হাইলাইটস

• হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন অধিকাংশ উচ্ছেদ অভিযান রেলের জমিতে হয়েছে।

• নিউ মার্কেট, ধর্মতলা ও এসপ্ল্যানেড অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকা কলকাতা পুরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন।

• রেলের জমিতে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে রাজ্য সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হয় না।

• পুরসভা বা সরকারি জমিতে উচ্ছেদ রাজনৈতিকভাবে বেশি স্পর্শকাতর।

• নতুন সরকারের হকারবিরোধী অভিযানে দুই ধরনের জমির প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

বাংলাস্ফিয়ার: নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কলকাতা ও তার আশপাশে শুরু হওয়া হকার উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই বিতর্কের মাঝখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়শই আড়ালে থেকে যাচ্ছে—যে সব এলাকায় উচ্ছেদ হচ্ছে, সেগুলি আসলে কার জমি?

সব হকার একই ধরনের জমিতে বসেন না। কোথাও রেলের মালিকানা, কোথাও পুরসভার, আবার কোথাও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের অধীনে জমি রয়েছে। ফলে আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতাও এক নয়।

হাওড়া স্টেশন: মূলত রেলের জমি

সবচেয়ে বড় উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে হাওড়া স্টেশন চত্বরে।

স্টেশনের মূল প্রবেশপথ, প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন এলাকা, রেলওয়ে অ্যাপ্রোচ রোডের বড় অংশ, স্টেশন সংলগ্ন খোলা জায়গা এবং যাত্রী চলাচলের করিডরের অধিকাংশই ভারতীয় রেলের সম্পত্তি।

ফেরিঘাট, বাসস্ট্যান্ড এবং অ্যাপ-ক্যাব জোনের কিছু অংশে বিভিন্ন সংস্থার যৌথ কর্তৃত্ব থাকলেও যে এলাকাগুলিতে সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে, তার বড় অংশই রেলের অধীনস্থ বলে ধরা হয়।

সেই কারণেই রেল কর্তৃপক্ষ সরাসরি অভিযান চালাতে পেরেছে।

শিয়ালদহ: এখানেও রেলের কর্তৃত্ব সবচেয়ে বেশি

শিয়ালদহ স্টেশনেও একই চিত্র।

স্টেশন চত্বর, প্ল্যাটফর্মের বাইরের করিডর, যাত্রী প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার সংলগ্ন এলাকা এবং স্টেশন ঘিরে থাকা বহু জায়গাই রেলের সম্পত্তি।

ফলে শিয়ালদহে হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে রেল প্রশাসনের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

রাজ্য সরকার সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু জমির মালিকানা মূলত রেলের।

নিউ মার্কেট: সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি

নিউ মার্কেট এলাকায় চিত্র একেবারেই আলাদা।

হগ স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, বার্ট্রাম স্ট্রিট, হিউমায়ুন প্লেস, চৌরঙ্গি প্লেস—এই সমস্ত রাস্তা ও ফুটপাত মূলত কলকাতা পুরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে রেলের কোনও ভূমিকা নেই। ফলে এই এলাকায় হকার উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের নোটিসের প্রশ্ন সরাসরি কলকাতা পুরসভা ও রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণেই নিউ মার্কেটের প্রশ্নটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।

ধর্মতলা–এসপ্ল্যানেড: পুরসভার জমি, তাই রাজনীতি বেশি

ধর্মতলা ও এসপ্ল্যানেড কলকাতার সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম।

গ্র্যান্ড হোটেল সংলগ্ন ফুটপাত, মেট্রো গেটের আশপাশ, চৌরঙ্গি অঞ্চলের রাস্তা এবং অধিকাংশ ফুটপাত কলকাতা পুরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন।

মেট্রো রেলের কিছু নির্দিষ্ট অবকাঠামো আলাদা কর্তৃপক্ষের অধীনে হলেও সাধারণ রাস্তা ও ফুটপাত পুরসভার আওতায় পড়ে। ফলে এখানে উচ্ছেদ মানেই সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন সামনে চলে আসে।

রেলের জমি আর পুরসভার জমির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

রেলের জমিতে উচ্ছেদ তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ ভারতীয় রেল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন একটি স্বতন্ত্র সংস্থা। নিরাপত্তা, যাত্রী চলাচল এবং রেল পরিচালনার স্বার্থে তারা সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু পুরসভার জমিতে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।

কারণ সেখানে জড়িয়ে থাকে—

  • জীবিকার প্রশ্ন,
  • স্থানীয় রাজনীতি,
  • ভোটব্যাঙ্ক,
  • পুনর্বাসনের দাবি,
  • এবং নাগরিক সুবিধার প্রশ্ন।

তাই পুরসভার এলাকায় হকার উচ্ছেদ সবসময় বেশি বিতর্ক তৈরি করে।

কোথায় সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ঝুঁকি?

রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা হল নিউ মার্কেট–ধর্মতলা–এসপ্ল্যানেড অঞ্চল।

কারণ এখানে শুধু হকার নয়, হাজার হাজার ছোট ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহণকর্মী এবং ক্রেতার স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে হাওড়া ও শিয়ালদহে সরকার অপেক্ষাকৃত সহজে “রেল নিরাপত্তা” ও “যাত্রী স্বার্থ”-এর যুক্তি সামনে আনতে পারে।

শেষ কথা

নতুন সরকারের হকারবিরোধী অভিযানের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, সব অভিযান এক ধরনের নয়।

হাওড়া ও শিয়ালদহে মূল লড়াই রেলের জমি দখলমুক্ত করার।

অন্যদিকে নিউ মার্কেট, ধর্মতলা ও এসপ্ল্যানেডে প্রশ্নটি পুরসভার জমি, নগর পরিকল্পনা এবং জীবিকার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

ফলে ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংঘাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে রেল চত্বরে নয়, বরং কলকাতার কেন্দ্রস্থলের সেই ফুটপাতগুলিতে, যেখানে জমির মালিকানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হাজার হাজার মানুষের জীবিকার প্রশ্ন।