Home দৃষ্টিভঙ্গিবিশ্লেষণ অন্নপূর্ণা বনাম লক্ষ্মীর ভান্ডার: মহিলা ভোটব্যাঙ্কে কীভাবে প্রভাব পড়তে পারে

অন্নপূর্ণা বনাম লক্ষ্মীর ভান্ডার: মহিলা ভোটব্যাঙ্কে কীভাবে প্রভাব পড়তে পারে

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 4 views 5 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মহিলা ভোটাররা বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কিন্তু গত এক দশকে তাঁদের ভূমিকা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। গ্রামের বুথ থেকে শহরতলির ওয়ার্ড—অসংখ্য নির্বাচনে দেখা গিয়েছে, পুরুষ ভোটে পিছিয়ে থেকেও মহিলা ভোটের জোরে রাজনৈতিক দলগুলি লড়াইয়ে টিকে থেকেছে। এই বাস্তবতা সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে গভীরভাবে বুঝেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লক্ষ্মীর ভান্ডার সেই বোঝাপড়ারই সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক ফল।

এখন বিজেপির অন্নপূর্ণা যোজনা সেই জায়গাতেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে এই নতুন মডেল মহিলা ভোটব্যাঙ্কে কী প্রভাব ফেলতে পারে?

সবচেয়ে আগে বুঝতে হবে, লক্ষ্মীর ভান্ডার শুধুমাত্র একটি আর্থিক প্রকল্প নয়; এটি বহু মহিলার কাছে ব্যক্তিগত মর্যাদার অনুভূতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন অসংখ্য মহিলা আছেন যাঁদের আগে কোনও ব্যক্তিগত আয় ছিল না। সংসারের প্রতিটি প্রয়োজনের জন্য স্বামী, ছেলে বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যের ওপর নির্ভর করতে হত। লক্ষ্মীর ভান্ডার সেই অবস্থায় একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।

টাকার অঙ্ক খুব বড় না হলেও, সেই টাকা “নিজের নামে” আসে। এই মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় direct emotional linkage between voter and state। অর্থাৎ ভোটার মনে করেন রাষ্ট্র সরাসরি তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে।

এই জায়গাটাই বিজেপির জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।

কারণ কোনও প্রকল্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা সহজ, কিন্তু যে মহিলা প্রতি মাসে নিয়মিত টাকা পাচ্ছেন, তাঁকে বোঝানো কঠিন যে প্রকল্পটি ভুল। ফলে বিজেপি সরাসরি লক্ষ্মীর ভান্ডারের বিরোধিতা না করে “আরও উন্নত”, “আরও ন্যায়সঙ্গত” বিকল্প দেওয়ার পথ নিয়েছে।

অন্নপূর্ণা যোজনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সেখানেই।

বিজেপি সম্ভবত আশা করছে, যদি তারা লক্ষ্মীর ভান্ডারের তুলনায় বেশি আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং একই সঙ্গে বলে যে প্রকৃত দরিদ্ররাই শুধু এই সুবিধা পাবেন, তাহলে মহিলা ভোটের একটি অংশ আকৃষ্ট হতে পারে।

বিশেষ করে সমাজের সেই অংশে এর প্রভাব পড়তে পারে, যারা মনে করেন বর্তমান ব্যবস্থায় “অনেক অযোগ্য মানুষ” সুবিধা পাচ্ছেন। শহুরে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং কিছু গ্রামীণ পরিবারে এই ধরনের ক্ষোভ রয়েছে। বিজেপি সেই মনোভাবকে রাজনৈতিক সমর্থনে বদলাতে চাইছে।

