নিগ্রহের অভিযোগের পর তৃণমূলের নীরবতা কি কেবল কৌশল, নাকি দলের ভিতরে শুরু হয়েছে নতুন ক্ষমতার খেলা?

হাইলাইটস

  • অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিগ্রহের অভিযোগ ঘিরে দলীয় ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেখা যায়নি।
  • প্রথম সারির অধিকাংশ নেতা কার্যত নীরব থেকেছেন।
  • জেলা স্তরেও তেমন কোনও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ছবি সামনে আসেনি।
  • প্রশ্ন উঠছে, এটি কি অভিষেককে একঘরে করার সূক্ষ্ম কৌশল?
  • নাকি তৃণমূলের গভীরতর সংকটের লক্ষণ, যেখানে প্রত্যেকে নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচাতেই ব্যস্ত?

বাংলাস্ফিয়ার: এক সময় তৃণমূল কংগ্রেসে একটি অলিখিত নিয়ম ছিল। দলের কোনও নেতার গায়ে আঁচ লাগলে পরদিন সকাল থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে টায়ার জ্বলত, রাস্তা আটকে যেত, প্রতিবাদ মিছিল বেরোত, সংবাদ সম্মেলনের বন্যা বইত। অনেক সময় ঘটনাটির গুরুত্বের চেয়ে প্রতিবাদের মাত্রা বড় হয়ে উঠত।

কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথিত নিগ্রহের ঘটনায় ছবিটা যেন উল্টো।

দলীয় বিবৃতি এসেছে, কয়েকজন অনুগত নেতা টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্ট হয়েছে। কিন্তু সেই সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক বিস্ফোরণ কোথায়?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দলের প্রথম সারির অধিকাংশ নেতা কোথায় ছিলেন?

তাঁরা কি ব্যস্ত ছিলেন? অসুস্থ ছিলেন? নাকি তাঁদের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে এই ঘটনাটির গুরুত্বই ছিল না?

রাজনীতিতে অনেক সময় মানুষ যা বলে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় সে কী বলে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়, সে কোথায় যায় না।

অভিষেকের ঘটনায় তৃণমূলের বহু নেতার অনুপস্থিতি সেই কারণেই রাজনৈতিক মহলে কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে।

কারণ, এঁদের অনেককেই অতীতে অনেক ছোটখাটো ঘটনায় রাস্তায় নেমে পড়তে দেখা গিয়েছে।

তাহলে এবার নয় কেন?

এর প্রথম ব্যাখ্যা হতে পারে, দলের ভিতরে অভিষেককে নিয়ে উৎসাহ আগের তুলনায় কমেছে।

ক্ষমতায় থাকার সময় কোনও দলের ভিতরের অসন্তোষ খুব কমই প্রকাশ্যে আসে। কারণ তখন সবাই জানেন ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়। সেই কেন্দ্রের আশপাশে থাকাই নিরাপদ। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরে সমীকরণ বদলে যায়। তখন নেতারা হঠাৎ করেই আদর্শবাদী হয়ে যান না, বরং আরও হিসাবি হয়ে ওঠেন। তাঁরা দেখতে শুরু করেন আগামী দিনের ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায় তৈরি হতে পারে।

এই অবস্থায় যদি কোনও নেতার সমর্থনে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া না দেখা যায়, তাহলে ধরে নিতে হয় তাঁর সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে অন্তত কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তৃণমূলের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

বহু বছর ধরেই দলের ভিতরে দুটি অদৃশ্য প্রবাহ ছিল। একটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেন্দ্রিক। অন্যটি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেন্দ্রিক।

ক্ষমতায় থাকার সময় এই দুই প্রবাহ একই নদীর জল বলে মনে হতো। কিন্তু ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারছেন নদীর ভিতরে আসলে দুটি স্রোত ছিল। এখন সেই স্রোতদুটি আলাদা আলাদা দিকে টানছে। ফলে অভিষেকের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধুমাত্র একজন নেতার পাশে দাঁড়ানো নয়। অনেকের কাছে তা একটি গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো। আর সেখানেই শুরু হচ্ছে দ্বিধা।

