এআই-নকলে ফের পরীক্ষা, বিপাকে হাজার হাজার মেক্সিকান পড়ুয়া

যা জানা জরুরি
- এআই দিয়ে নকলের অভিযোগে এবার নিজেরাই পরীক্ষার কাঠগড়ায়!
- মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো (ইউএনএএম)-এর হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে ফের ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে।
- অনলাইনে নেওয়া এবারের পরীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
এআই দিয়ে নকলের অভিযোগে এবার নিজেরাই পরীক্ষার কাঠগড়ায়! মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকো (ইউএনএএম)-এর হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে ফের ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে। অনলাইনে নেওয়া এবারের পরীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এ বছরই প্রথম অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউএনএএম। পরীক্ষার সময় পরীক্ষার্থীদের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন চালু রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, তাঁরা একাই পরীক্ষা দিচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সন্দেহজনক আচরণ ধরতে ব্যবহার করা হয়েছিল এআই-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাও।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি যেন উল্টে গেল। পরীক্ষার্থীরাই এআইয়ের সুবিধা পরীক্ষকদের নজরদারির চেয়ে বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক লাফে পাঁচ গুণ ‘মেধাবী’!
মে ও জুন মাসে নেওয়া ১২০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মোট ১ লক্ষ ৫৮ হাজার পরীক্ষার্থী। ১৭ জুলাই ফল প্রকাশের পরই চোখ কপালে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
২০২৬ সালে ১৬.৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী ১০০ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছেন। অথচ ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই হার ছিল গড়ে মাত্র ৩.৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীর হার প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।
অস্বাভাবিক এই ফলাফল ঘিরেই শুরু হয় সন্দেহ এবং বিতর্ক।
অনেক পরীক্ষার্থী নিজেরাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ফের পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানান। আবার কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁরা কোনও অনিয়ম না করেই কঠোর পরিশ্রম করে এই নম্বর পেয়েছেন। তাঁদের ফল বাতিল করা হলে সৎ পরীক্ষার্থীরাই শাস্তি পাবেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হতে চাওয়া পরীক্ষার্থী এলিয়াস বাদাগের যেমন বলছেন, “এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। যারা সৎভাবে পরীক্ষা দিয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তাঁর দাবি, গত বছর ৭৭ নম্বর পেলেই এই বিভাগে ভর্তি হওয়া যেত। কিন্তু এ বছর প্রয়োজন হয়েছে ৯৬ নম্বর। ৯৫ পেয়েও তাই সুযোগ পাননি তিনি।
‘চ্যাটজিপিটিকে ধন্যবাদ, মেডিক্যালে ভর্তি!’
বিতর্কে আরও ঘি ঢালে সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্ট। ফল প্রকাশের পর এক পরীক্ষার্থী প্রকাশ্যেই লিখেছিলেন, “চ্যাটজিপিটিকে ধন্যবাদ, আমি মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছি!”
ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর অবশ্য এই ধরনের পোস্ট দ্রুত কমে যায়। তবে ততক্ষণে এআই ব্যবহার করে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও। তাঁর বক্তব্য, ইউএনএএম যদি মনে করে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে এবং তা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে তদন্ত করার জন্য দেশের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর লিওনার্দো লোমেলি ভানেগাসও ঘটনাটিকে হালকাভাবে নিতে নারাজ। তাঁর কথায়, “এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, গোটা সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের পরিস্থিতিকে কখনও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।”
নজরদারিতে এআই, তবু ফাঁক গলে নকল?
অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার পিছনে ইউএনএএমের যুক্তি ছিল, এর ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীরাও সহজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
প্রতারণা ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় টেরিটোরিয়াম লাইফ নামে একটি বহিরাগত সংস্থার সহায়তায় এআই-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থাও চালু করেছিল। পরীক্ষার সময় ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের মাধ্যমে সন্দেহজনক শব্দ, অন্য কারও উপস্থিতি, বাইরের ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার কিংবা পরীক্ষার্থীর অস্বাভাবিকভাবে স্ক্রিন ছেড়ে যাওয়ার মতো বিষয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিল।
সন্দেহজনক কোনও ঘটনা ধরা পড়লে তার রিপোর্ট পাঠানো হতো মানব পরীক্ষকদের কাছে। এই ব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রায় ৩ হাজার পরীক্ষার্থীকে নিয়মভঙ্গের অভিযোগে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
এমনকি পরীক্ষার সময় লকডাউন ব্রাউজার ব্যবহারও বাধ্যতামূলক ছিল, যাতে অন্য কোনও সফটওয়্যার বা ইন্টারনেট ব্যবহার করা না যায়।
কিন্তু এত কড়া নজরদারির পরেও শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন উঠেছে—এআইকে ঠেকাতে তৈরি করা এআই-নির্ভর ব্যবস্থাই কি যথেষ্ট ছিল?
ফের পরীক্ষা, কাদের দিতে হবে?
ঘটনার তদন্তে ১৬ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করেছে ইউএনএএম। পরীক্ষায় ঠিক কতটা অনিয়ম হয়েছে, কীভাবে তা সম্ভব হল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এমন ঘটনা আটকানো যায়—সবই খতিয়ে দেখবে এই কমিশন।
শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, অনলাইন পরীক্ষায় যাঁরা ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের গড় ভর্তি-যোগ্য নম্বরের সমান বা তার বেশি পেয়েছেন, তাঁদের সকলকেই ফের একটি নিয়ন্ত্রিত লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে।
তবে নতুন পরীক্ষার দিন এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
ইউএনএএম জানিয়েছে, পুনরায় পরীক্ষা ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া যাতে ১০ আগস্ট থেকে শুরু হতে চলা নতুন শিক্ষাবর্ষে বড় ধরনের প্রভাব না ফেলে, তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এআইয়ের যুগে পরীক্ষায় নকল ঠেকাতে প্রযুক্তিই কি যথেষ্ট, নাকি শেষ পর্যন্ত মানুষের নজরদারিই ভরসা?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



