মেরিকা কেন ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’ এনেছে? শুল্ক সম্পর্কে নতুন আইনে কী বলা হয়েছে? কোন বিশেষ শর্তটি রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানির উপর প্রভাব ফেলবে? ভারতের অর্থনীতিতে তার অভিঘাত কতটা হতে পারে? শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়ার কোনও ব্যবস্থা কি রয়েছে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’-এ সই করেছেন। এর ফলে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা চালিয়ে গেলে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক বসতে পারে। ভারতের রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—দু’দিক থেকেই এই আইন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই শুল্ক নিয়ে ভারত সরকার যে উদ্বেগ জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত তাতে আমল দেওয়া হয়নি।

আমেরিকা কেন এই আইন এনেছে?

প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে ও. গ্রাহাম এই আইনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর নামেই আইনটির নামকরণ হয়েছে। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার অর্থের জোগান বন্ধ করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর আর্থিক সামর্থ্যে আঘাত হানা। সেই লক্ষ্যেই রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব এবং সে দেশের জ্বালানির বৃহত্তম ক্রেতাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।

সম্প্রতি আইনের নামের সঙ্গে ‘অ্যান্ড ইরান’ কথাটি যোগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, এই ধরনের ব্যবস্থা ইরানের বিরুদ্ধেও নেওয়া হচ্ছে। আইনের পাঠ সংশোধন করে বলা হয়েছে, ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরও পাঁচ বছর, অর্থাৎ ২০৩১ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

শুল্ক সম্পর্কে আইনে কী বলা হয়েছে?

ভারতের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, রাশিয়া থেকে তেল আমদানিকারী দেশগুলি সম্পর্কে এই আইনের বিধান। আইন প্রণয়নের ৩০ দিন পরে দু’টি প্রধান শর্তের যে কোনও একটি পূরণ করে এমন দেশে উৎপন্ন পণ্যের উপর আমেরিকা ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।

প্রথম শর্ত হল, আইন প্রণয়নের আগের ১২ মাসে কোনও দেশ পরিমাণের বিচারে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল অথবা প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম আমদানিকারীর মধ্যে ছিল কি না, এবং আইন প্রণয়নের পর ৩০ দিন পেরিয়েও সেই দেশ রাশিয়া থেকে তেল বা গ্যাস আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে কি না।

এই শর্তটিই সম্ভবত ভারতের উপর প্রভাব ফেলবে। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দুই বৃহত্তম আমদানিকারী হল চিন ও ভারত। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ বাড়ছে। ওই মাসেই মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্কব্যবস্থা খারিজ করে দিয়েছিল। রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ভারতের উপর তিনি যে ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক বসিয়েছিলেন, সেটিও ওই রায়ের আওতায় বাতিল হয়।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫১ শতাংশেরও বেশি এসেছে রাশিয়া থেকে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত এখনও বাধাগ্রস্ত। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনা ভারতের পক্ষে সম্ভবত অসম্ভব হবে।

শুল্ক আরোপের দ্বিতীয় শর্ত হল, আইন প্রণয়নের আগের ১২ মাসে রুশ তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সাহায্যকারী দেশগুলির প্রথম পাঁচে কোনও দেশ ছিল কি না। এই শর্তের ভিত্তিতে ভারতের উপর শুল্ক বসার ঝুঁকি তুলনায় অনেক কম। কারণ, ভারতের তেল বিপণন সংস্থাগুলি বারবার জানিয়েছে, তাদের সমস্ত কেনাকাটা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন না করেই।

ভারতীয় পণ্যের উপর এটাই কি মোট শুল্ক হবে?

না। আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এর আওতায় আরোপিত আমদানি শুল্ক কোনও পণ্যের উপর চালু অন্য যে কোনও শুল্কের অতিরিক্ত হবে। অর্থাৎ, আগে থেকে বহাল শুল্কের সঙ্গে নতুন শুল্ক যোগ হবে।

এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা এবং ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ২৩২ ধারার আওতায় আরোপিত শুল্কও।

৩০১ ধারা অনুযায়ী, বিদেশি বাণিজ্যচর্চা আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষতি করলে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর তা তদন্ত করতে এবং পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। অন্যদিকে, ২৩২ ধারা অনুযায়ী, তদন্তে যদি দেখা যায় বিদেশি পণ্য আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক, তা হলে প্রেসিডেন্ট আমদানি সীমিত করতে বা শুল্ক বসাতে পারেন।