কিন্তু এখানেই বড় সমস্যা।

অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার ফর্ম বহু মহিলার মধ্যে উল্টো ভয়ও তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলার কল্যাণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল—মানুষ সহজ প্রকল্প পছন্দ করেন। কম কাগজ, কম প্রশ্ন, কম অপমান—এই জিনিসগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লক্ষ্মীর ভান্ডারের আবেদন প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। ফলে বহু মহিলা প্রথমবার প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার দীর্ঘ ফর্ম, সম্পত্তির বিবরণ, পরিবারের ব্যাংক তথ্য, ভোটার তথ্য, জমির নথি এসব অনেকের কাছে আতঙ্কের কারণও হতে পারে।

বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় বহু পরিবার আছেন যাঁদের জমির কাগজ অসম্পূর্ণ, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য অগোছালো, বা পরিবারের সদস্যদের নথিতে অসঙ্গতি রয়েছে। তাঁরা আশঙ্কা করতে পারেন যে কঠোর যাচাইয়ের ফলে তাঁরা বাদ পড়ে যাবেন।

ফলে রাজনৈতিকভাবে একটি দ্বৈত প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

একদিকে কিছু ভোটার মনে করতে পারেন বিজেপি “সঠিক লোক” বেছে সাহায্য দিতে চাইছে।
অন্যদিকে বহু মহিলা ভাবতে পারেন—”লক্ষ্মীর ভান্ডার সহজ ছিল। নতুন প্রকল্পে এত ঝামেলা কেন?”

এই উপলব্ধিই শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আরও একটি বড় বিষয় হল বিশ্বাসযোগ্যতা।

লক্ষ্মীর ভান্ডার ইতিমধ্যেই চালু প্রকল্প। মানুষ টাকা হাতে পাচ্ছেন। অর্থাৎ এটি আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনা এখনও ঘোষণার স্তরে। ফলে বিজেপিকে প্রথমে মানুষকে বিশ্বাস করাতে হবে যে প্রকল্পটি সত্যিই চালু হবে, নিয়মিত টাকা আসবে এবং মাঝপথে বন্ধ হবে না।

মহিলা ভোটারদের মধ্যে “নিশ্চয়তা” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপাদান। অনিশ্চিত বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছোট কিন্তু নিয়মিত সুবিধা অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়।

তবে বিজেপির কৌশলের আরেকটি দিকও আছে।

অন্নপূর্ণা যোজনার মাধ্যমে তারা শুধু মহিলা ভোট টানতে চাইছে না; তারা কল্যাণ রাজনীতির ভাষাটাই বদলাতে চাইছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের ভাষা ছিল “সম্মান” ও “অধিকার”-এর। বিজেপি সেখানে “যোগ্যতা”, “ন্যায্যতা” এবং “দুর্নীতি-মুক্ত বণ্টন”-এর ভাষা আনছে।

এই ন্যারেটিভ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মহিলা ভোটারদের একাংশের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে যারা মনে করেন ওয়েলফেয়ার স্কিমে কঠোর যাচাই থাকা উচিৎ।

কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে ভোট হয় না। আবেগ, অভ্যাস এবং সামাজিক অভিজ্ঞতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্মীর ভান্ডার গত কয়েক বছরে সেই আবেগগত ভিত্তি তৈরি করে ফেলেছে।

ফলে বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল তারা কি “আরও ভালো প্রকল্প”-এর ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারবে, নাকি মানুষের মনে “অতিরিক্ত জটিল ও কড়াকড়ি প্রকল্প”-এর ধারণা তৈরি হবে?

এই লড়াই তাই শুধু দুই প্রকল্পের নয়। এটি বাংলার মহিলা ভোটব্যাঙ্কের মনস্তত্ত্ব নিয়ে লড়াই। একদিকে সহজ ও পরিচিত সামাজিক সুরক্ষা। অন্যদিকে কঠোর যাচাই-ভিত্তিক নতুন ওয়েলফেয়ার মডেল।

শেষ পর্যন্ত বাংলার মহিলারা কোনটিকে বেশি বিশ্বাস করবেন সেই উত্তরই ভবিষ্যতের রাজনীতিকে অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles