International

অণুর ডান-বাঁ হাতের রহস্য!

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • অণুর গঠনে সামান্য এক অসাম্য কী ভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে?
  • আর সেই প্রক্রিয়ার সূত্র ধরেই কী ভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব জীবজগতের অণুগুলিতে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসের আধিপত্য?
  • এই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার গবেষণার জন্য ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেলেন ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

অণুর গঠনে সামান্য এক অসাম্য কী ভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে? আর সেই প্রক্রিয়ার সূত্র ধরেই কী ভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব জীবজগতের অণুগুলিতে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসের আধিপত্য? এই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার গবেষণার জন্য ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেলেন ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস জানিয়েছে, অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে অরৈখিক প্রভাব ও স্ব-অনুঘটনের আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান।

কাগান সাবেক প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। অন্য দিকে, সোয়াই টোকিয়ো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের এমেরিটাস অধ্যাপক। পুরস্কারের অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে নেবেন দুই বিজ্ঞানী।

তাঁদের গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে ‘কাইরাল’ অণু। সহজ করে বললে, এমন অণু যাদের দুটি বিন্যাস পরস্পরের দর্পণ-প্রতিবিম্ব, অনেকটা আমাদের ডান হাত ও বাঁ হাতের মতো। এই দুই রূপের নাম ‘এনান্টিওমার’। দেখতে প্রায় একই রকম হলেও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কিংবা জীবদেহের অন্য অণুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় তাদের আচরণ হতে পারে সম্পূর্ণ আলাদা।

জীবজগতে এই পার্থক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের শরীরের প্রোটিন তৈরি হয় মূলত এক নির্দিষ্ট বিন্যাসের অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। কোষের রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়ানো উৎসেচক এবং শরীরে রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করা রিসেপ্টরও কাইরাল। ফলে কোনও কাইরাল ওষুধের দুই এনান্টিওমার শরীরে প্রবেশ করে একই ভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি কাঙ্ক্ষিত ফল দিলেও অন্যটি কম কার্যকর হতে পারে, এমনকি আলাদা প্রতিক্রিয়াও ঘটাতে পারে।

সমস্যা হল, প্রচলিত রাসায়নিক পদ্ধতিতে অনেক সময় দুই এনান্টিওমারের মিশ্রণ তৈরি হয়। অথচ ওষুধ থেকে কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিন্যাসের অণুটি আলাদা করে তৈরি করা জরুরি। রসায়নবিদদের কাছে তাই বড় প্রশ্ন ছিল, কী ভাবে একটি নির্দিষ্ট রূপের অণু তৈরির প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর পাশাপাশি ছিল আরও মৌলিক এক ধাঁধা: জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বহু অণুর ক্ষেত্রে কেন তাদের দুই সম্ভাব্য বিন্যাসের মধ্যে একটিরই এত আধিপত্য?

১৯৮৬ সালে কাগান ও তাঁর গবেষকদল এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান। রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়াতে ব্যবহৃত অনুঘটকের কাইরাল অংশগুলি পরস্পরের সঙ্গে জোড়া বাঁধতে পারে। গবেষকেরা দেখান, একই বিন্যাসের দুটি অংশ দিয়ে তৈরি জোড়া এবং বিপরীত বিন্যাসের দুটি অংশ দিয়ে তৈরি জোড়ার কার্যকারিতা এক নয়।

এই পার্থক্যই তৈরি করতে পারে বড়সড় ফল। বিপরীত বিন্যাসের জোড়াগুলি যদি তুলনায় কম সক্রিয় হয়, তবে অনুঘটকের কার্যকারিতায় একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসের প্রাধান্য বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়ে বিক্রিয়ার উৎপন্ন পদার্থেও। অর্থাৎ, অণুর স্তরে সামান্য পার্থক্য থাকলেও রাসায়নিক বিক্রিয়া সেই পার্থক্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

পরবর্তী গবেষণায় এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা বিক্রিয়ার কার্যপ্রণালি আরও গভীর ভাবে বুঝতে পেরেছেন। সেই জ্ঞান ব্যবহার করে বিক্রিয়ার শর্ত ও পদ্ধতি বদলে কাঙ্ক্ষিত এনান্টিওমারের উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।

এই গবেষণার সূত্র ধরেই আরও এক ধাপ এগোন সোয়াই ও তাঁর সহকর্মীরা। ১৯৯৫ সালে তাঁরা দেখান, একটি কাইরাল অণু নিজের মতো একই বিন্যাসের আরও অণু তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। অর্থাৎ, বিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া অণুই আবার সেই একই ধরনের অণু তৈরির অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্ব-অনুঘটন।

‘সোয়াই বিক্রিয়া’ নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ায় সামান্য প্রাথমিক অসাম্যও দ্রুত বড় হয়ে উঠতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুরুতে ডানহাতি অণুর আধিক্য বাঁহাতি অণুর তুলনায় মাত্র ০.০০০০৫ শতাংশ হলেও, তিন দফা বিক্রিয়ার পর মোট অণুর ৯৯.৭৫ শতাংশই ডানহাতি হতে পারে। অর্থাৎ, গোড়ায় প্রায় নজরেই না পড়া একটি পার্থক্য শেষ পর্যন্ত বিপুল আধিপত্য তৈরি করতে পারে।

কাগানের গবেষণার গুরুত্ব মূলত রাসায়নিক সংশ্লেষণের ক্ষেত্রে। তাঁর কাজের সূত্র ধরে নির্দিষ্ট এনান্টিওমার আরও দক্ষ ভাবে তৈরি করার পদ্ধতি বিকশিত হয়েছে। ওষুধ, কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক এবং সুগন্ধি তৈরির মতো ক্ষেত্রে এই গবেষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সোয়াইয়ের গবেষণা আবার অন্য এক মৌলিক সম্ভাবনার দিকে নজর টেনেছে—পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি। কয়েকশো কোটি বছর আগে কোনও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় দুই এনান্টিওমারের অনুপাত সামান্য এদিক-ওদিক হয়ে গিয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সেই সামান্য ভারসাম্যহীনতা যদি স্ব-অনুঘটনের মাধ্যমে ক্রমশ বেড়ে গিয়ে থাকে, তবে তা জীবজগতের অণুগুলিতে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসের আধিপত্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, অণুর ডান হাত না বাঁ হাত—এই আপাত সামান্য পার্থক্য শুধু রসায়নের পরীক্ষাগারে ওষুধ তৈরির প্রশ্ন নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জীবনের মৌলিক গঠন সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াও। দুই বিজ্ঞানীর গবেষণা দেখিয়েছে, প্রকৃতিতে কখনও কখনও অতি ক্ষুদ্র এক অসাম্যই বদলে দিতে পারে গোটা ব্যবস্থার ভারসাম্য।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles