হাইলাইটস:
- শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ নয়, চালু হচ্ছে ডাইরেক্ট ল্যান্ড পারচেজ পলিসি।
- মুখ্যমন্ত্রী: “আর একটি সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রাম চাই না।”
- ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে চালু হবে সিঙ্গল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স।
- পঞ্চায়েত, পুরসভা বা জেলা পরিষদের আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে না।
- ডানকুনিতে লাক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে ঘোষণা।
বাংলাস্ফিয়ার: শিল্পায়নের পথে জমি-নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শনিবার ঘোষণা করেছেন, শিল্পের জন্য আর প্রচলিত জমি অধিগ্রহণের পথে হাঁটবে না রাজ্য। পরিবর্তে চালু হবে ডাইরেক্ট ল্যান্ড পারচেজ পলিসি, যার মাধ্যমে শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি সরাসরি কেনার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রকল্পগুলির জন্য সিঙ্গল-উইন্ডো ছাড়পত্র ব্যবস্থাও চালু করার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি।
হুগলির ডানকুনিতে লাক্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার নতুন উৎপাদন কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা আর একটি নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুর চাই না।” তাঁর বক্তব্য, শিল্পের জন্য জমি নিয়ে অতীতের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার নতুন নীতি গ্রহণ করছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, কোনও শিল্পগোষ্ঠীর জমির প্রয়োজন হলে সরকার নতুন নীতির আওতায় জমি সংগ্রহ করে তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেবে। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই এই নীতির মাধ্যমে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ), রেল, জাতীয় সড়ক প্রকল্প এবং নতুন বিমানবন্দরের জন্য জমি কেনা হয়েছে। এবার একই পদ্ধতি বেসরকারি শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হবে। তাঁর কথায়, “শিল্পের জন্য জমি কোনও সমস্যাই হবে না। আমরা জমি সংগ্রহের নীতিই বদলে দেব।”
রাজ্য সরকারের মতে, এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হল শিল্পায়নকে গতি দেওয়া, কিন্তু জোরপূর্বক জমি অধিগ্রহণের বিতর্ক এড়ানো। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জমি নিয়ে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রকল্প নয়, গোটা রাজ্যের বিনিয়োগ-পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সেই কারণেই সরকার এমন একটি ব্যবস্থা আনতে চাইছে, যেখানে জমি সংগ্রহ হবে তুলনামূলকভাবে কম সংঘাতের পথে।
শুধু জমি নয়, বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক জটিলতা কমাতেও বড় পদক্ষেপের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব আর পঞ্চায়েত, পুরসভা, পুরনিগম বা জেলা পরিষদের একাধিক স্তরে ঘুরবে না। পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম (WBIDC) এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে নিয়ে একটি সিঙ্গল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। জমি, পরিবেশ-সহ বিভিন্ন অনুমোদন একই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, একই প্রকল্পের জন্য একাধিক দফতর ও স্থানীয় সংস্থার অনুমোদন নিতে গিয়ে মাসের পর মাস সময় নষ্ট হয়। সরকার মনে করছে, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং প্রকল্পের কাজও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে রাজ্যের আর্থিক অবস্থার প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর অভিযোগ, বামফ্রন্ট আমলে রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা, যা তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময় বেড়ে প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব বাড়াতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বড় বিনিয়োগ টানা ছাড়া অন্য পথ নেই বলেই তিনি মন্তব্য করেন।
শিল্পপতিদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গে এখন বিনিয়োগের পরিবেশ অনেক উন্নত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার উল্লেখ করে তাঁর দাবি, অতীতে শিল্পাঞ্চলে যে ধরনের তোলাবাজি বা মাসোহারার অভিযোগ ছিল, তা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ডানকুনির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কোনও ট্রাক আটকে চাঁদা তোলার ঘটনা ঘটেনি বলেই তাঁর বিশ্বাস। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।
এই ঘোষণার রাজনৈতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। সেই আন্দোলনের জেরে শিল্পায়নের প্রশ্নে রাজ্যের নীতি দীর্ঘদিন বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। নতুন সরকার সেই অতীত থেকে দূরত্ব তৈরি করে শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চাইছে, আবার একই সঙ্গে জমি-সংক্রান্ত সংঘাতের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার বার্তাও দিতে চাইছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জমি সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের সময় কমানো গেলে শিল্প বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তবে এই নীতির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবে জমি কত দ্রুত সংগ্রহ করা যায়, প্রশাসন কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন ব্যবস্থাকে কতটা আস্থার সঙ্গে গ্রহণ করেন, তার উপর।
ডানকুনিতে লাক্স ইন্ডাস্ট্রিজের নতুন প্রকল্পের মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী কার্যত রাজ্যের নতুন শিল্পনীতির দিকনির্দেশ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাঁর বার্তা—পশ্চিমবঙ্গ শিল্প চায়, বিনিয়োগ চায়, কর্মসংস্থান চায়; কিন্তু সেই পথ আর কখনও সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাবে না।