম অংশ নেওয়ার পর ৭৬ বছরে যত বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছে, তা প্রিমিয়ার লিগের মাত্র দুই মৌসুমের সামান্য বেশি। সংখ্যায় কম হলেও এই ম্যাচগুলোর প্রভাব অপরিসীম।
শনিবার নরওয়ের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের জয় যুক্তরাজ্যে ১ কোটি ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ টেলিভিশনে দেখেছেন। ম্যাচ শেষ হতে মধ্যরাত পেরিয়ে গেলেও দর্শকের আগ্রহ কমেনি। শুধু ইংল্যান্ড নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিশ্বকাপের ম্যাচ অন্য যেকোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতার তুলনায় বেশি আলোচিত, বেশি বিশ্লেষিত হয়। এমনকি অনেক সময় এটি ক্রীড়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়। কোটি কোটি মানুষ একই সঙ্গে আশা, উদ্বেগ, উল্লাস ও হতাশা ভাগ করে নেয়। ফলে একটি ম্যাচ জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
বিশ্বকাপের অসংখ্য মুহূর্ত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেফারেন্স হয়ে থাকে। ছয় দশক আগের ম্যাচের প্রসঙ্গ তুললেও অধিকাংশ মানুষ তা বুঝতে পারেন। এই কারণেই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যে ঘটনা একটি লিগ ম্যাচে কয়েক দিনের মধ্যেই বিস্মৃত হয়ে যেত, সেটাই বিশ্বকাপে চিরস্থায়ী পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
বেলজিয়ামের গোলরক্ষক সেনে লামেন্সের ভুল, যার কারণে স্পেনের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে দলটি বিদায় নেয়, তা সাধারণ একটি ক্লাব ম্যাচের তুলনায় বহু গুণ বেশি মানুষের সামনে ঘটেছে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একটি নিয়মিত ম্যাচ যত মানুষ দেখে, তার চেয়েও অনেক বেশি দর্শক এই ভুল প্রত্যক্ষ করেছেন। বিশ্বকাপে কয়েক দিনের মধ্যে আরেকটি ম্যাচ খেলে সেই ভুল ঢেকে দেওয়ার সুযোগও নেই। ফলে এই ভুল তাঁর ক্যারিয়ারের স্থায়ী অধ্যায় হয়ে থাকবে—যদি না ভবিষ্যতের কোনো বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
বিশ্বকাপের বিশেষত্ব এখানেই। ম্যাচ কম, সুযোগ সীমিত, তাই প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব অসীম। এই কারণেই বিশ্বকাপ প্রতি দুই বছর অন্তর আয়োজনের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হওয়াই ভালো হয়েছে। বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে “কমই বেশি”—এই কথাটিই সত্য।
তবে বিশ্বকাপের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি দল শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই খেলে না; তারা নিজেদের অতীতের সঙ্গেও লড়ে। পুরোনো ব্যর্থতা, গৌরব কিংবা অপমানের স্মৃতি বর্তমানকে প্রভাবিত করে। তাই বিশ্বকাপে মানসিক শক্তির গুরুত্ব ক্লাব ফুটবলের তুলনায় অনেক বেশি।
স্পেন এর আগে মাত্র একবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে। ২০১০ সালে তারা জার্মানিকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল। ম্যাচজুড়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দেওয়ার পর ৭৩ মিনিটে কার্লেস পুয়োলের হেডে আসে জয়সূচক গোল। ইউরো ২০০৮-এর আগে দীর্ঘদিন বড় আসরে ব্যর্থতার ইতিহাস থাকা স্পেনের জন্য সেটি ছিল এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
অন্যদিকে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেন অনেক বেশি সফল। তারা ছয়বার সেমিফাইনালে উঠে পাঁচবার জিতেছে এবং পাঁচটি বড় ফাইনালের মধ্যে চারটিতে শিরোপা জিতেছে। অর্থাৎ বড় টুর্নামেন্টের শেষ পর্যায়ে তারা সাধারণত সফল।
