ক্তিম সেনগুপ্ত: দল ভাঙলে নির্বাচনী প্রতীক কার হাতে থাকবে? প্রতিষ্ঠিত সভাপতি নিজের পদ দেখিয়ে প্রতীক দাবি করতে পারেন, বিদ্রোহীরা দেখাতে পারেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব। কিন্তু এই পরস্পরবিরোধী দাবির নিষ্পত্তি করবে কে? ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রশ্নটির গুরুত্বপূর্ণ উত্তর মিলেছিল সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন মামলায়। ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সেই রায় প্রতীক নিয়ে বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে রায়টি বুঝতে সাহায্য করে, দলীয় নেতৃত্বের দাবি, সাংগঠনিক সমর্থন এবং নির্বাচনী পরিচয়ের মধ্যে সম্পর্ক কোথায়। আজকের প্রতীক বিতর্কেও তাই মামলাটি প্রাসঙ্গিক।

মামলার পটভূমি ১৯৬৯ সালের কংগ্রেস বিভাজন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র করে বিরোধের পরে কংগ্রেস দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। একদিকে এস নিজলিঙ্গাপ্পার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস, অন্যদিকে জগজীবন রামের সভাপতিত্বাধীন গোষ্ঠী। রায়ের বয়ানে প্রথমটি কংগ্রেস ‘ও’, দ্বিতীয়টি কংগ্রেস ‘জে’ নামে চিহ্নিত। উভয় পক্ষই নিজেদের অবিভক্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বৈধ ধারক বলে দাবি করে। তখন কংগ্রেসের সংরক্ষিত নির্বাচনী প্রতীক ছিল জোয়াল কাঁধে জোড়া বলদ। বিরোধের কেন্দ্রে এসে পড়ে সেই দলের নির্বাচনী স্বীকৃতি এবং প্রতীক ব্যবহারের অধিকার।

নিজলিঙ্গাপ্পার শিবিরের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আলির যুক্তি ছিল, প্রতিপক্ষের নেতারা দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন অথবা সদস্যপদ হারিয়েছেন। তাঁরা নতুন সংগঠন তৈরি করে কংগ্রেসের পরিচয় ব্যবহার করছেন। ফলে তাঁদের কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করাটাই অনুচিত। কমিশনের এই বিরোধ বিচার করার ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে তোলা হয়। অন্য পক্ষ আবার দলীয় পদাধিকারীদের মেয়াদ, বৈঠকের বৈধতা এবং প্রতিনিধিদের সমর্থনের ভিত্তিতে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অর্থাৎ বিবাদ কেবল জনপ্রিয়তা নিয়ে ছিল না; সংগঠনের বৈধ নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রশ্নও ছিল।

নির্বাচন কমিশন ১৯৬৮ সালের নির্বাচনী প্রতীক সংরক্ষণ ও বরাদ্দ আদেশের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে বিষয়টি বিচার করে। এই বিধানে স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের একাধিক গোষ্ঠী নিজেদের সেই দল বলে দাবি করলে কমিশন তথ্যপ্রমাণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সিদ্ধান্ত হতে পারে, একটি গোষ্ঠীই ওই স্বীকৃত দল; আবার কোনও গোষ্ঠীই নয়। ফলে প্রতিষ্ঠিত সভাপতির বক্তব্যই শেষ কথা, এমন দাবি বিধানটির কাঠামোর সঙ্গে মেলে না। প্রতিদ্বন্দ্বী দাবির বিচার প্রয়োজন।

সুপ্রিম কোর্ট এই ক্ষমতার বৈধতা বহাল রাখে। বিচারপতি এইচ আর খান্না, কে এস হেগড়ে এবং এ এন গ্রোভারের বেঞ্চের রায় লেখেন খান্না। আদালতের ব্যাখ্যা ছিল, প্রতীক বরাদ্দের দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে হলে একই প্রতীকের প্রতিদ্বন্দ্বী দাবিদারদের বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতাও কমিশনের থাকা প্রয়োজন। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে নির্বাচনের তত্ত্বাবধান, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের যে দায়িত্ব কমিশনকে দেওয়া হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতেও বিষয়টি বিচার করা হয়। ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ কমিশনের ক্ষমতার বাইরে, এই আপত্তি আদালত গ্রহণ করেনি।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যাচাই। কমিশন দেখেছিল, সংসদীয় ও সাংগঠনিক উভয় স্তরেই জগজীবন রামের গোষ্ঠীর সমর্থন বেশি। সংসদের সদস্য, রাজ্যগুলির বিধানসভার সদস্য, নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্য এবং দলীয় প্রতিনিধিদের অবস্থান বিবেচিত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট বলে, একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা মূল্যবান ও প্রাসঙ্গিক। তবে এই সিদ্ধান্তকে শুধু বিধায়ক গুনলেই প্রতীকের মালিকানা নির্ধারিত হবে বলে ব্যাখ্যা করা ভুল। ওই মামলার বাস্তবতায় সংগঠন এবং আইনসভার প্রতিনিধিত্ব, দুটি ক্ষেত্রেই সমর্থনের হিসাব আদালতের বিবেচনায় ছিল।

