বাড়ির বিড়াল নয়!

যা জানা জরুরি
- স্থানীয় পরিবারের চোখে সে ছিল স্রেফ এক হারিয়ে যাওয়া গৃহপালিত প্রাণী।
- কিন্তু বলিভিয়ার ইউঙ্গাস মেঘবন থেকে উদ্ধার হওয়ার পর সেই বিড়ালই চমকে দিল বিজ্ঞানীদের।
- জিনগত পরীক্ষায় জানা গেল, এটি কোনও পরিচিত প্রজাতি নয়—একটি স্বতন্ত্র বুনো বিড়াল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দেখতে ছোট্ট, ছোপধরা বিড়াল। স্থানীয় পরিবারের চোখে সে ছিল স্রেফ এক হারিয়ে যাওয়া গৃহপালিত প্রাণী। কিন্তু বলিভিয়ার ইউঙ্গাস মেঘবন থেকে উদ্ধার হওয়ার পর সেই বিড়ালই চমকে দিল বিজ্ঞানীদের। জিনগত পরীক্ষায় জানা গেল, এটি কোনও পরিচিত প্রজাতি নয়—একটি স্বতন্ত্র বুনো বিড়াল।
নাম দেওয়া হয়েছে Leopardus tilcayo। স্থানীয় নাম থেকেই তার নাম ‘তিলকায়ো’। জীবিত বুনো বিড়ালের নতুন প্রজাতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার ঘটনা এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে ঘটল। শেষ তুলনীয় স্বীকৃতি এসেছিল ১৯২৩ সালে পাম্পাস বিড়ালের ক্ষেত্রে।
তবে ‘নতুন প্রজাতি’ শুনে যেন মনে না হয়, প্রাণীটি সম্প্রতি পৃথিবীতে হাজির হয়েছে। তিলকায়ো বহুদিন ধরেই ওই অরণ্যে ছিল। স্থানীয় মানুষও তাকে চিনতেন। নতুন যা, তা হল বিজ্ঞানের খাতায় তার আলাদা পরিচয়। এত দিন তাকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্য টাইগার-ক্যাটদের সঙ্গেই একই শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল।
বলিভিয়ার জীববিজ্ঞানী পাওলা নোগালেস-আসকারুনজ ২০১৬ সালে প্রাণীটির প্রতি বিশেষ নজর দেন। পরে ২০১৯ সাল থেকে বলিভিয়া, ব্রাজিল ও বেলজিয়ামের গবেষকেরা দক্ষিণ আমেরিকার ৩৮টি বিড়ালের জিনগত নমুনা তুলনা শুরু করেন। সেই বিশ্লেষণেই উঠে আসে বড় পার্থক্য। গবেষকদের মতে, তিলকায়োর বংশ নিকটাত্মীয় বিড়ালদের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
দেহের আকারেও সে বেশ ‘কমপ্যাক্ট’। লম্বায় প্রায় ১৮ ইঞ্চি, ওজন আনুমানিক তিন পাউন্ড—অনেক গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও ছোট। হালকা বাদামি পশমের উপর অনিয়মিত গাঢ় ছোপ, ছোট কান, লম্বা গোঁফ এবং কিছুটা চাপা মুখ তার বৈশিষ্ট্য। তবে জীবিত অবস্থায় নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত নমুনা এখনও অতি সামান্য। ফলে সে কী খায়, কীভাবে বংশবিস্তার করে কিংবা জঙ্গলে মোট কতটি তিলকায়ো আছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
এই আবিষ্কার দক্ষিণ আমেরিকার টাইগার-ক্যাটদের শ্রেণিবিন্যাসও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আগে যাদের এক বা অল্প কয়েকটি প্রজাতির অংশ বলে মনে করা হত, জিনগত তথ্য সেখানে অন্তত পাঁচটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর ইঙ্গিত দিয়েছে। পেরুর ইউঙ্গাস অঞ্চলেও একটি নতুন উপপ্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে।
শুনতে নাম বদলের ব্যাপার মনে হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি। একাধিক স্বতন্ত্র প্রজাতিকে একসঙ্গে গুনলে কোনও ছোট জনগোষ্ঠী দ্রুত কমে গেলেও সামগ্রিক সংখ্যা দেখে বিপদ বোঝা কঠিন হতে পারে। তিলকায়ো আলাদা পরিচয় পাওয়ায় এবার তার বিস্তার, সংখ্যা ও ঝুঁকিও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এই গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক সম্ভবত এখানেই—বিজ্ঞান যাকে নতুন করে চিনল, স্থানীয় মানুষ তাকে অনেক আগে থেকেই চিনতেন। জঙ্গলের প্রাণীকে চেনার জন্য সবসময় গবেষণাগারের দরজা দিয়ে ঢুকতে হয় না। স্থানীয় জ্ঞান আর আধুনিক জিনগত গবেষণা একসঙ্গে কাজ করলেই ছবিটা আরও পরিষ্কার হয়।
তবে পরিচয় পাওয়ার পর আসল কাজ শুরু। ইউঙ্গাস অঞ্চলে বন উজাড়, কৃষি সম্প্রসারণ, আগুন এবং সোনার খনির চাপ বাড়ছে। নতুন প্রজাতির নামকরণ যতই রোমাঞ্চকর হোক, তার বাসস্থান না থাকলে সেই নাম খুব দ্রুত অতীতের তালিকায় চলে যেতে পারে।
তাই তিলকায়োর পরবর্তী অধ্যায় হওয়া উচিত শুধু আরও ছবি তোলা নয়। কোথায় তার বাস, কী খায়, কীভাবে বংশবিস্তার করে এবং মানুষের কার্যকলাপে কতটা ঝুঁকিতে—এসব জানাই এখন জরুরি।
বিজ্ঞানের খাতায় নতুন নাম এসেছে। এবার জঙ্গলে তার জায়গাটাও বাঁচাতে হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



