প্রেসিডেন্সি যখন ব্যবসা

যা জানা জরুরি
- দ্বিতীয় দফায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন—এমন অভিযোগ ক্রমশই তীব্র হচ্ছে।
- আর্থিক নথি, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং বিদেশি সংস্থার সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখে দ্য গার্ডিয়ান-এর অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ট্রাম্পের বিভিন্ন ব্যবসা…
- আইনজ্ঞ, ইতিহাসবিদ এবং বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মতে, আমেরিকার ইতিহাসে আর কোনও প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ব্যবসার সীমারেখা এতটা প্রকাশ্য ভাবে ঝাপসা হয়নি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দ্বিতীয় দফায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন—এমন অভিযোগ ক্রমশই তীব্র হচ্ছে। আর্থিক নথি, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং বিদেশি সংস্থার সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের সম্পর্ক খতিয়ে দেখে দ্য গার্ডিয়ান-এর অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ট্রাম্পের বিভিন্ন ব্যবসা থেকে প্রায় ২২০ কোটি ডলার রাজস্ব এসেছে। আইনজ্ঞ, ইতিহাসবিদ এবং বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের একাংশের মতে, আমেরিকার ইতিহাসে আর কোনও প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ব্যবসার সীমারেখা এতটা প্রকাশ্য ভাবে ঝাপসা হয়নি।
ট্রাম্পের বিপুল আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ক্রিপ্টোকারেন্সি। জুনে জমা দেওয়া আর্থিক ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকেই তাঁর আয় হয়েছে অন্তত ১৪০ কোটি ডলার। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেই, ২০২১ সালে, ট্রাম্প ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ‘প্রতারণা’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ক্রিপ্টো শিল্পের ব্যবসায়ীরা তাঁর প্রচারে বিপুল অর্থ ঢালার পর বদলে যায় তাঁর অবস্থান। ক্ষমতায় ফিরে তিনি আমেরিকাকে ‘বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী’ করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং শিল্পটির উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পথে হাঁটেন।
ট্রাম্প ও তাঁর ছেলেদের সঙ্গে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের পরিবারের যৌথ উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়াল ২০২৫ সালে ট্রাম্পকে প্রায় ৭৯ কোটি ৯০ লক্ষ ডলার দিয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। শপথ নেওয়ার কয়েক দিন আগে বাজারে আনা তাঁর নিজস্ব স্মারক মুদ্রা $TRUMP থেকেও এসেছে প্রায় ৬৩ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার।
কিন্তু ট্রাম্পের ক্রিপ্টো সাফল্যের অন্য প্রান্তের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে যুক্ত ক্রিপ্টো প্রকল্পগুলিতে প্রায় ১০ লক্ষ সাধারণ লগ্নিকারী সম্মিলিত ভাবে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার হারিয়েছেন।
এই বিপুল অর্থের পাশাপাশি উঠেছে আরও গুরুতর প্রশ্ন—টাকার বিনিময়ে কি প্রেসিডেন্টের সান্নিধ্যও কেনা যাচ্ছে?
ডেমোক্র্যাট সেনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও অ্যাডাম শিফের অভিযোগ, ট্রাম্প তাঁর স্মারক মুদ্রার ক্রেতাদের বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি মুদ্রা কেনা ব্যক্তিদের জন্য তাঁর গল্ফ ক্লাবে নৈশভোজের ব্যবস্থাও হয়েছিল। সমালোচকদের প্রশ্ন, কোনও বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থা যদি গোপনে বিপুল পরিমাণ ট্রাম্প-মুদ্রা কিনে প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছনোর পথ তৈরি করতে চায়, তা ঠেকানোর ব্যবস্থা কোথায়?
একই প্রশ্ন উঠছে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়ালকে ঘিরেও। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সরকারি সমর্থনপুষ্ট বিনিয়োগ সংস্থা এমজিএক্স, ক্রিপ্টো বিনিময় সংস্থা বিনান্সে ২০০ কোটি ডলার লগ্নির ক্ষেত্রে ট্রাম্প পরিবারের সংস্থার USD1 স্থিতিশীল মুদ্রা ব্যবহার করেছে। এর আগে অর্থপাচার-বিরোধী আইন লঙ্ঘনের দায় স্বীকার করে বিনান্সকে ৪৩০ কোটি ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রিপ্টো-বান্ধব নীতি এবং তাঁর পরিবারের আর্থিক লাভের মধ্যে কোনও যোগ আছে কি না, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালও খুলে দিয়েছে আরেকটি বিতর্কিত দরজা। প্রতিষ্ঠানটি মাসে এক লক্ষ ডলারের বিনিময়ে প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারীদের প্রেসিডেন্টের বাজার-সংবেদনশীল বার্তা সাধারণের আগে দেখার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রেসিডেন্টের একটি পোস্টেই কোনও সংস্থার শেয়ারের দাম ওঠানামা করতে পারে। ফলে অর্থবান লগ্নিকারীদের সেই বার্তা আগে পৌঁছে দেওয়া হলে, সেটিকে রাষ্ট্রীয় প্রভাবের বাণিজ্যিক ব্যবহার বলেই দেখছেন সমালোচকেরা।
বিদেশি উপহার এবং আবাসন ব্যবসাও বিতর্কের বাইরে নয়। কাতারের দেওয়া প্রায় ৪০ কোটি ডলারের বিলাসবহুল বিমান গ্রহণের সিদ্ধান্তকে নীতিবিদদের একাংশ নজিরবিহীন স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখেছেন। একই সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার ও রোমানিয়ায় আবাসন এবং হোটেল প্রকল্প থেকে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি ডলার পেয়েছে। মজার বিষয়, এই দেশগুলির অনেকগুলিই তখন শুল্ক, অস্ত্র সরবরাহ কিংবা কূটনৈতিক সুবিধা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ছিল।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জুলিয়ান জেলিজারের মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সরকারি নীতি এবং প্রেসিডেন্টের পদকে ট্রাম্প যেভাবে আয় করার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, তার নজির আমেরিকার ইতিহাসে বিরল। তাঁর প্রথম মেয়াদেও ব্যবসা ও প্রশাসনের মধ্যে বিভাজন ছিল অত্যন্ত দুর্বল। দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সামান্য রক্ষাকবচও কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ।
প্রাক্তন নির্বাচন কমিশন আইনজীবী ল্যারি নোবলেরও বক্তব্য, ট্রাম্প প্রকাশ্যেই প্রেসিডেন্টের স্বার্থের সংঘাত সংক্রান্ত বিধিনিষেধকে উপেক্ষা করেছেন।
হোয়াইট হাউস অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মুখপাত্র আনা কেলির দাবি, ট্রাম্প বা তাঁর পরিবার কখনও স্বার্থের সংঘাতে জড়াননি এবং প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই আমেরিকার জনগণের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। তাঁর যুক্তি, কংগ্রেস-প্রণীত অধিকাংশ সাধারণ স্বার্থের সংঘাতবিরোধী আইন সরাসরি প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
আর সেখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি।
আইনের ফাঁক যদি কোনও প্রেসিডেন্টকে শাস্তি বা কার্যকর তদন্তের ভয় ছাড়াই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ব্যবসাকে এক সুতোয় বাঁধার সুযোগ দেয়, তা হলে বিপদটা শুধু ট্রাম্পকে ঘিরে নয়। ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টরাও একই পথ অনুসরণ করতে পারেন।
তখন প্রশ্ন থাকবে না শুধু, ট্রাম্প কত টাকা আয় করলেন।
প্রশ্ন হবে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পদটাই কি শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত হল?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



