আকাশজুড়ে আগুন, ইউক্রেনে ২৮ মৃত্যু

যা জানা জরুরি
- ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৮।
- বুধবার, ৭ অক্টোবরের এই হামলার প্রথম দিকের খবরে ২৪ জন নিহতের কথা জানা গিয়েছিল।
- পরে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, মৃতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৮। বুধবার, ৭ অক্টোবরের এই হামলার প্রথম দিকের খবরে ২৪ জন নিহতের কথা জানা গিয়েছিল। পরে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, মৃতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। হামলায় দেশজুড়ে প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছে উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে। সেখানে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেটি কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। আঞ্চলিক গভর্নরের সর্বশেষ হিসাবে, শুধু এই হামলাতেই ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচটি শিশু। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খুঁজতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্ধারকাজ চালান জরুরি পরিষেবার কর্মীরা।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া হামলায় রাশিয়া বিভিন্ন দিক থেকে একাধিক ধরনের দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ছোড়া হয় ১৩০টি ড্রোন, ৪৮টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ড্রোনগুলির মধ্যে ৪৬টি ছিল জেটচালিত। কিয়েভ, খারকিভ, পোলতাভা এবং দনিপ্রোপেত্রোভস্ক ছিল হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী জানিয়েছে, তারা ১১৭টি ড্রোন, ৩৯টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে। কিন্তু এত বিপুল প্রতিরোধ সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত লাগে।
রাজধানী কিয়েভেও হামলার চিহ্ন স্পষ্ট। দারনিৎস্কি জেলায় একটি গ্যারাজ চত্বরে আগুন লাগে। সেখান থেকে দু’জনকে জীবিত উদ্ধার করার পর আরও দু’জনের দেহ উদ্ধার করেন কর্মীরা। একই জেলার একটি আবাসিক এলাকার মধ্যে একটি অবিস্ফোরিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেটির বিস্ফোরক অংশ নিরাপদে সরিয়ে নিতে বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করেন।
কিয়েভ অঞ্চলের ওবুখিভ জেলায় উৎপাদনকেন্দ্র ও গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পোলতাভা অঞ্চলের ক্রেমেনচুকেও প্রাণহানি হয়েছে—স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে দু’জন নিহত এবং সাতজন আহত। একটি পরিবারের বাড়িও ধ্বংস হয়েছে। অর্থাৎ রাজধানীর পাশাপাশি দেশের একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে হয়েছে প্রশাসনকে।
হামলার অভিঘাত পৌঁছেছে বিদ্যুৎ পরিষেবাতেও। ফিন্যানশিয়াল টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হওয়ায় কিয়েভের কয়েকটি এলাকা অন্ধকারে চলে যায়। আবাসিক ভবনের পাশাপাশি জ্বালানি পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলেনস্কির দাবি, রাশিয়ার হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থা।
ফলে ধ্বংস শুধু কয়েকটি ভবন বা সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা সচল রাখার ক্ষমতার উপরও চাপ বাড়ছে। কিয়েভ ইতিমধ্যেই পশ্চিমা দেশগুলির কাছে মস্কোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়েছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন পেট্রিয়ট ব্যবস্থার আরও গোলাবারুদ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইউক্রেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই অভিযানকে ‘ব্যাপক হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মস্কোর দাবি, স্থল, জল ও আকাশ থেকে নির্ভুল নিশানার অস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ফায়ার পয়েন্ট সংস্থার ফ্লেমিঙ্গো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন তৈরির এবং মজুতের জায়গা। ওডেসা অঞ্চলের বন্দর, জাহাজ মেরামতের পরিকাঠামো এবং ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত জাহাজেও হামলা চালানোর দাবি করেছে রাশিয়া।
বড় হামলার আশঙ্কা অবশ্য আগেই ছিল। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগের দিনই সম্ভাব্য বড় আক্রমণের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন জেলেনস্কি। কিন্তু সেই আগাম সতর্কতার পরও হামলার পুরো ব্যাপ্তি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ৭৪তম জন্মদিনে হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন জেলেনস্কি। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনও সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করার কৌশল হিসেবে এই হামলার সমালোচনা করেছেন।
তবে কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ থামানোর কোনও তাৎক্ষণিক সম্ভাবনা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে এক রাতের হামলার পর ইউক্রেনকে একসঙ্গে তিনটি фрон্টে লড়তে হচ্ছে—ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো জরুরি পরিষেবা ফের সচল করা এবং পরবর্তী হামলা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা। আকাশ থেকে ঝরে পড়া ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এখন লড়াই করতে হচ্ছে যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসের সঙ্গেও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