দলীয় গঠনতন্ত্র এবং ঘোষিত আদর্শের পরীক্ষাও সেই বিরোধে আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু পাল্টাপাল্টি বহিষ্কার ও অপসারণের কারণে গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে উভয় পক্ষের দাবির সহজ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়নি। আবার কোনও পক্ষই কংগ্রেসের ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রত্যাখ্যান করেনি। ফলে আদর্শের পরীক্ষাতেও দুই গোষ্ঠীকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব কার্যকর গুরুত্ব পায়। বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন, কারণ রায় থেকে বিচ্ছিন্ন একটি বাক্য তুলে সর্বজনীন সূত্র বানালে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়। কোনও দলের অভ্যন্তরীণ বিবাদের ক্ষেত্রে তার গঠনতন্ত্র, সদস্যপদের নথি এবং প্রতিনিধিত্বের কাঠামো কেন খুঁটিয়ে দেখা দরকার, কংগ্রেসের এই বিরোধ সেই প্রশ্নটিও সামনে আনে। প্রতীকের দাবি যাচাই তাই রাজনৈতিক স্লোগানের প্রতিযোগিতা নয়।

সদস্য গণনার ভিত্তিটিও তাৎপর্যপূর্ণ। বিভাজনের পরে দুই পক্ষ পরস্পরের সমর্থকদের বহিষ্কার করেছিল। এই বহিষ্কারের বৈধতাই যখন বিতর্কিত, তখন সেগুলিকে বিনা বিচারে মেনে নিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব পাল্টে যেতে পারত। কমিশন তাই বিভাজনের আগের ফরিদাবাদ অধিবেশনে যাঁরা প্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্য ছিলেন, তাঁদের ভিত্তিতে সমর্থন যাচাই করে। আদালত এই পদ্ধতিকে যথাযথ বলে গ্রহণ করে। এই ঘটনার শিক্ষা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা বললেই কাজ শেষ হয় না; কাদের গণনা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নেরও যুক্তিসংগত উত্তর প্রয়োজন।

দলের সাধারণ সদস্যদের প্রত্যেকের মতামত সরাসরি সংগ্রহের দাবি সম্পর্কেও রায়ে বাস্তব সমস্যার উল্লেখ রয়েছে। এত বড় সংগঠনের সমস্ত প্রাথমিক সদস্যের ইচ্ছা নির্ধারণ করা সহজ নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সাংগঠনিক কমিটির সদস্যদের অবস্থান থেকে সাধারণ সদস্যদের মনোভাব মোটামুটি প্রতিফলিত হচ্ছে বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি আদালত মনে করিয়ে দেয়, কমিশনকে কিছুটা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। অনুসন্ধান এমন জটিলতায় আটকে পড়তে পারে না, যাতে সিদ্ধান্তই অধরা থেকে যায়। তবে নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট দিনসংখ্যা রায়ে বাঁধা হয়নি।

প্রতীকের প্রকৃতি নিয়েও আদালতের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী প্রতীক সহমালিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার মতো সম্পত্তি নয়। রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের জন্য সেই প্রতীক বরাদ্দ পাওয়া একটি আইনগত অধিকার। দল ভাঙলে প্রতীকের অর্ধেক এক পক্ষকে এবং বাকিটা অন্য পক্ষকে দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কমিশনকে নির্ধারণ করতে হয়, নির্বাচনী প্রতীক আদেশের উদ্দেশ্যে কোন গোষ্ঠী সেই দল। ফলে দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব কিংবা আবেগের সম্পর্ক রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলি একাই প্রতীকের অবিচ্ছেদ্য ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না।

এই সিদ্ধান্তের পরিসরও মনে রাখা জরুরি। কমিশন নির্বাচনী উদ্দেশ্যে দলের পরিচয় ও প্রতীকের অধিকার নির্ধারণ করছে। দলের কার্যালয়, তহবিল অথবা অন্য সম্পত্তির সব দেওয়ানি বিরোধ একই সিদ্ধান্তে নিষ্পত্তি হয়ে যায়, এমন কথা রায়ে বলা হয়নি। কমিশনের নির্দেশ নির্বাচনী আধিকারিকের জন্য বাধ্যতামূলক হওয়ার বিষয়টি আদালত ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু উপযুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা যায় কি না, সেই সাধারণ প্রশ্নে আদালত এই মামলায় মত দেয়নি। অতএব রায়টিকে কমিশনের সিদ্ধান্তের সর্বাত্মক বিচারবহির্ভূত সুরক্ষা হিসেবে দেখানোও অসংগত।

শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট আপিলগুলি খারিজ করে। নির্বাচনী স্বীকৃতির জন্য জগজীবন রামের সভাপতিত্বাধীন গোষ্ঠীকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস হিসেবে গণ্য করার কমিশনের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। রায়টির তারিখ ১৯৭১ সালের হলেও আইনসংকলনে এটি ১৯৭২ সালের উদ্ধৃতিতে পরিচিত। এই পার্থক্য থেকেই অনেক সময় সাল নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মামলাটি মূলত কমিশনের বিচারক্ষমতা এবং ব্যবহৃত মাপকাঠির বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রতিটি পরবর্তী দলভাঙনের বিরোধে একই ফল হবে, অথবা একই পদ্ধতি যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে, এমন সিদ্ধান্ত সেখানে নেই।

বর্তমান কোনও প্রতীক স্থগিতের আদেশ বিচার করতে তাই দুটি প্রশ্ন আলাদা রাখতে হবে। কমিশনের বিরোধ মেটানোর ক্ষমতা আছে কি না, তার উত্তর এই রায়ে পাওয়া যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয়, যুক্তিসংগত এবং যথেষ্ট তথ্যসমর্থিত কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদেশ ও নথি দেখে বিচার করতে হবে। সাদিক আলির রায় প্রতিটি স্থগিতাদেশের আগাম অনুমোদন নয়। আবার শুধু কোনও পক্ষের রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে বলেই কমিশনের এখতিয়ার অস্বীকার করাও চলে না। ক্ষমতার স্বীকৃতির সঙ্গে প্রয়োজন প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত, ন্যায্য শুনানি এবং দ্রুত নিষ্পত্তি।