Home খবর শেখর সুমনের আক্ষেপ: “ব্যঙ্গ করতে হলে নিরপেক্ষ থাকতে হবে, গণতন্ত্রে সমালোচনার স্বাধীনতা থাকা জরুরি”

শেখর সুমনের আক্ষেপ: “ব্যঙ্গ করতে হলে নিরপেক্ষ থাকতে হবে, গণতন্ত্রে সমালোচনার স্বাধীনতা থাকা জরুরি”

Authored By Shibangi Bose
12 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠান করতে হলে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা দরকার বলে মত শেখর সুমনের।
  • বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে এখনও নিজের কাছে রহস্য বলেই মনে করেন অভিনেতা।
  • কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচন লড়াও ছিল তাঁর মতে একপ্রকার অনিচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত।
  • রাজনীতির মঞ্চে বিরোধিতা থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্য থাকে বলে দাবি।
  • অটল বিহারী বাজপেয়ী ও সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতি তুলে ধরলেন অভিনেতা।
  • গণতন্ত্রে সরকারকে সমালোচনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত বলে মন্তব্য।

টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ শেখর সুমন আবারও আলোচনায়। সম্প্রতি তাঁর নতুন টক শো ‘শেখর টুনাইট’-এ একটি ব্যঙ্গাত্মক মনোলগ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা তৈরি হয়েছিল। সেই মনোলগে তিনি এমন এক রাজার কথা বলেছিলেন, যিনি নিজের সম্পর্কে সত্য প্রকাশ পছন্দ না হওয়ায় আয়নাই ভেঙে ফেলেছিলেন। বক্তব্যটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এতটাই আলোড়ন তোলে যে কংগ্রেসের সরকারি সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলও সেটি ভাগ করে নেয়। যদিও কারও নাম না নিয়ে করা সেই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে চাননি শেখর, তবে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেছেন।

শেখর সুমনের মতে, রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত সত্যকে রসিকতার মোড়কে তুলে ধরা। তিনি বলেন, সংবাদপত্রে যা পড়েন, সমাজ ও রাজনীতিতে যা ঘটতে দেখেন, সেই বাস্তবতাকেই ব্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ব্যঙ্গের উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়, বরং এমনভাবে সত্যকে তুলে ধরা যাতে মানুষ ভাবতে বাধ্য হয়।

আজকের অত্যন্ত মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে রাজনৈতিক ব্যঙ্গের জায়গা আছে কি না, সেই প্রশ্নে তিনি আশাবাদী। তাঁর বক্তব্য, সামান্য খোঁচা, হালকা মশকরা বা বিদ্রূপ অতিথিরা সাধারণত মেনে নেন। সমস্যা হয় তখনই, যখন উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা বা হেয় প্রতিপন্ন করা। তাই ব্যঙ্গের ভাষা ও ভঙ্গিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তাঁর সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গও। একসময় কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শেখর সুমন। পরে স্বল্প সময়ের জন্য বিজেপিতেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তগুলিকে আজও তিনি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেন না। তাঁর কথায়, জীবনে কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন মানুষ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। কংগ্রেসের প্রার্থী হওয়া কিংবা বিজেপির সদস্যপদ গ্রহণ— দু’টিকেই তিনি অনেকটা সেই ধরনের অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেছেন।

বিশেষভাবে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি রসিকতার সুরে বলেন, তিনি কার্যত মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য দলের সদস্য ছিলেন। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়কে কখনও নিজের স্থায়ী পরিচয় হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁর মতে, একজন সঞ্চালক বা ব্যঙ্গকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হল নিরপেক্ষতা।

এই কারণেই ‘শেখর টুনাইট’-এর মতো অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক রাখার পক্ষপাতী। তাঁর মতে, বাম বা ডান— কোনও পক্ষেই ঝুঁকে পড়া চলবে না। সঞ্চালককে বেড়ার উপর বসে থাকতে হয়। কারণ একবার কোনও রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে নিজের পরিচয় জড়িয়ে গেলে ব্যঙ্গের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়।

রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও আকর্ষণীয় মন্তব্য করেছেন শেখর। বিখ্যাত গীতিকার ও প্রাক্তন সাংসদ জাভেদ আখতার একবার বলেছিলেন, প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলেও পর্দার আড়ালে বিভিন্ন দলের নেতারা বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। শেখরের অভিজ্ঞতাও অনেকটাই একই রকম। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ময়দানে নেতাদের নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে হয়, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা অনেক বেশি মানবিক এবং সহনশীল।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে যেমন কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো থাকতে পারে, অথচ কোনও নির্দিষ্ট ইস্যুতে সংঘাতও হতে পারে, তেমনই রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেও প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য পাশাপাশি চলতে পারে। এই বাস্তবতাকে সাধারণ মানুষ অনেক সময় দেখতে পান না।

নিজের পুরনো অনুষ্ঠান ‘মুভার্স অ্যান্ড শেকার্স’-এর প্রসঙ্গ টেনে শেখর বলেন, সেই অনুষ্ঠানে বহু শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী ও বিজেপি নেত্রী Sushma Swaraj। শেখরের দাবি, অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে অনেকেই সুষমা স্বরাজকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মেয়ে নাকি উল্টো পরামর্শ দিয়েছিলেন— যদি কোনও অনুষ্ঠানে যেতেই হয়, তবে সেটি শেখরের অনুষ্ঠান হওয়া উচিত।

আরও একটি স্মৃতিচারণায় উঠে আসে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Atal Bihari Vajpayee-এর নাম। শেখরের দাবি, এক অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখে বাজপেয়ী নিজের গাড়ি থামিয়ে নেমে এসে আলিঙ্গন করেছিলেন। এমনকি তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর অনুষ্ঠান বন্ধ হওয়া উচিত নয়, কারণ শেখর যখন তাঁকেও ব্যঙ্গ করেন, তখন তিনি সবচেয়ে বেশি হাসেন। অভিনেতার মতে, একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কিছু হতে পারে না।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় রাতের টক শোগুলির সংকট নিয়েও কথা বলেছেন শেখর। তাঁর মতে, যে দেশকে বাকস্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়, সেখানে যদি রাজনৈতিক ব্যঙ্গের অনুষ্ঠান সমস্যার মুখে পড়ে, তা বিস্ময়কর। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে নাগরিকের সরকারকে সমালোচনা করার অধিকার থাকা উচিত। সেই সমালোচনা কখনও কঠোর হতে পারে, কখনও ব্যঙ্গাত্মক হতে পারে, কিন্তু তা দমিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।

শেখর সুমনের বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা— রাজনৈতিক ব্যঙ্গ কোনও দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়, বরং সমাজকে আয়না দেখানোর একটি মাধ্যম। সেই আয়নায় সত্য প্রতিফলিত হলে কেউ অস্বস্তিতে পড়তেই পারেন। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ভর করে সেই অস্বস্তিকে কতটা সহ্য করা যায় তার উপর। তাঁর মতে, ব্যঙ্গের কাজই হল প্রশ্ন তোলা, চিন্তার খোরাক দেওয়া এবং ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে মনে করিয়ে দেওয়া যে সমালোচনা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles