ইবোলা কেন ভয়ঙ্কর, কতটা প্রাণঘাতী

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: মানবসভ্যতা বহু ভয়ঙ্কর মহামারির মুখোমুখি হয়েছে।
- কিন্তু কিছু রোগ আছে যাদের নাম শুনলেই মানুষের মনে আতঙ্ক জন্মায়।
- কারণ, এটি শুধু সংক্রামক নয়, অত্যন্ত মারাত্মকও।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: মানবসভ্যতা বহু ভয়ঙ্কর মহামারির মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু কিছু রোগ আছে যাদের নাম শুনলেই মানুষের মনে আতঙ্ক জন্মায়। ইবোলা তেমনই একটি রোগ। কারণ, এটি শুধু সংক্রামক নয়, অত্যন্ত মারাত্মকও। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষের শরীরের ভিতরে এমন ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে যে কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকার কয়েকটি দেশে নতুন করে ইবোলা সংক্রমণ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে আবারও প্রশ্ন উঠছে—ইবোলা আসলে কী? কেন এত ভয়? আর ভারতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এর ঝুঁকি কতটা?
ইবোলা কী এবং কোথা থেকে এল
ইবোলা একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এর পুরো নাম “ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ” বা ইভিডি। প্রথম এই রোগ ধরা পড়ে ১৯৭৬ সালে আফ্রিকার দুই দেশে—বর্তমান কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং সুদান। কঙ্গোর একটি নদীর নাম ছিল ইবোলা। সেই নদীর নাম থেকেই রোগটির নামকরণ হয়। রোগটি মূলত একটি ভাইরাস পরিবারের অন্তর্গত, যাদের বলা হয় “ফিলোভাইরাস”। এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। অর্থাৎ বাদুড়ের শরীরে ভাইরাসটি থাকতে পারে, কিন্তু তারা নিজেরা অসুস্থ না-ও হতে পারে। সেখান থেকে বানর, শিম্পাঞ্জি, গরিলা কিংবা মানুষের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় জঙ্গলে সংক্রমিত প্রাণীর মৃতদেহ স্পর্শ করা বা তার মাংস খাওয়ার মাধ্যমেও রোগ ছড়িয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ শুরু হয় যখন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, ঘাম, বমি, লালা, মল, প্রস্রাব বা শরীরের অন্য তরলের সংস্পর্শে এলে অন্য মানুষও আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি মৃতদেহ স্পর্শ করলেও সংক্রমণ হতে পারে। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিতে মৃতদেহ ধোওয়া বা স্পর্শ করার প্রথা রয়েছে। ইবোলার বিস্তারে সেই কারণেও বহুবার সংক্রমণ বেড়েছে।
রোগের লক্ষণ কেমন হয়
ইবোলার উপসর্গ প্রথমে সাধারণ জ্বরের মতোই মনে হতে পারে। এটাই রোগটিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। সংক্রমণের পর সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। শুরুতে জ্বর, প্রবল দুর্বলতা, মাথাব্যথা, গা-হাত-পা ব্যথা, গলা ব্যথা হয়। অনেকের ক্ষেত্রে ঠান্ডা লাগা বা কাঁপুনিও হতে পারে। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। রোগ যত এগোয়, তত শরীরের ভিতরে রক্তনালীগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। তখন মাড়ি, নাক বা শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তপাত শুরু হতে পারে। যদিও সিনেমায় যেভাবে “সবাই রক্তবমি করে” এমন ছবি দেখানো হয়, বাস্তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে তা হয় না। কিন্তু গুরুতর অবস্থায় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ এবং অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে।
ইবোলা এত ভয়ঙ্কর কেন
ইবোলা এত ভয়ঙ্কর কেন? তার কয়েকটি কারণ আছে।
প্রথমত, এই রোগের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসে মৃত্যুহার আলাদা হলেও অতীতে অনেক প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের ২৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মারা গিয়েছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা পরিকাঠামো দুর্বল হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়।
