বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিতে কখনও কখনও একটি সংখ্যা হাজার বক্তৃতার চেয়েও বেশি কথা বলে। গতকাল সেই কাজটাই করেছে একটি সংখ্যা—২০।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা ছিল প্রায় আশিজন বিধায়কের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাজির ছিলেন মাত্র কুড়িজন। অর্থাৎ চারজনের মধ্যে তিনজনই এলেন না। উপস্থিতির হার পঁচিশ শতাংশের কাছাকাছি। একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ক্ষমতা হারানোর পর প্রথম দিকের সংকটময় সময়ে, এই ধরনের উপস্থিতি নিছক সাংগঠনিক সমস্যা নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা।
আর সেই বার্তাটিই ঢেকে দেওয়ার জন্য শুরু হয়েছে ব্যাখ্যার বন্যা।
কেউ বলছেন, অনেক বিধায়ক নাকি ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কেউ বলছেন, কেউ অসুস্থ, কেউ এলাকায়, কেউ আবার আগে থেকেই অন্য কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন। দলের মুখপাত্রদের বক্তব্য শুনলে মনে হবে, ঘটনাটি একেবারেই স্বাভাবিক। যেন কুড়িজন আসা এবং ষাটজন না আসা রাজনৈতিকভাবে কোনও তাৎপর্যই বহন করে না।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কি তাই?
একটি দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন নেতার ডাকে সবাই আসে। কেউ না এলেও পরে এসে ক্ষমা চায়। কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। কিন্তু যখন একই দলের ডাকা বৈঠকে অধিকাংশ বিধায়কই অনুপস্থিত থাকেন, তখন বিষয়টি ক্যালেন্ডারের ভুল বা ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এটি আসলে মনস্তত্ত্বের প্রশ্ন।
রাজনীতিতে উপস্থিতি শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। গতকালের বৈঠকে যারা আসেননি, তাঁরা হয়তো প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেননি। তাঁরা দলত্যাগও করেননি। কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতি বলছে, দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আগের মতো বাধ্যতামূলক আনুগত্য আর কাজ করছে না।
এই পরিবর্তনটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। দলের সাংগঠনিক কাঠামো, নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন, আন্দোলনের ভাষা—সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেত তাঁর কাছেই। এমন একটি দলে নেত্রীর ডাকা বৈঠকে আশিজনের মধ্যে কুড়িজনের উপস্থিতি কোনও সাধারণ ঘটনা হতে পারে না।
কারণ তৃণমূল কখনও ক্যাডার-চালিত দল ছিল না। এটি ছিল নেতৃত্ব-চালিত দল। আর নেতৃত্ব-চালিত দলে নেতৃত্বের আহ্বানে সাড়া না দেওয়া মানে নেতৃত্বের কর্তৃত্বকে নীরবে প্রশ্ন করা।
রাজনৈতিক ইতিহাসে এর উদাহরণ অসংখ্য।
ক্ষমতা থাকাকালীন নেতার চারপাশে যে ভিড় দেখা যায়, তা সবসময় আদর্শের ভিড় নয়। তার বড় অংশই সম্ভাবনার ভিড়। কেউ পদ চান, কেউ প্রভাব চান, কেউ নিরাপত্তা চান। ক্ষমতা সরে গেলে সেই ভিড়ও সরে যেতে শুরু করে। তখনই বোঝা যায়, কে বিশ্বাসের কারণে পাশে ছিল আর কে সুবিধার কারণে।
তৃণমূলের বর্তমান সংকটও অনেকটা সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে।
গত কয়েক মাস ধরে দলের বিভিন্ন স্তরে পদত্যাগ, নিষ্ক্রিয়তা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসন্তোষের খবর বারবার সামনে এসেছে। বহু নেতাকে আর আগের মতো সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। অনেকে প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না বটে, কিন্তু নীরবতা অনেক সময় ভাষণের চেয়েও জোরালো হয়।
গতকালের বৈঠকের অনুপস্থিতির তালিকা সেই নীরবতারই সম্প্রসারণ।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল, দলীয় ব্যাখ্যাগুলি নিজের মধ্যেই পরস্পরবিরোধী। যদি অধিকাংশ বিধায়ক সত্যিই এলাকার কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হল কেন? আর যদি বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে এলাকার কাজের অজুহাত গ্রহণযোগ্য হয় কীভাবে?
দুই যুক্তি একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।
আরও একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। যদি ষাটজন বিধায়কের অনুপস্থিতির কারণ এতই বৈধ হয়ে থাকে, তাহলে দল কি তাঁদের নাম-সহ কারণ প্রকাশ করবে? কোন বিধায়ক কোথায় ছিলেন, কী কাজে ব্যস্ত ছিলেন, কী কারণে আসতে পারেননি—সেটি কি জানানো হবে?
সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলি এমন তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। কারণ তখন ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।
আসলে রাজনীতির একটি পুরনো নিয়ম আছে। যখন কোনও ঘটনা ব্যাখ্যা করতে খুব বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়, তখন বোঝা যায় ঘটনাটি স্বাভাবিক নয়।
যদি আশির মধ্যে পঁচাত্তরজন উপস্থিত থাকতেন, কেউ সংবাদ সম্মেলন করে উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিত না। ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে কারণ সংখ্যাটি অস্বস্তিকর।
আর অস্বস্তিকর সংখ্যা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।
কারণ সংখ্যা শুধু বর্তমানের ছবি নয়, ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও দেয়।
আজ যারা বৈঠকে আসছেন না, কাল তাঁরা হয়তো প্রকাশ্যে মতভেদ জানাবেন। আজ যারা ফোন ধরছেন না, কাল তাঁরা হয়তো অন্য রাজনৈতিক সম্ভাবনা খুঁজবেন। আজ যারা নীরব, কাল তাঁরাই নতুন সমীকরণের অংশ হতে পারেন।
এই কারণেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা উপস্থিতির খাতাকে গুরুত্ব দেন। অনেক সময় ভোটের ফলাফলের আগেই উপস্থিতির খাতা বলে দেয় কোন দলের ভিত শক্ত আর কোন দলের ভিত ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে।
তৃণমূলের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় সম্ভবত এই যে, অনুপস্থিত বিধায়কদের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও কঠোর পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি। এর অর্থ হতে পারে নেতৃত্ব জানে যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অবস্থানে তারা নেই। যখন কোনও সংগঠন আত্মবিশ্বাসী থাকে, তখন শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। যখন সংগঠন অনিশ্চিত থাকে, তখন অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করে।
সেই অর্থে গতকালের বৈঠকটি কেবল একটি বৈঠক ছিল না। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক থার্মোমিটার। আর সেই থার্মোমিটারের পারদ নেতৃত্বের জন্য সুখকর কোনও বার্তা দেয়নি।
তাই এখন মূল প্রশ্ন কুড়িজন কেন এলেন, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হল—ষাটজন কেন এলেন না?
কারণ রাজনীতিতে উপস্থিত মানুষদের চেয়ে অনুপস্থিত মানুষরা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
গতকালের বৈঠকের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সেই অনুপস্থিত ষাটজন। আর যতদিন পর্যন্ত তাদের অনুপস্থিতির প্রকৃত রাজনৈতিক কারণ স্পষ্ট না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত তৃণমূলের সমস্ত ব্যাখ্যাই অনেকের কাছে মুখরক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
উপস্থিতির খাতা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই খাতার সংখ্যাগুলি এখনো কথা বলে চলেছে। আর তাদের ভাষা দলীয় বিবৃতির ভাষার চেয়ে অনেক বেশি নির্মম।