এই দু’টি আইন ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উভয় আইনের আওতায়ই ভারত ইতিমধ্যে শুল্কের মুখে পড়েছে। জবরদস্তি শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে আমেরিকার বাণিজ্যসঙ্গীরা যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর ৩০১ ধারায় তদন্ত করেছিল। সেই তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ভারত থেকে আমদানির উপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়।

পাশাপাশি, ট্রাম্প ২৩২ ধারার আওতায় চালু শুল্কের পরিধি বাড়িয়ে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা এবং এগুলি দিয়ে তৈরি সংশ্লিষ্ট পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। শুল্কের হারও বাড়িয়ে করেছেন ৫০ শতাংশ। এই ব্যবস্থা সব দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ায় ভারত ও তার প্রতিযোগী দেশগুলি একই অবস্থানে ছিল। তার উপর সম্ভাব্য আরও ১০০ শতাংশ শুল্ক যোগ হলে এই ক্ষেত্রগুলিতে ভারতের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই শুল্ক কি অবিলম্বে কার্যকর হবে?

না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলি রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে কি না, তা নির্ধারণ করার আগে ৩০ দিন পার হতে হবে। এই সময়সীমা পেরোনোর পরেই আমেরিকা নতুন আইনের আওতায় শুল্ক আরোপ করতে পারবে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, প্রথমবার শুল্ক আরোপের ১৮০ দিনের মধ্যে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর বিদেশসচিব ও জ্বালানিসচিবের সঙ্গে পরামর্শ করে বিষয়টি ফের পর্যালোচনা করবে। তখন সর্বশেষ ১২ মাসের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা হবে, কোন পাঁচটি দেশ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম আমদানিকারী।

ভারতের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব কী?

দু’টি সম্ভাব্য পরিস্থিতির নিরিখে ভারতের অর্থনীতির উপর প্রভাব বিচার করতে হবে। প্রথমত, ভারত যদি রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনা চালিয়ে যায় এবং শুল্কের বোঝা মেনে নেয়। দ্বিতীয়ত, ভারত যদি রাশিয়ার তেল আমদানি কমিয়ে সম্ভাব্য শুল্ক প্রত্যাহার করাতে সক্ষম হয়।

ভারত রাশিয়ার তেল কেনা চালিয়ে গেলে এবং শুল্ক বহাল থাকলে কী হতে পারে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় ২০২৫ সালের অগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে। ওই সময়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল।

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অগস্টের মধ্যে আমেরিকায় ভারতের পণ্য রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছিল। ভবিষ্যতে শুল্ক বসতে পারে, এই আশঙ্কায় কিছু পণ্য নির্ধারিত সময়ের আগেই রফতানি করা হয়েছিল। বৃদ্ধির একটি অংশের কারণ সেটাই। তা সত্ত্বেও এই পরিসংখ্যান আমেরিকার বাজারে ভারতের রফতানির জোরালো গতির পরিচয় দিয়েছিল।

কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘতর সময়ের হিসাব ধরলে দেখা যায়, আমেরিকায় রফতানি বেড়েছে মাত্র ৩.৮ শতাংশ। অর্থাৎ, অগস্টে শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর রফতানির বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য শ্লথতা এসেছে।

সেই সময়ে রফতানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছিল, মার্কিন ক্রেতাদের ধরে রাখতে তাঁদের অনেকেই বাড়তি শুল্কের খরচের একাংশ নিজেরা বহন করছিলেন। বাকি অংশ বহন করছিলেন আমেরিকার ক্রেতারা। ৫০ শতাংশ শুল্কই অধিকাংশ রফতানিকারকের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বেরিয়ে আসার তৃতীয় কোনও পথ কি রয়েছে?

এই আইনে শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়ার বিধান রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কাছে লিখিতভাবে প্রত্যয়ন করবেন যে, ছাড় দেওয়া আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের অনুকূল। সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি ব্যাখ্যা করে একটি প্রতিবেদনও তাঁকে জমা দিতে হবে। তার পরে তিনি শুল্ক মকুব করতে পারবেন।

আর একটি পথ হল, রাশিয়া এমন একটি শান্তিচুক্তিতে সই করবে, যা ইউক্রেনের স্বাধীন ও মুক্ত সরকার গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সমস্ত সামরিক শত্রুতা এবং সে দেশের সরকারকে উৎখাত, ভেঙে দেওয়া বা অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে বিপর্যস্ত করার সমস্ত কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে রাশিয়াকে।