তবু অতীতের কিছু ক্ষত রয়ে গেছে। ১৯৮৪ সালের ইউরো ফাইনালে তারা ফ্রান্সের কাছে হেরেছিল। আবার ইউরো ২০০০-এর কোয়ার্টার ফাইনালেও ফ্রান্সের বিপক্ষে ২-১ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় শেষ মুহূর্তে রাউলের পেনাল্টি মিস স্পেনকে বিদায়ের পথ দেখায়। এবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সেই ফ্রান্সই আবার তাদের সামনে।
ফ্রান্সেরও নিজস্ব দুঃস্বপ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল নিয়ে।
১৯৮২ সালের সেভিলের সেমিফাইনাল ফরাসি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক রাত। ম্যাচের এক ঘণ্টা পর বদলি খেলোয়াড় প্যাট্রিক বাতিস্তোঁকে পশ্চিম জার্মানির গোলরক্ষক টনি শুমাখার ভয়াবহভাবে আঘাত করেন। বাতিস্তোঁ অজ্ঞান হয়ে পড়েন, তাঁর চোয়াল, তিনটি পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুটি দাঁত পড়ে যায়।
অতিরিক্ত সময়ে ফ্রান্স ৩-১ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কার্যত একটি বদলি খেলোয়াড় কম থাকায় এবং প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় তারা সেই সুবিধা ধরে রাখতে পারেনি। পশ্চিম জার্মানি সমতা ফেরায় এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম টাইব্রেকারে জিতে ফাইনালে ওঠে। চার বছর পরও সেমিফাইনালে আবার পশ্চিম জার্মানির কাছেই হেরে যায় ফ্রান্স।
যদিও এরপর টানা তিনটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল জিতে ফ্রান্স অনেকটাই সেই স্মৃতি কাটিয়ে উঠেছে, তবু অতীতের ক্ষত কখন যে আবার ফিরে আসে, তা বলা যায় না।
আর ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার ইতিহাস তো আরও গভীর।
১৯৬২ সালে ববি চার্লটনের গোল, ১৯৬৬ সালে আন্তোনিও রাত্তিনের বহিষ্কার, ১৯৮৬ সালের “হ্যান্ড অব গড”, ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড, ২০০২ সালে মাইকেল ওয়েনের বিতর্কিত পতন—প্রতিটি ঘটনাই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করেছে।
দুই দল শেষবার মুখোমুখি হয়েছিল ২০০৫ সালে জেনেভায় একটি প্রীতি ম্যাচে। কিন্তু সেই ম্যাচেও দুই দল যেন প্রীতি ম্যাচ খেলছে, এমন কোনো লক্ষণ ছিল না। হুয়ান রোমান রিকেলমের অনবদ্য খেলায় আর্জেন্টিনা জয়ের পথে থাকলেও শেষ পাঁচ মিনিটে মাইকেল ওয়েনের জোড়া গোলে ইংল্যান্ড নাটকীয় জয় তুলে নেয়।
তখনও ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালের স্মৃতি ছিল একেবারে তাজা। দুই দশক পরে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। প্রিমিয়ার লিগে বহু আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় খেলেছেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধ কিংবা “হ্যান্ড অব গড”-এর ঘটনাও এখন অনেক পুরোনো। ফলে শত্রুতার তীব্রতা হয়তো কিছুটা কমেছে।
তবু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকড় আরও গভীরে। ১৯৫১ সালে দুই দেশের প্রথম সাক্ষাতের আগে আর্জেন্টিনার সংবাদপত্রগুলো ম্যাচটিকে উপস্থাপন করেছিল এমনভাবে, যেন ফুটবলের ছাত্ররা তাদের শিক্ষকের মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ ফুটবল তাদের কাছে এসেছিল ইংল্যান্ড থেকেই। সেই মানসিকতার কিছুটা ছাপ এখনও এই লড়াইয়ে রয়ে গেছে, যদিও সেই “ছাত্ররা” এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা।
ইংল্যান্ডেরও সেমিফাইনাল নিয়ে নিজস্ব বেদনা রয়েছে। ১৯৯০ সালে তুরিনে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে হার, ২০১৮ সালে মস্কোয় ক্রোয়েশিয়ার কাছে এগিয়ে থেকেও পরাজয়—সবই জাতীয় স্মৃতির অংশ।
এবারের বিশ্বকাপে তারা মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে জিতে ১৯৮৬ সালের “হ্যান্ড অব গড”-এর মানসিক ক্ষত অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। এখন তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ—নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনাকে হারানো।