বাড়ির ঋণের কিস্তি কি বাড়বে? ব্যাংকে রাখা টাকায় কি বেশি সুদ মিলবে? সংসারের খরচ কি আরও বাড়বে? রিজার্ভ ব্যাংকের সুদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে এই প্রশ্নগুলিই সামনে এসেছে। ৭ অক্টোবর, ২০২৬ রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট, অর্থাৎ ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছে আরবিআই। আগে এই হার ছিল ৫.২৫ শতাংশ। মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতেই এই পদক্ষেপ।

রেপো রেট হল সেই সুদের হার, যাতে রিজার্ভ ব্যাংক সরকারি সিকিউরিটিজের বিনিময়ে ব্যাংকগুলিকে স্বল্পমেয়াদি অর্থ ধার দেয়। এই হার বাড়লে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সুদেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে রেপো রেট ৫.৫০ শতাংশ মানে গ্রাহকও ওই সুদে ঋণ পাবেন, এমন নয়। ব্যাংক তার সঙ্গে নিজস্ব ব্যবধান যোগ করে ঋণের সুদ নির্ধারণ করে।

সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রেপো রেটের সঙ্গে যুক্ত পরিবর্তনশীল সুদের গৃহঋণে। চুক্তি অনুযায়ী সুদ পুনর্নির্ধারণের সময়ে ঋণের হার বাড়তে পারে। তখন মাসিক কিস্তি বা ইএমআই বাড়বে, অথবা একই কিস্তি রেখে শোধের মেয়াদ দীর্ঘ হবে। কখনও দুটোই হতে পারে। স্থির সুদের ঋণে চুক্তির নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সাধারণত সুদ অপরিবর্তিত থাকে। তাই পুরনো গাড়িঋণ বা ব্যক্তিগত ঋণমাত্রেই কিস্তি বাড়বে, এমন নয়।

একটি কাল্পনিক হিসাব বিষয়টি পরিষ্কার করবে। কারও বকেয়া গৃহঋণ ৩০ লক্ষ টাকা, বাকি মেয়াদ ২০ বছর এবং সুদ ৮.৫০ শতাংশ হলে মাসিক কিস্তি প্রায় ২৬ হাজার ৩৫ টাকা। সুদ বেড়ে ৮.৭৫ শতাংশ হলে একই মেয়াদে কিস্তি হবে প্রায় ২৬ হাজার ৫১১ টাকা। অর্থাৎ মাসে প্রায় ৪৭৭ টাকা বাড়তি। এটি উদাহরণমাত্র; প্রকৃত পরিবর্তন নির্ভর করবে বকেয়া ঋণ, মেয়াদ ও ব্যাংকের শর্তের উপর।

কিস্তি একই রেখে মেয়াদ বাড়ালে মাসের বাজেটে তাৎক্ষণিক চাপ কম থাকে। কিন্তু ঋণ বেশি দিন চলায় মোট সুদের খরচ বাড়ে। আরবিআইয়ের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনশীল সুদের কিস্তিভিত্তিক ব্যক্তিগত ঋণে সুদ বদলের প্রভাব গ্রাহককে জানাতে হবে এবং কিস্তি বা মেয়াদ পরিবর্তনসহ প্রযোজ্য বিকল্প দিতে হবে। তাই ব্যাংকের নতুন পরিশোধসূচি দেখে বোঝা দরকার, মাসে কত দিতে হবে এবং ঋণ শেষ হবে কবে।

আমানতকারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সুদের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংক নতুন এফডি বা মেয়াদ শেষে নবীকরণের সুদ বাড়াতে পারে। তবে সব ব্যাংক একই দিনে বা সমান হারে সুদ বাড়াবে, তার নিশ্চয়তা নেই। পুরনো স্থির সুদের এফডিতে চুক্তিবদ্ধ হারই সাধারণত মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকে। ফলে আজ রেপো রেট বাড়ল বলে আগামীকাল পুরনো এফডির সুদ বাড়বে না।

ধরা যাক, নতুন এক বছরের আমানতের সুদ ০.২৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ল। পাঁচ লক্ষ টাকায় সরল সুদের হিসাবে বছরে বাড়তি আয় হবে ১,২৫০ টাকা, কর কাটার আগে। কিন্তু বেশি সুদের জন্য পুরনো এফডি ভাঙলে জরিমানা ও সুদের পুনর্গণনায় সুবিধার একাংশ হারাতে পারে। তাই শুধু নতুন হার দেখলে চলবে না, ভাঙানোর খরচও দেখতে হবে।

সংসারের বাজেটে প্রভাব তাই দু’দিক থেকে আসতে পারে। ঋণের কিস্তি বাড়লে অন্য খরচ বা সঞ্চয়ের জন্য হাতে কম টাকা থাকবে। আবার নতুন আমানতে বেশি সুদ মিললে কিছু পরিবারের আয় বাড়বে। সুদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ধার ও ব্যয়ের গতি কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা। তবে এতে সঙ্গে সঙ্গে চাল, ডাল বা জ্বালানির দাম কমে যায় না। মূল্যবৃদ্ধির হার কমা মানেও দাম আগের জায়গায় ফিরে আসা নয়; দাম বাড়ার গতি কমা।

এই মুহূর্তে পরিবারের হিসাব বোঝার জন্য সবচেয়ে দরকারি দুটি কাগজ হল ঋণের সংশোধিত পরিশোধসূচি এবং ব্যাংকের নতুন আমানতের সুদের তালিকা। আরবিআইয়ের ঘোষণা প্রত্যেকের পকেটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তার স্পষ্ট উত্তর সেখানেই পাওয়া যাবে।