দ্বিতীয়ত, রোগটি খুব দ্রুত শরীরকে ভেঙে দেয়। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, লিভার, কিডনি—সবকিছুর উপর একসঙ্গে আঘাত আসে। শরীরে জলের ঘাটতি ভয়াবহ আকার নেয়। রোগী অনেক সময় শকে চলে যান।
তৃতীয়ত, রোগটি ছড়ানোর ধরন অত্যন্ত বিপজ্জনক। একবার যদি হাসপাতালের ভিতরে সংক্রমণ শুরু হয়, তাহলে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী—সকলেই ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। ২০১৪-১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ভয়াবহ ইবোলা মহামারিতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। তখন লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওন এবং গিনির স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে।
চতুর্থত, ইবোলা নিয়ে মানুষের ভয় ও গুজবও বড় সমস্যা। অনেক জায়গায় মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পায়। কেউ কেউ মনে করেন এটি “অভিশাপ” বা “ষড়যন্ত্র”। ফলে সংক্রমণ লুকোনো হয়, চিকিৎসা দেরিতে শুরু হয়, রোগ আরও ছড়ায়।
তবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ইবোলা করোনার মতো সহজে বাতাসে ভেসে ছড়ায় না। সাধারণভাবে একই ঘরে থাকার ফলে সংক্রমণ হয় না। মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের সংস্পর্শ প্রয়োজন হয়। তাই সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিলে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ভারতের ঝুঁকি কতখানি
এখন প্রশ্ন—ভারতের ঝুঁকি কতখানি?
এই মুহূর্তে ভারতে ইবোলার ব্যাপক সংক্রমণ নেই। অতীতে কিছু সন্দেহজনক ঘটনা ঘটলেও বড় আকারের প্রাদুর্ভাব হয়নি। কিন্তু “ঝুঁকি নেই” এমন বলা যাবে না। কারণ ভারত একটি বিশাল জনসংখ্যার দেশ, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগও অত্যন্ত ব্যস্ত। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসূত্রে মানুষের যাতায়াত রয়েছে। ফলে কোনও সংক্রমিত ব্যক্তি ভারতে প্রবেশ করলে সতর্কতা প্রয়োজন।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি।
প্রথমত, ঘনবসতি। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর মতো শহরে মানুষ অত্যন্ত কাছাকাছি বসবাস করেন। সংক্রমণ ধরা পড়তে দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি হাসপাতালের উপর চাপ। ইবোলা মোকাবিলার জন্য বিশেষ আইসোলেশন ইউনিট, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বা পিপিই প্রয়োজন। সব জায়গায় সেই পরিকাঠামো সমান নয়।
তৃতীয়ত, গুজব ও আতঙ্ক। করোনার সময় ভারত দেখেছে কীভাবে ভুয়ো খবর দ্রুত ছড়াতে পারে। ইবোলার মতো রোগে আতঙ্ক আরও বেশি হতে পারে।
তবে আশার কথাও আছে। করোনা মহামারির পর ভারত সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় অনেক বেশি সতর্ক ও প্রস্তুত হয়েছে। বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং, সংক্রমণ নজরদারি, পরীক্ষাগার পরীক্ষা, আইসোলেশন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের মতো সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধের অবস্থা
ইবোলার কোনও “জাদু ওষুধ” বহু বছর ছিল না। এখন কিছু টিকা ও ওষুধ তৈরি হয়েছে, বিশেষত জাইর প্রজাতির ইবোলার বিরুদ্ধে কিছু ভ্যাকসিন কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু সব ধরনের ইবোলার জন্য সমান কার্যকর সমাধান এখনও নেই। তাই দ্রুত শনাক্তকরণ, রোগীকে আলাদা রাখা এবং সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণ—এই তিনটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
ইবোলার বড় শিক্ষা
সবশেষে, ইবোলা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। পৃথিবী যতই প্রযুক্তিতে এগোক, সংক্রামক রোগ এখনও মানবসভ্যতার অন্যতম বড় হুমকি। একটি ভাইরাস কোনও দেশের সীমানা মানে না। আফ্রিকার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে শুরু হওয়া সংক্রমণ কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক উদ্বেগে পরিণত হতে পারে। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, দ্রুত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



