Home খবর লিতানি নদী পেরিয়ে ইসরায়েলি সেনা: লেবাননে যুদ্ধের নতুন অধ্যায়, নাকি দীর্ঘমেয়াদি দখলের সূচনা?

লিতানি নদী পেরিয়ে ইসরায়েলি সেনা: লেবাননে যুদ্ধের নতুন অধ্যায়, নাকি দীর্ঘমেয়াদি দখলের সূচনা?

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 6 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত লিতানি নদী অতিক্রম করেছে।
  • ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে প্রত্যাহারের পর এই প্রথম এত গভীরে প্রবেশ করল ইসরায়েল।
  • ইসরায়েল বউফোর্ট দুর্গ (Beaufort Castle) দখল করে সেখানে নিজেদের পতাকা উত্তোলন করেছে।
  • প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেই লিতানি অতিক্রমের কথা নিশ্চিত করেছেন।
  • এই পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
  • ফ্রান্স জরুরি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠকের দাবি তুলেছে।

কেন লিতানি নদী এত গুরুত্বপূর্ণ?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে লিতানি নদী কেবল একটি নদী নয়, এটি দক্ষিণ লেবাননের সামরিক ও রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণকারী এক প্রাকৃতিক সীমারেখা।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে প্রবাহিত এই নদী ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর ভারী অস্ত্র বা সামরিক উপস্থিতি থাকবে না। সেই কারণে নদীটি কার্যত একটি নিরাপত্তা বাফার জোনে পরিণত হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি বাহিনীর লিতানি অতিক্রম করা শুধু সামরিক অগ্রগতি নয়; এটি যুদ্ধের লক্ষ্য ও পরিধি বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত।


কী ঘটেছে?

গত কয়েক দিনে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে লিতানি নদীর উত্তর দিকে অবস্থান নিতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu সীমান্ত সফরের সময় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদী অতিক্রম করেছে এবং “উচ্চভূমি ও কৌশলগত এলাকাগুলি” দখলে নিয়েছে।

এরপর ইসরায়েলের গোলানি ব্রিগেড দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বউফোর্ট দুর্গ দখল করে। মধ্যযুগীয় এই দুর্গটি লিতানি উপত্যকা এবং উত্তর ইসরায়েলের উপর নজরদারির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নেতানিয়াহু এই ঘটনাকে “অভিযানের নাটকীয় পরিবর্তন” বলে অভিহিত করেছেন।


কেন এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক বলা হচ্ছে?

২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর তারা আর কখনও এত গভীরে প্রবেশ করেনি।

২০০৬ সালের যুদ্ধেও ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অভিযান চালিয়েছিল, কিন্তু লিতানি নদীর ওপারে স্থায়ী অবস্থান নেয়নি। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

বর্তমান সংঘর্ষে শুধু সীমান্তবর্তী গ্রাম বা হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু নয়; বরং ইসরায়েল এখন এমন অঞ্চলগুলির দিকে এগোচ্ছে যেগুলি দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি “শাস্তিমূলক অভিযান” থেকে “ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ” কৌশলে রূপান্তরের লক্ষণ।


ইসরায়েলের উদ্দেশ্য কী?

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী লক্ষ্য একটাই—হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা।

ইসরায়েল দাবি করছে, বউফোর্ট রিজ এবং লিতানি উপত্যকার আশপাশ থেকে বহুবার রকেট, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই অঞ্চলগুলিকে নিয়ন্ত্রণে না নিলে উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, বিষয়টি কেবল নিরাপত্তা নয়।

মার্চ মাসে ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নেতানিয়াহু সরকার গাজা, সিরিয়া এবং লেবানন—তিনটি ফ্রন্টেই আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। লিতানি পার হওয়া সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হতে পারে।


হিজবুল্লাহর জন্য এর অর্থ কী?

হিজবুল্লাহর সামরিক মর্যাদার ওপর এটি বড় ধাক্কা।

দক্ষিণ লেবানন বহু দশক ধরে হিজবুল্লাহর কার্যত দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ইসরায়েল যদি বউফোর্ট দুর্গ, সালুকি উপত্যকা এবং লিতানির উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি ধরে রাখতে পারে, তাহলে সংগঠনটির প্রতিরক্ষা বলয় ভেঙে পড়বে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে হিজবুল্লাহ পরাজিত।

সংগঠনটি অতীতে বহুবার গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েলি বাহিনীকে বিপাকে ফেলেছে। ফলে স্থলভাগ দখল করা তুলনামূলক সহজ হলেও সেই এলাকা ধরে রাখা অনেক কঠিন হতে পারে।


লেবাননের আশঙ্কা: নতুন দখলদারির সূচনা?

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী Nawaf Salam অভিযোগ করেছেন যে ইসরায়েল “পোড়ামাটি নীতি” অনুসরণ করছে। তাঁর দাবি, ব্যাপক ধ্বংস ও জনবসতি খালি করিয়ে দক্ষিণ লেবাননের জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

অনেক লেবানিজের আশঙ্কা, ১৯৮২ থেকে ২০০০ সালের মতো আবারও দক্ষিণ লেবাননের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ ইতিমধ্যেই ইসরায়েল সীমান্তবর্তী এলাকায় তথাকথিত “সিকিউরিটি জোন” তৈরি করেছে এবং কিছু এলাকায় নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাচ্ছে।


আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলের এই পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দ্রুত বেড়েছে।

France জরুরি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠকের দাবি তুলেছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অভিযানকে লেবাননের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধবিরতি শক্তিশালী করার জন্য আলোচনা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েল ও লেবাননের সামরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপও আয়োজন করছে।


ভবিষ্যতের চিত্র

লিতানি নদী অতিক্রম করা সামরিক মানচিত্রে হয়তো একটি রেখা পার হওয়া মাত্র। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থে এটি অনেক বড় ঘটনা।

এটি প্রমাণ করছে যে ইসরায়েল আর শুধু সীমান্ত সুরক্ষার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। তারা দক্ষিণ লেবাননের ভৌগোলিক বাস্তবতাকেও নিজেদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করতে প্রস্তুত।

যদি ইসরায়েল লিতানির উত্তরে অবস্থান ধরে রাখে, তাহলে ২০০৬ সালের পর গড়ে ওঠা সমগ্র নিরাপত্তা কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়বে। অন্যদিকে যদি হিজবুল্লাহ পাল্টা গেরিলা অভিযান শুরু করে, তাহলে লেবানন আবারও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে।

সুতরাং, লিতানি নদী পার হওয়া কেবল একটি সামরিক ঘটনা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য, লেবাননের ভবিষ্যৎ এবং ইরান-ইসরায়েল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরবর্তী অধ্যায়ের সূচক। ইতিহাসের বিচারে, ভবিষ্যতে এই ঘটনাকে হয়তো ২০২৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলির একটি হিসেবে দেখা হবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles