ন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের নির্বাচনী হলফনামায় বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে অসঙ্গতির অভিযোগ এবার কলকাতা হাইকোর্টে পৌঁছেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর কংগ্রেস নেতা ও আইনজীবী ঋতজু ঘোষাল বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের এজলাসে বিষয়টি উল্লেখ করলে আদালত আবেদন দাখিলের অনুমতি দেয়। নতুন ঘটনাটি অভিযোগের বিচার শুরু বা প্রার্থীপদ বাতিল নয়; আবেদনটি নিয়মমাফিক নথিভুক্ত করে আদালতের বিবেচনায় আনার প্রথম ধাপ।

কংগ্রেসের বক্তব্য, হলফনামায় রথের বয়স ষাট বছর বলা হলেও মাধ্যমিক পাশের বছর লেখা হয়েছে ১৯৬৫। সেই হিসাবে বয়স ও পরীক্ষার বছরের মধ্যে বাস্তব অসম্ভবতা দেখা যাচ্ছে বলে তারা দাবি করেছে। আরও অভিযোগ, যে বিদ্যালয়ের নাম দেওয়া হয়েছে, সেটি ওই সময়ে দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্বীকৃত ছিল না। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষ জানিয়েছে, তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিলের নির্দেশ চাওয়া হবে। কিন্তু এই দাবিগুলি এখনও আদালতের যাচাই বা নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পায়নি।

বিজেপি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পরীক্ষার বছর লেখায় মুদ্রণগত ভুল হয়েছে। দলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রথের জন্ম ১৯৬৫ সালে এবং তিনি ১৯৮০ সালে দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অর্থাৎ বিরোধের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে, তবে শুধু রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে হলফনামা সংশোধিত হয় না। মূল নথি, বিদ্যালয়ের রেকর্ড এবং প্রযোজ্য নির্বাচনী বিধির ভিত্তিতেই কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি ২২ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের কাছেও অভিযোগ জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের সময়ে বিষয়টি চোখে পড়া উচিত ছিল। বিজেপির পাল্টা অভিযোগ, পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে বিরোধীরা নেতিবাচক প্রচার করছে। দুই দলের এই ভাষা রাজনৈতিক অবস্থান; কোনও পক্ষের বক্তব্যই নিজে থেকে সত্যতার প্রমাণ নয়।

উপনির্বাচনের ভোট ৬ অক্টোবর, প্রচার শেষ ৪ অক্টোবর এবং গণনা ৯ অক্টোবর। এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমার কারণে আবেদনকারী জরুরি শুনানি চেয়েছে। আদালতও জানতে চেয়েছে, আবেদনকারীর নির্দিষ্ট প্রতিকার কী। নির্বাচনী বিরোধে সময় গুরুত্বপূর্ণ হলেও দ্রুততার নামে প্রমাণ পরীক্ষা বাদ দেওয়া যায় না। আবার ভোট হয়ে যাওয়ার পরে কার্যকর প্রতিকার কঠিন হতে পারে—এই বাস্তবতাও আদালতের সামনে থাকবে।

নির্বাচনী হলফনামার উদ্দেশ্য ভোটারকে প্রার্থীর পরিচয়, সম্পদ, দায়, মামলা ও শিক্ষাগত তথ্য জানার সুযোগ দেওয়া। কোনও ঘরে ভুল থাকলে সেটি নিছক অক্ষরবিভ্রাট, নাকি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভুল উপস্থাপন—দুই অবস্থার আইনি ফল একই নয়। ভুলটি কে করেছে, প্রার্থী তা জানতেন কি না এবং সংশোধনের বৈধ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক।

মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় রিটার্নিং অফিসার সাধারণত জমা নথির আনুষ্ঠানিক পূর্ণতা পরীক্ষা করেন; তিনি প্রতিটি শিক্ষাগত দাবির বিস্তৃত তদন্তকারী নন। তাই মনোনয়ন গ্রহণকে বিদ্যালয়ের রেকর্ডের স্বাধীন সত্যায়ন বলা ঠিক হবে না। আবার অভিযোগ উঠলে কমিশন তা উপেক্ষা করতে পারে—এমনও নয়। অভিযোগকারীকে নির্দিষ্ট নথি দিতে হবে, প্রার্থীকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং সিদ্ধান্তের কারণ লিখিত রাখা দরকার। এই তিন ধাপ থাকলে ভোটের আগে বিভ্রান্তি কমে, পরে নির্বাচনী মামলাতেও রেকর্ড পরিষ্কার থাকে।

এই মামলার তাৎপর্য কোনও একটি পরীক্ষার সাল ছাড়িয়ে হলফনামা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতায়। মনোনয়ন গ্রহণ হয়ে গেলেই তথ্যের সত্যতা চিরতরে নিশ্চিত হয় না; আবার অসঙ্গতি দেখালেই প্রার্থিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হল অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই লেখা এবং মূল নথির সঙ্গে তুলনা করা।

সবচেয়ে স্বচ্ছ পথ হবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা—কোন তথ্য জমা পড়েছিল, কোনও সংশোধনী চাওয়া হয়েছিল কি না এবং তা গ্রহণের বিধি কী। আদালত আবেদন শুনলে প্রমাণের দায় ও প্রতিকারের সীমা আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত নিশ্চিত খবর শুধু এই: অভিযোগ আদালতে তোলার অনুমতি মিলেছে; রথের হলফনামা মিথ্যা বা তাঁর প্রার্থিতা বাতিল—কোনওটিই এখনও বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।