Table of Contents
হাইলাইটস:
- ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে আসন ভাগাভাগি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও কংগ্রেস।
- শীর্ষ নেতৃত্ব জোটে আগ্রহী হলেও দুই দলেরই মধ্য ও নিম্ন স্তরের বহু নেতা আপত্তি তুলছেন।
- কংগ্রেস ১২০টির কাছাকাছি আসন দাবি করতে পারে, যদিও শেষ পর্যন্ত ৮০টির মতো আসনে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- এসপি সূত্রে খবর, অখিলেশ যাদব ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের জন্য ৬০-৮০টি সম্ভাব্য আসনের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
- অতীতের তিক্ততা ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা জোট আলোচনাকে কঠিন করে তুলছে।
বাংলাস্ফিয়ার: উত্তরপ্রদেশের ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখনও কয়েক মাস দূরে। কিন্তু রাজনৈতিক যুদ্ধের দামামা ইতিমধ্যেই বেজে উঠেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে বিরোধী শিবিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই—সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেস কি একসঙ্গে ভোটে লড়তে পারবে?
লোকসভা নির্বাচনে দুই দলের জোট উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু বিধানসভার সমীকরণ অনেক বেশি জটিল। কারণ এখানে শুধু বিজেপিকে হারানোর প্রশ্ন নয়, জড়িয়ে রয়েছে দুই দলের নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব, নেতাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যতের ক্ষমতার অঙ্ক।
শীর্ষ নেতৃত্ব চাইছে জোট, নিচুতলায় আপত্তি
দিল্লি ও লখনউয়ের রাজনৈতিক মহলে এখন স্পষ্ট যে কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং অখিলেশ যাদব দু’পক্ষই জোট বজায় রাখতে আগ্রহী। রাহুল গান্ধী ও অখিলেশের মধ্যে গত দুই বছরে যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে তাঁরা চাইছেন না।
কিন্তু সমস্যার শুরু অন্য জায়গায়।
দুই দলেরই দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতারা আশঙ্কা করছেন, জোট হলে তাঁদের অনেকের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হবে। ফলে প্রকাশ্যে না হলেও ভিতরে ভিতরে প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে।
এসপি নেতৃত্ব জেলা পর্যায়ের নেতাদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করছে। কোথায় কংগ্রেসকে ছাড় দেওয়া যেতে পারে, কোন আসনগুলি দলের কাছে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সেসব নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে কংগ্রেসও নিজেদের শক্তিশালী আসনগুলির তালিকা তৈরি করছে।
আসন নিয়ে শুরু হবে কঠিন দরকষাকষি
সূত্রের খবর, কংগ্রেস প্রথম দফায় প্রায় ১২০টি আসন দাবি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সেই সংখ্যা ৭৫ থেকে ৮০-র মধ্যে নেমে আসতে পারে।
অন্যদিকে এসপি মনে করছে, ৬০ থেকে ৮০টির বেশি আসন ছেড়ে দিলে তাদের নিজেদের সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই অবস্থায় আলোচনার টেবিলে কঠিন দরকষাকষি অনিবার্য।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আসন সংখ্যা নিয়ে সমঝোতা হলেও কোন কোন আসন কার ঝুলিতে যাবে, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ক্ষেত্র। কারণ অনেক আসনেই দুই দলেরই স্থানীয় নেতৃত্ব নিজেদের দাবিকে শক্তিশালী বলে মনে করে।
কংগ্রেসের ভিতরেই জোটবিরোধী লবি
সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত কংগ্রেসের ভিতর থেকেই আসছে।
উত্তরপ্রদেশের একাংশ কংগ্রেস নেতা মনে করছেন, এসপির সঙ্গে জোট করলে দল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁদের যুক্তি, বিজেপি তখন কংগ্রেসকে এসপির পুরনো আইনশৃঙ্খলা রেকর্ড, মুসলিম তোষণের অভিযোগ এবং জাতিভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে আক্রমণ করবে।
এই নেতাদের একটি অংশ রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে জোট না করার পক্ষে সওয়াল করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটের পরে সরকার গঠনের প্রশ্নে সহযোগিতা করা যেতে পারে, কিন্তু নির্বাচনের আগে জোটে যাওয়া রাজনৈতিক আত্মঘাতিতা হতে পারে।
২০২৪ বনাম ২০২২: দুই পক্ষের দুই যুক্তি
কংগ্রেসের দাবি, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী জোটের সাফল্যের পিছনে রাহুল গান্ধীর “সংবিধান বাঁচাও” প্রচার ছিল বড় কারণ। বিশেষত দলিত ভোটারদের মধ্যে এই প্রচার ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তাঁদের মতে, সেই আবেগই বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী ভোটকে একত্রিত করেছিল।
এসপি অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। অখিলেশের দলের নেতারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মাত্র ২টি আসন জিতেছিল এবং ভোট শতাংশ ছিল মাত্র ২.৩৩ শতাংশ। ফলে কংগ্রেসের বাস্তব শক্তি নিয়ে তাদের সংশয় রয়েছে।
এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই ভবিষ্যতের আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অতীতের ক্ষত এখনও শুকায়নি
এসপি ও কংগ্রেসের সম্পর্ক কখনওই খুব মসৃণ ছিল না।
২০২৩ সালে মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের সময় দুই দলের মধ্যে প্রকাশ্য সংঘাত দেখা গিয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই প্রকাশ্যে অখিলেশ যাদবকে কটাক্ষ করেছিলেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এসেছিল এসপির তরফে।
তারও আগে বহুবার দুই দলের সম্পর্ক ওঠানামার মধ্যে দিয়ে গেছে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত অখিলেশ নিজেও কংগ্রেসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা এবং বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর কৌশলের স্বার্থে দুই পক্ষ আপস করে।
মুসলিম ভোটই কি জোটের মূল ভিত্তি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসপি-কংগ্রেস জোটের সবচেয়ে বড় প্রেরণা আদর্শগত নয়, বরং নির্বাচনী বাস্তবতা। দুই দলই জানে, আলাদা লড়লে মুসলিম ভোটের একাংশ বিভক্ত হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বিজেপি লাভবান হবে। তাই বহু মতপার্থক্য সত্ত্বেও জোটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা কঠিন।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে জোট ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনও কম। কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দুই দলই একে অপরকে প্রয়োজন বলে মনে করছে।
তবে আসন ভাগাভাগির আলোচনা সহজ হবে না। কংগ্রেস বেশি আসন চাইবে, এসপি কম ছাড়তে চাইবে। স্থানীয় নেতাদের বিদ্রোহ, পুরনো অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক অহংকার—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস উত্তরপ্রদেশের বিরোধী রাজনীতিতে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে এই আসন সমঝোতার অঙ্ক।
জোটের ইচ্ছা আছে, প্রয়োজনও আছে। কিন্তু সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে গেলে এসপি এবং কংগ্রেস, দুই দলকেই নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের সঙ্গে আগে লড়তে হবে। উত্তরপ্রদেশের ২০২৭ সালের নির্বাচনের প্রথম বড় লড়াই সম্ভবত বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, বরং জোটের ভিতরেই শুরু হয়ে গেছে।