কমিশনার নিয়োগ আইন নিয়ে নতুন মোড়

যা জানা জরুরি
- প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি ২৩ সেপ্টেম্বর একমত হতে পারলেন না, কিন্তু মামলাটি…
- বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত মনে করেছেন, কেন্দ্রের চাওয়া অনুযায়ী পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর বাধ্যতামূলক কারণ নেই।
- বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি ২৩ সেপ্টেম্বর একমত হতে পারলেন না, কিন্তু মামলাটি যাতে থেমে না থাকে, সে বিষয়ে তাঁরা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত মনে করেছেন, কেন্দ্রের চাওয়া অনুযায়ী পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর বাধ্যতামূলক কারণ নেই। বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। শেষ পর্যন্ত দু’জনেই বিষয়টি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের প্রশাসনিক বিবেচনায় পাঠিয়েছেন, যাতে উপযুক্ত সংখ্যক বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে কার্যকর ও কর্তৃত্বপূর্ণ নিষ্পত্তি করা যায়। এটি আইনের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত রায় নয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়োগ-সমিতির গঠন। ২০২৩ সালের আইনে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কমিশনার বাছাই করেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি এই সমিতিতে নেই। তার আগে অনুপ বরনওয়াল মামলায় সাংবিধানিক বেঞ্চ সংসদ আইন না-করা পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সমিতির কথা বলেছিল। সংসদ পরে আইন করায় সেই অস্থায়ী ব্যবস্থা স্থায়ী সাংবিধানিক বিধান হয়ে যায়নি—কেন্দ্রের যুক্তির একটি অংশ এটি।
আবেদনকারীদের বক্তব্য, নির্বাহী বিভাগের দুই প্রতিনিধি থাকা এবং বিচার বিভাগের প্রতিনিধি বাদ পড়ায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা দুর্বল হয়। নিয়োগে শুধু বাস্তব সততা নয়, জনসমক্ষে আস্থার চেহারাও প্রয়োজন। কেন্দ্র পাল্টা বলেছে, সংবিধান কোনও বিচারপতিকে নির্বাচনী নিয়োগ-সমিতিতে রাখার বাধ্যবাধকতা দেয়নি; সংসদের নীতিগত পছন্দকে আদালত নিজের পছন্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। এখন আদালতের সামনে প্রশ্ন শুধু কোন সমিতি ‘ভালো’ নয়, সংসদের তৈরি কাঠামো সাংবিধানিক স্বাধীনতার ন্যূনতম মান ভাঙে কি না।
বিচারপতি দত্তের মত অনুযায়ী, আগে থেকেই পাঁচ বিচারপতির রায়ের নীতি পাওয়া গেলে প্রতিটি পরবর্তী বিরোধকে আবার সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো প্রয়োজন নেই; দুই বিচারপতির বেঞ্চ সেই নীতি প্রয়োগ করতে পারে। বিচারপতি শর্মা বিষয়টির গুরুত্ব ও উত্থাপিত সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্য বৃহত্তর বেঞ্চের প্রয়োজন দেখেছেন। মতপার্থক্যটি তাই আইনের ফল নিয়ে সরাসরি ‘পক্ষে-বিপক্ষে’ ভোট নয়; কোন বেঞ্চ সিদ্ধান্ত নেবে, সেই প্রাথমিক বিচারিক প্রশ্নে।
দুই বিচারপতি প্রধান বিচারপতিকে স্থায়ী পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে অনুরোধ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টে বহু সাংবিধানিক প্রশ্ন ছোট বেঞ্চে উঠে এলেও প্রয়োজনমতো বড় বেঞ্চ গঠন করতে সময় লাগে। স্থায়ী বেঞ্চ হলে ধারাবাহিকতা বাড়তে পারে, যদিও বিচারপতি ও মামলার তালিকা নির্ধারণ প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক দায়িত্ব। এই অনুরোধ নিজে নতুন বেঞ্চ গঠন করে দেয়নি।
ঘটনাটির তাৎপর্য দ্বিমত থাকা নয়, দ্বিমতকে প্রক্রিয়ার বাধা না-করার চেষ্টা। দুই বিচারপতি পৃথক যুক্তি লিখেও মামলাটি অনির্দিষ্ট অবস্থায় রাখেননি। এখন প্রধান বিচারপতি বেঞ্চের আকার ও গঠন নির্ধারণ করবেন; তারপর মূল আইন পরীক্ষা হবে। ততদিন বর্তমান নিয়োগব্যবস্থা বাতিল হয়েছে বা প্রধান বিচারপতি আবার নির্বাচনী সমিতিতে ফিরেছেন—দুটির কোনওটিই বলা যাবে না।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে একই দিনে অন্দরমহলের আপত্তির খবর আলোচিত হওয়ায় মামলাটির রাজনৈতিক ও জনপরিসরের গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু সংবাদ-অনুসন্ধান আদালতে আইনের বৈধতার স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়। আদালতকে সংবিধানের ভাষা, আগের রায়, প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা এবং সংসদের ক্ষমতা—সব মিলিয়ে বিচার করতে হবে। জনআস্থার তাড়না দ্রুত উত্তরের দাবি তুলতে পারে; স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট যুক্তিসম্পন্ন রায়।
মূল মামলার ফল ভবিষ্যৎ নিয়োগের পাশাপাশি ইতিমধ্যে নিযুক্ত কমিশনারদের অবস্থানে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও আদালতকে প্রয়োজন হলে নির্ধারণ করতে হবে। কোনও আইন অসাংবিধানিক হলে রায় আগের সিদ্ধান্তে কত দূর প্রযোজ্য হবে, তা স্বয়ংক্রিয় নয়। এই কারণেই অন্তর্বর্তী অনুমান নয়, চূড়ান্ত আদেশের কার্যকর অংশ পড়া জরুরি। বেঞ্চ গঠনের পর নতুন শুনানির তারিখও আলাদাভাবে ঘোষণা করতে হবে; বর্তমান আদেশে মূল বিরোধ মীমাংসার নির্দিষ্ট দিন নেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



