হাইলাইটস:

  • ভারত-সহ ৬০টি অর্থনীতির বিরুদ্ধে নতুন বাণিজ্যিক পদক্ষেপের প্রস্তাব দিল আমেরিকা।
  • অভিযোগ- এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি।
  • ভারতের পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • এখনও এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; জুলাই মাসে জনমত ও শুনানির পর সিদ্ধান্ত হবে।
  • ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনার মাঝেই এই পদক্ষেপ নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকা আবারও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টির পথে হাঁটছে। এবার লক্ষ্যবস্তু ভারত-সহ বিশ্বের ৬০টি বড় অর্থনীতি। অভিযোগ, এই দেশগুলি তাদের বাজারে এমন পণ্যের প্রবেশ রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যেগুলি জোরপূর্বক শ্রম বা ‘ফোর্সড লেবার’-এর মাধ্যমে উৎপাদিত হতে পারে। সেই কারণ দেখিয়ে ভারতের পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (USTR) জানিয়েছে, দীর্ঘ তদন্তের পর তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে বহু দেশ আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার রোধে যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের মতে, এর ফলে মার্কিন শ্রমিক ও সংস্থাগুলি অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রম কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোনও ব্যক্তি যদি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, ভয় দেখিয়ে, ঋণের বোঝা চাপিয়ে, আটক রেখে বা অন্য কোনও ধরনের চাপ প্রয়োগ করে কাজ করতে বাধ্য হন, তাহলে তাকে জোরপূর্বক শ্রম বলা হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বহু বছর ধরেই এই ধরনের শ্রমপ্রথার বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে। আমেরিকার অভিযোগ, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও এমন শ্রম ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে।

কেন ভারতের নাম এল?

মার্কিন তদন্তে ভারতকে সরাসরি জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের দেশ বলা হয়নি। বরং অভিযোগ হল, ভারত-সহ বেশ কয়েকটি দেশ এমন পণ্যের আমদানি বা বাণিজ্য রোধে যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এই কারণেই ভারতকে সেই দেশগুলির তালিকায় রাখা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের মতে, যদি কোনও দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের প্রবেশ রোধ না করে, তাহলে সেই দেশের ব্যবসায়ীরা উৎপাদন খরচে কৃত্রিম সুবিধা পেতে পারে। ফলে মার্কিন উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।

কত শুল্ক বসতে পারে?

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৫টি অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ এবং বাকি ৪৫টি অর্থনীতির উপর ১২.৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হতে পারে। ভারত সেই দ্বিতীয় গোষ্ঠীতে রয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।

তবে সব পণ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্ক প্রযোজ্য হবে না। শক্তি খাত, বিরল খনিজ, কিছু কৃষিপণ্য, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক এবং বিমান শিল্পের কিছু যন্ত্রাংশকে এই প্রস্তাবিত শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ভারতের জন্য এর প্রভাব কী হতে পারে?

আমেরিকা ভারতের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ভারত থেকে বিপুল পরিমাণে বস্ত্র, প্রকৌশল পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, গয়না, চামড়াজাত পণ্য এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য আমেরিকায় রপ্তানি হয়।

যদি অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, তাহলে ভারতীয় পণ্য আমেরিকার বাজারে তুলনামূলকভাবে বেশি দামী হয়ে যেতে পারে। এর ফলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বস্ত্র ও শ্রমনির্ভর শিল্পগুলি চাপের মুখে পড়তে পারে।

এখনই কি শুল্ক কার্যকর হচ্ছে?

না। এটি এখনও কেবল একটি প্রস্তাব।

মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত জনমত গ্রহণ করা হবে। ৭ জুলাই একটি প্রকাশ্য শুনানিও অনুষ্ঠিত হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অর্থাৎ ভারত ও অন্যান্য দেশগুলির কাছে এখনও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্য আলোচনার উপর প্রভাব পড়বে?

এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

ভারত ও আমেরিকার মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এমন সময় এই নতুন শুল্ক প্রস্তাব সামনে আসায় আলোচনায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। যদিও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সফল হলে নির্দিষ্ট কিছু শুল্ক সংক্রান্ত পদক্ষেপ এড়ানোও সম্ভব হতে পারে।

শেষ কথা

এই মুহূর্তে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। কিন্তু আমেরিকার এই পদক্ষেপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে শ্রম অধিকার ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকে তারা এখন বাণিজ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হল, একদিকে রপ্তানি স্বার্থ রক্ষা করা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমমান সংক্রান্ত প্রশ্নে নিজের অবস্থানকে আরও শক্তভাবে তুলে ধরা।

জুলাই মাসের শুনানি ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর থাকবে শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের আরও ৫৯টি অর্থনীতিরও।