তবে এটিই পুরো গল্প নয়। আরও বড় একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। সেটি হলো ভয়। রাজনৈতিক ভয় নয়, ভবিষ্যতের ভয়। তৃণমূলের বহু নেতা আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও নিশ্চয়তা নেই। কেউ নিজের মামলার চিন্তায় আছেন। কেউ প্রশাসনিক তদন্তের আশঙ্কায়। কেউ আবার নিজের এলাকায় সংগঠন ধরে রাখার লড়াইয়ে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো মনে করছেন অভিষেকের জন্য রাস্তায় নেমে সংঘর্ষে জড়ানোর চেয়ে নিজের রাজনৈতিক জীবন বাঁচানো বেশি জরুরি। এটি আদর্শগত সিদ্ধান্ত নয়। এটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক সিদ্ধান্ত।

রাজনীতিতে এমন সময় বারবার এসেছে। যখন একটি দল উত্থানের পথে থাকে, তখন সবাই সৈনিক। যখন দল বিপর্যস্ত হয়, তখন সবাই কৌশলবিদ হয়ে যায়। আজকের তৃণমূলে সম্ভবত দ্বিতীয় অবস্থাটিই দেখা যাচ্ছে।

আরও একটি সম্ভাবনা রয়েছে। দলের অনেকেই হয়তো মনে করেন বর্তমান সংকটের জন্য বিরোধীদের পাশাপাশি দলীয় কৌশলও দায়ী। প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচার, সংগঠনের পুনর্গঠন থেকে জনসংযোগ—গত কয়েক বছরে যে পথ অনুসরণ করা হয়েছে, তার প্রতি সকলের সমর্থন ছিল না। ক্ষমতায় থাকার সময় সেই আপত্তি চেপে রাখা হয়েছিল। আজ আর সেই বাধ্যবাধকতা নেই। তাই প্রকাশ্যে বিদ্রোহ না করেও অনেকে নীরবতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছেন।

রাজনীতিতে নীরবতা অনেক সময় ভোটের থেকেও শক্তিশালী বার্তা দেয়। কারণ ভোট একদিনে হয়। নীরবতা প্রতিদিন দেখা যায়।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই নীরবতা শুধুমাত্র কয়েকজন নেতার নয়। এটি একটি বৃহত্তর মানসিক অবস্থার প্রতিফলন বলেও মনে হতে পারে। দলটি যেন এখনও বুঝে উঠতে পারেনি তারা ঠিক কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তারা কি সাময়িক ধাক্কা খেয়েছে? নাকি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অবক্ষয়ের শুরু হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত অনেক নেতা অপেক্ষা করতে চাইবেন। কারও পক্ষেই সম্পূর্ণ বাজি ধরতে চাইবেন না।

ফলে অভিষেকের নিগ্রহের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্য আন্দোলনও সীমিত থেকে যাচ্ছে। এখানেই ঘটনাটির প্রকৃত রাজনৈতিক গুরুত্ব। প্রশ্নটা আর অভিষেককে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা তৃণমূলকে নিয়ে। একটি সুসংহত দল হলে নেতার বিপদের সময় সবাই সামনে আসে। একটি অনিশ্চিত দল হলে সবাই চারপাশ দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিষেকের ঘটনায় তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে দ্বিতীয় ছবিটাই বেশি স্পষ্ট। সেই কারণেই কয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া প্রথম সারির নেতাদের অনুপস্থিতি কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়। এটি হয়তো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। যে বাস্তবতায় তৃণমূলের অনেক নেতাই এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে মেনে নিলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত নন। আর সেই অনিশ্চয়তার প্রকাশ ঘটছে রাস্তায় নয়, অনুপস্থিতিতে।

রাজনীতির অভিধানে কখনও কখনও সবচেয়ে জোরালো স্লোগানটি উচ্চারিত হয় না মাইকে। সেটি শোনা যায় খালি মঞ্চে, ফাঁকা চেয়ারে, আর সেইসব নেতার নীরবতায়, যাঁদের আসার কথা ছিল কিন্তু এলেন না।