Table of Contents
নিজস্ব প্রতিবেদন
কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে চমক দেখালেন ডানপন্থী প্রার্থী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। ৪৭ বছর বয়সি এই আইনজীবী, যিনি নিজেকে ‘দ্য টাইগার’ বলে পরিচয় দেন এবং প্রকাশ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির সমর্থক হিসেবে পরিচিত, তিনি ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে পৌঁছে গিয়েছেন। আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত লড়াই, যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন বামপন্থী নেতা ও সিনেটর ইভান সেপেদা, যিনি পেয়েছেন ৪১ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন সেপেদাই প্রথম স্থানে থাকবেন। কিন্তু ভোটের ফলাফল সেই পূর্বাভাসকে উল্টে দিয়েছে। এসপ্রিয়েলার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল কলম্বিয়ার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদেরও বিস্মিত করেছে।
সহিংসতার ছায়ায় নির্বাচন
গত এক দশকের মধ্যে কলম্বিয়ার সবচেয়ে সহিংস নির্বাচনী প্রচারের সাক্ষী থাকল দেশটি। নির্বাচনের আগে একাধিক গাড়ি বোমা হামলা, ড্রোন আক্রমণ, রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বহু নেতার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই রবিবার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। যদিও নির্বাচনের দিনটি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। ভোটকেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা দেশে চার লক্ষেরও বেশি পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করা হয়।
কে এই আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা?
আইনজীবী, গায়ক, পোশাক ব্যবসায়ী— একাধিক পরিচয় রয়েছে এসপ্রিয়েলার। তিনি নিজেকে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা একজন ‘ব্যতিক্রমী’ নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারবার জাতীয়তাবাদী ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং কঠোর নিরাপত্তা নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেন, “প্রয়োজন হলে আমি কলম্বিয়ার জন্য নিজের জীবনও দিয়ে দেব।”
সেই সময় তাঁর গায়ে ছিল কলম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি— যা তাঁর জনতুষ্টিমূলক রাজনৈতিক শৈলীরই একটি প্রতীকী প্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
‘নার্কো-সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক
এসপ্রিয়েলার প্রচারের মূল বিষয় ছিল নিরাপত্তা। বুলেটপ্রুফ কাচের আড়াল থেকে প্রচার চালাতে বাধ্য হওয়া এই প্রার্থী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ক্ষমতায় এলে তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে ‘শক প্ল্যান’ চালু করবেন।
তাঁর বক্তব্য, “আমরা অবিলম্বে মাদক-সন্ত্রাসী শিবিরগুলিতে বোমাবর্ষণ শুরু করব।”
এই কঠোর অবস্থান লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অপরাধ দমনের প্রশ্নে ‘লোহমুষ্টি নীতি’ গ্রহণ করে একাধিক নেতা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এসপ্রিয়েলার প্রচারও সেই ধারারই অংশ।
শান্তিচুক্তির পরেও কেন অশান্ত কলম্বিয়া?
২০১৬ সালে কলম্বিয়ার সরকার এবং ফার্ক (FARC) গেরিলাদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের গৃহসংঘাত অনেকটাই কমে আসে।
কিন্তু দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চল এখনও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোকেন পাচার, অবৈধ সোনার খনি, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে।
এই পরিস্থিতিই এসপ্রিয়েলার মতো কঠোরপন্থী নেতার উত্থানের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সেপেদার পথ: যুদ্ধ নয়, আলোচনা
অন্যদিকে ইভান সেপেদা বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ‘টোটাল পিস’ বা ‘সর্বাত্মক শান্তি’ নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতার সমাধান সামরিক অভিযানে নয়, রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
৬৩ বছর বয়সি সেপেদা কলম্বিয়ার এক পরিচিত বামপন্থী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বামপন্থী সিনেটর, যিনি ডানপন্থী আধাসামরিক বাহিনীর হাতে নিহত হন।
প্রচারের সময় সেপেদা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে ‘চরম দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদী শক্তি’ হিসেবে আক্রমণ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে এসপ্রিয়েলার পেছনে ধনী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং অপরাধ জগতের কিছু স্বার্থগোষ্ঠীর সমর্থন রয়েছে।
তবে প্রথম দফার ফল নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তিনি নির্বাচনে কারচুপির সরাসরি অভিযোগ করেননি।
পেত্রো সরকারের উত্তরাধিকার
সেপেদা বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সমর্থন পেয়েছেন। পেত্রো কলম্বিয়ার ইতিহাসে প্রথম বামপন্থী রাষ্ট্রপতি এবং সংবিধান অনুযায়ী তিনি পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।
পেত্রো সরকারের সমর্থকরা দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করেছে, শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে জমি বণ্টনের কর্মসূচি চালু করেছে।
কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, শান্তি আলোচনার নামে সরকার অপরাধী গোষ্ঠীগুলিকে অতিরিক্ত সুযোগ দিয়েছে। ফলে সহিংসতা বেড়েছে এবং কোকেন রপ্তানি নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে।
দ্বিতীয় দফার আগে বিভক্ত দেশ
২১ জুনের দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে কলম্বিয়া এখন কার্যত দুই বিপরীত রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে বিভক্ত।
একদিকে আছেন এসপ্রিয়েলা— যিনি শক্তি প্রয়োগ, সামরিক অভিযান এবং কঠোর আইনশৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
অন্যদিকে সেপেদা— যিনি আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায় এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রনীতির পক্ষে সওয়াল করছেন।
প্রথম দফার ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কলম্বিয়ার ভোটারদের বড় অংশ নিরাপত্তাহীনতা এবং সহিংসতায় ক্লান্ত। কিন্তু তারা সেই সমস্যার সমাধান কীভাবে দেখতে চান, তার উত্তর এখনও চূড়ান্তভাবে মেলেনি।
২১ জুনের ভোট তাই শুধু দুই প্রার্থীর লড়াই নয়; এটি হবে কলম্বিয়ার ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ গণভোট।