শ্চিমবঙ্গে কথিত কয়লা ও গরু পাচার থেকে অর্থ তছরুপের দুই মামলায় তৃণমূল যুব কংগ্রেসের প্রাক্তন নেতা বিনয় মিশ্রকে ‘পলাতক আর্থিক অপরাধী’ ঘোষণা করার জন্য দিল্লির বিশেষ আদালতের দ্বারস্থ হল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। গত ২ সেপ্টেম্বর পলাতক আর্থিক অপরাধী আইন, ২০১৮-র ৪ ও ১২ ধারায় আবেদনটি দাখিল করা হয়েছে। বিনয়কে ওই আইনে পলাতক ঘোষণা করার পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে থাকা তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অনুমতিও চেয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।

ইডির আবেদনের ভিত্তিতে আদালত প্রথমে বিনয়কে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিস জারি করতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি হাজির না হলে এবং তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য ও নথিপত্রে আদালত সন্তুষ্ট হলে তাঁকে পলাতক আর্থিক অপরাধী ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে ইডির আবেদন দাখিল হওয়ার অর্থ এই নয় যে আদালত ইতিমধ্যেই বিনয়কে ওই তকমা দিয়ে দিয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর পক্ষকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে।

বড় অঙ্কের আর্থিক অপরাধে অভিযুক্ত কোনও ব্যক্তি বিদেশে থেকে ভারতীয় বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলে তাঁকে দেশে ফেরানো এবং তাঁর সম্পত্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে এই আইন তৈরি হয়। কোনও তালিকাভুক্ত অপরাধে জড়িত অর্থের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে আইনটি প্রয়োগ করা যায়। আদালত এক বার কাউকে পলাতক আর্থিক অপরাধী ঘোষণা করলে তাঁর অপরাধলব্ধ সম্পদের পাশাপাশি আইনে নির্দিষ্ট অন্যান্য সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করার পথ খুলে যায়। ঘোষিত পলাতক ব্যক্তি ভারতীয় আদালতে কোনও দেওয়ানি দাবি পেশ করা বা তা রক্ষা করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।

বিনয়ের বিরুদ্ধে ইডির প্রধান অভিযোগ, পশ্চিম বর্ধমানের ইস্টার্ন কোলফিল্ডসের কুনুস্তোরিয়া ও কাজোরা এলাকায় বেআইনিভাবে কয়লা তোলা ও পাচার করে অর্জিত বিপুল অর্থের একটি অংশ তাঁর কাছে পৌঁছেছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, বিনয় এবং তাঁর ভাই বিকাশ মিশ্র নিজেদের ও কয়েক জন প্রভাবশালী ব্যক্তির হয়ে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকার অপরাধলব্ধ অর্থ গ্রহণ করেছিলেন। সামগ্রিক কয়লা পাচারের পরিমাণ প্রায় ১,৩৫২ কোটি টাকা বলে ইডির অনুমান। এই অভিযোগ এখনও বিচারাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

২০২০ সালের নভেম্বরে সিবিআইয়ের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে অর্থ তছরুপের তদন্ত শুরু করেছিল ইডি। তদন্তকারীদের দাবি, কয়লা পাচারের নেপথ্যে অনুপ মাজি ওরফে লালার নেতৃত্বাধীন একটি সংগঠিত চক্র সক্রিয় ছিল। কয়লা খনি ও রেলপথ সংলগ্ন এলাকা থেকে বেআইনিভাবে কয়লা তুলে বিক্রি করা হত এবং তার অর্থ বিভিন্ন হাত ঘুরে প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছত। বিনয় এই অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে ইডির অভিযোগ।

সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার সংক্রান্ত পৃথক মামলাতেও বিনয় অভিযুক্ত। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে আটক গবাদি পশুর মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখিয়ে নিলাম করা হত। কয়েক জন শুল্ক আধিকারিকের সাহায্যে পাচারকারীরা কম দামে ওই পশু কিনে বাংলাদেশে পাঠাত। ইডির হিসাবে এই মামলায় অপরাধলব্ধ অর্থের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকার বেশি। ২০২১ সালের মার্চে কলকাতায় বিনয় ও বিকাশের একটি স্থাবর সম্পত্তিও সংযুক্ত করেছিল সংস্থাটি।

বিনয় ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভারত ছাড়েন বলে তাঁর আইনজীবীরা আগে আদালতে জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন এবং পরে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট সমর্পণ করেন বলেও দাবি করা হয়েছিল। সেই কারণে তাঁকে এমন ব্যক্তি বলা ঠিক নয়, যিনি ফৌজদারি বিচার এড়াতেই দেশ ছেড়েছেন—এটাই হতে পারে তাঁর পক্ষের অন্যতম আইনি যুক্তি।

অন্য দিকে, বারবার সমন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও বিনয় তদন্তে যোগ দেননি বলে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির অভিযোগ। ২০২২ সালে দিল্লির একটি আদালত অর্থ তছরুপের মামলায় তাঁকে ঘোষিত অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল। গরু পাচার মামলায় সিবিআই তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে রেড কর্নার নোটিসও জারি করায়।

এ বার পলাতক আর্থিক অপরাধী আইনে ইডির আবেদন মঞ্জুর হলে বিনয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। তাঁর বিদেশে থাকা সম্পত্তি চিহ্নিত ও বাজেয়াপ্ত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সহায়তা চাইতে পারবে ভারত। একই সঙ্গে তাঁকে দেশে ফেরানোর কূটনৈতিক ও আইনি প্রচেষ্টাতেও নতুন মাত্রা যোগ হবে। তবে ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব, ভারত ছাড়ার সময় এবং তদন্ত শুরুর তারিখ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই আদালতে মূল আইনি লড়াই জমে উঠতে পারে।