জনগণনা ও এসআইআর বিতর্কের মধ্যেই দেশজুড়ে এনআরসি চাইল আরএসএস

যা জানা জরুরি
- জনবিন্যাসের ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা এবং দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নাগরিকদের চিহ্নিত করতে এনআরসি জরুরি বলে দাবি সঙ্ঘের।
- ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টসের (আইজিএনসিএ) একটি অনুষ্ঠানে আরএসএসের প্রচারপ্রধান সুনীল আম্বেকর বলেছেন, ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ‘ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত’ হয়েছে, তাঁদের চিহ্নিত…
- পাশাপাশি, প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে ভারতে আসা মানুষদের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র আওতায় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জনবিন্যাসের ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা এবং দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নাগরিকদের চিহ্নিত করতে এনআরসি জরুরি বলে দাবি সঙ্ঘের।
ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টসের (আইজিএনসিএ) একটি অনুষ্ঠানে আরএসএসের প্রচারপ্রধান সুনীল আম্বেকর বলেছেন, ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম ‘ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত’ হয়েছে, তাঁদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে ভারতে আসা মানুষদের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র আওতায় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
আম্বেকর বলেন, “যখন জনবিন্যাসের ভারসাম্যহীনতার সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়, তখন বলা হয়, একটি জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থাকা উচিত।” তাঁর দাবি, জনবিন্যাসের ভারসাম্যহীনতার কারণেই ভারত ভাগ হয়েছিল। তাঁর যুক্তি, ১৯৪৭ সালের পর যে প্রতিবেশী দেশগুলি ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হয়, সেখানে থেকে যাওয়া বহু মানুষ তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁরা পরবর্তী সময়েও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, “যাঁরা ফিরে এসেছেন, সিএএ-র মাধ্যমে তাঁদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এনআরসি-র মাধ্যমে এই ধরনের মানুষদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ভোটার তালিকায় যদি কারও নাম ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তা হলে তাঁদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।”
আম্বেকর বলেন, এই প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি থাকলে আদালত-সহ প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। কিন্তু তাঁর যুক্তি, “নিছক রাজনৈতিক কারণে” কোনও অ-নাগরিককে নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া ভুল হবে।
জনবিন্যাসের পরিবর্তনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন হিসেবেও তুলে ধরতে চেয়েছেন এই আরএসএস নেতা। তাঁর দাবি, ভারতে জনবিন্যাসের পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং মুসলিম আক্রমণের সময় থেকেই তার সূত্রপাত। তিনি বলেন, ভারতের ক্ষেত্রে জনবিন্যাসের ভারসাম্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯৪৭ সালে ধর্ম ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে দেশভাগ হয়েছিল।
তিনি বলেন, “প্রত্যেক জাতির একটি পরিচিতি থাকে। যাঁরা দেশের সংস্কৃতিকে নিজের বলে মনে করেন, জনসংখ্যায় তাঁদের ভারসাম্য বজায় থাকলে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতিও অক্ষুণ্ণ থাকে।” তাঁর বক্তব্য, ভারতের সংস্কৃতি রক্ষার প্রয়াসকে সাম্প্রদায়িক বলা যায় না।
স্বাধীনতার পর একের পর এক সরকার জনসংখ্যা ও জনগণনা নিয়ে কোনও ‘সুনির্দিষ্ট নীতি’ প্রণয়ন করেনি বলেও সমালোচনা করেন আম্বেকর। তিনি বলেন, বিশেষ করে জরুরি অবস্থার আগে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে ভারতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, ২০০০ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে জাতীয় জনসংখ্যা কমিশন গঠনের আগে পর্যন্ত কোনও সার্বিক জনসংখ্যা নীতি তৈরি হয়নি।
স্বাধীনতার পর আইনি কাঠামোয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গেও জনবিন্যাসের ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক টেনেছেন তিনি। বিবাহের ক্ষেত্রে অভিন্ন আইনের অনুপস্থিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত সংবিধানের ২৯ ও ৩০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা এবং স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার নির্বাচনে প্রযোজ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিধানের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তাঁর যুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে তৈরি নীতিগুলি বৈষম্য বাড়িয়েছে।
আম্বেকর বলেন, “কিছু মানুষকে চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার আগে এ ধরনের কোনও আইন ছিল না। অথচ হিন্দুদের বলা হয়েছিল, একাধিক বিয়ে করলে তা শাস্তিযোগ্য হবে। আইন সকলের জন্য অভিন্ন হওয়া উচিত।”
অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলার পদ্ধতিরও সমালোচনা করেন আম্বেকর। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৮৩ সালের ইললিগ্যাল মাইগ্র্যান্টস (ডিটারমিনেশন বাই ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট বা আইএমডিটি আইনের উল্লেখ করেন। অসমে এই আইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের পর সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত সেটি বাতিল করে। তাঁর অভিযোগ, অবৈধ অভিবাসনকে উপেক্ষা করাও ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার ভিত্তিতে তৈরি নীতির অঙ্গ।
দেশজুড়ে এনআরসি চালু করার দাবি বহু বছর ধরেই জানিয়ে আসছে আরএসএস। ২০১৯ সালে সঙ্ঘের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সুরেশ ভাইয়াজি জোশী বলেছিলেন, যাঁরা ভারতীয় নাগরিক নন, তাঁদের চিহ্নিত করতে এনআরসি প্রস্তুত করা সরকারের দায়িত্ব। পরে, ২০২১ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, প্রকৃত নাগরিক কারা, তা নির্ধারণ করাই এনআরসি-র উদ্দেশ্য। একে হিন্দু-মুসলমানের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
২০১৯-২০ সালে সিএএ এবং প্রস্তাবিত এনআরসি-র বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদের পর বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁর সরকার এনআরসি নিয়ে কোনও আলোচনা করেনি। পরবর্তী সময়ে বিজেপিও তাদের ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইস্তাহার থেকে এই প্রস্তাব বাদ দেয়।
তবে জনগণনার প্রক্রিয়া ঘিরে এনআরসি-র প্রশ্নটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বর্তমান জনগণনার প্রশ্নাবলিতে এমন বেশ কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে, যা ২০২০ সালের জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি বা এনপিআর-এর প্রশ্নাবলিতেও ছিল। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয়তা, বাবা-মায়ের তথ্য, আধার এবং ভোটার পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্য। প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী, জাতীয় ভারতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরির জন্য জনসংখ্যাপঞ্জির তথ্য যাচাই করার বিধান রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হতে পারে, তা চিহ্নিত করার ব্যবস্থাও আছে।
তবে এই মুহূর্তে দেশজুড়ে এনআরসি চালু করার ঘোষণা দিয়ে সরকারের কোনও বিজ্ঞপ্তি নেই। ২০২১ সালের জনগণনার সঙ্গে যে এনপিআর প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল, কোভিড-১৯ অতিমারির সময় তা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে জনগণনার প্রক্রিয়া ফের শুরু হলেও এনপিআর-এর জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



