নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত মামলায় দুই বিচারপতির বেঞ্চের বিভক্ত রায় প্রত্যাহারের আবেদন জমা পড়েছে সুপ্রিম কোর্টে। আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই বেঞ্চের অন্যতম সদস্য বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে তাঁর ছেলের পেশাগত সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেননি।

আবেদনে বলা হয়েছে, “আবেদনকারীরা নথিভুক্ত করে জানাচ্ছেন যে, মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টে নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী আইনজীবী হিসেবে মাননীয় বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার ছেলে নিযুক্ত থাকার বিষয়টি এই মামলার পাঁচটি শুনানির কোনও পর্যায়েই বিচারপতি মামলার পক্ষগুলিকে জানাননি।”

নমন শ্রেষ্ঠের দায়ের করা আবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিচারপতি শর্মার ছেলের সম্পর্কের কথা আগে জানা থাকলে আবেদনকারীরা বিচারপতিকে মামলার শুনানি থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ করতেন। তাঁদের বক্তব্য, তথ্যটি প্রকাশ না করায় বিভক্ত রায় ঘোষণার আগে সেই অনুরোধ জানানোর সুযোগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও কার্যকালের বিষয়ে ২০২৩ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলিতে বিভক্ত রায় দেন বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা।

আজ প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আবেদনটির কথা আদালতে উল্লেখ করলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানান, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড পবন রেলির মাধ্যমে দায়ের করা আবেদনে বেঞ্চের যৌথ আদেশ এবং বিচারপতি শর্মার পৃথক মতামত প্রত্যাহারের আর্জি জানানো হয়েছে। ওই যৌথ আদেশে মামলাটি পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে পাঠানো হয়েছিল। তবে আবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বিচারপতি দত্তের মতামত প্রত্যাহার চাওয়া হচ্ছে না।

আবেদনকারীরা জানিয়েছেন, তাঁদের অভিযোগ কেবল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিচারপতি শর্মার ছেলের পেশাগত সম্পর্ক প্রকাশ না করা নিয়ে। বিচারপতির বিরুদ্ধে পক্ষপাত, কোনও অসৎ উদ্দেশ্য কিংবা সদিচ্ছার অভাবের অভিযোগ আরোপের চেষ্টা তাঁরা করছেন না।

আবেদনে বলা হয়েছে, “অভিযোগের পরিধি অনেক সীমিত: যে প্রতিষ্ঠানের আইননির্ধারিত গঠন এবং সেই প্রতিষ্ঠানের পদাধিকারীদের নিয়োগ সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাননীয় বিচারপতির নিকটতম পরিবারের এক সদস্যের পেশাগত সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায়, বিচারপতির কি বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন মামলার পক্ষগুলিকে সেই সম্পর্কের কথা জানানো উচিত ছিল?”

আবেদনকারীদের বক্তব্য, বিভক্ত রায় ঘোষণার পরে লাইভল-এর একটি প্রতিবেদন থেকে তাঁরা বিচারপতি শর্মার ছেলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সম্পর্কের কথা জানতে পারেন। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, ‘নির্বাচন কমিশন ও মেধা রূপমের মামলা শুনেছেন বিচারপতি এস সি শর্মা, তাঁর ছেলে কমিশনের আইনজীবী: উঠছে বিচারিক ঔচিত্যের প্রশ্ন’।

ওই প্রতিবেদন পড়ার পরে তাঁরা নিজেরাও বিষয়টি যাচাই করেন বলে আবেদনে জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, সেই যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিচারপতি শর্মার ছেলে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টে নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী আইনজীবী।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিচারপতির ছেলেকে ২০২৪ সালের ১০ জুলাই নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী আইনজীবী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। আবেদনকারীরা হাই কোর্টের এমন কিছু আদেশও খুঁজে পান, যেগুলিতে কমিশনের হয়ে তাঁর সওয়াল করার উল্লেখ রয়েছে।

প্রকাশ্য নথি অনুযায়ী, বিচারপতি শর্মার ছেলে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টে নিয়মিত নির্বাচন কমিশনের হয়ে উপস্থিত হয়েছেন বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই বক্তব্যের সমর্থনে ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই এবং ১ সেপ্টেম্বরের দু’টি আদেশের প্রতিলিপি আবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের যুক্তি, এ ক্ষেত্রে বাস্তবে পক্ষপাত বা বিরূপ মনোভাব ছিল কি না, তার প্রমাণ দেওয়া আবশ্যক নয়। সমস্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য সম্পর্কে অবহিত একজন ন্যায়নিষ্ঠ ও সচেতন ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টির মূল্যায়ন করতে হবে।

আবেদনে বিচারকদের আচরণবিধি সংক্রান্ত ‘রিস্টেটমেন্ট অব ভ্যালুজ অব জুডিশিয়াল লাইফ’-এরও উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, এই নীতিমালা অনুযায়ী বিচারকদের নিশ্চিত করতে হবে, কেবল ন্যায়বিচার হলেই চলবে না, ন্যায়বিচার যে হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মানও হতে হবে। বিচারকের নিকটতম পরিবারের সদস্যের আইনজীবী হিসেবে কাজ করা এবং পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা বন্ধু সংশ্লিষ্ট রয়েছেন এমন মামলা বিচারকের শোনার বিষয়ে নীতিমালার বিধানগুলির উল্লেখ করা হয়েছে আবেদনে।

এই প্রেক্ষাপটে বিচারপতি শর্মার মতামত প্রত্যাহার এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত মামলাটি দুই বিচারপতির বেঞ্চে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করার আবেদন জানানো হয়েছে।