ন্দীগ্রামে প্রার্থী না দিয়ে কংগ্রেসকে সমর্থনের বিনিময়ে রেজিনগরে তাদের সাহায্য চেয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির— উপনির্বাচনের মুখে এমন দাবিতে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। এক প্রবীণ কংগ্রেস নেতার বক্তব্য, প্রস্তাব পৌঁছেছিল দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করেছে। ফলে আসন সমঝোতার উদ্যোগ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এলেও কোনও পক্ষের সম্মতিতে রফার ঘোষণা হয়নি।

মঙ্গলবার ওই কংগ্রেস নেতা দাবি করেন, আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনটি কংগ্রেসকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল মমতা শিবির। তৃণমূলের বক্তব্য, এমন কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। এই অস্বীকারের কারণে প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়টিকে এখনও প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

সম্ভাব্য সমঝোতার অঙ্কটি ছিল সহজ। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে লড়বে কংগ্রেস, সেখানে মমতা শিবির প্রার্থী প্রত্যাহার করবে। অন্য দিকে, মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে মমতাপন্থী তৃণমূল প্রার্থীকে সমর্থন জানাবে কংগ্রেস। ‘দ্য স্টেটসম্যান’ কংগ্রেস সূত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালের সঙ্গে মমতার টেলিফোনে কথা হয়। তবে এই যোগাযোগের বিবরণও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান অবশ্য অন্য। তাঁর বক্তব্য, সমঝোতা চাইলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর, দুই কেন্দ্রেই কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করুক কালীঘাট শিবির। তার পরে বৃহত্তর বোঝাপড়ার আলোচনা হতে পারে। অর্থাৎ, একটি আসন ছেড়ে অন্যটি পাওয়ার প্রস্তাবে সায় দেওয়ার বদলে দুই আসনেই সমর্থন চেয়েছে কংগ্রেস। নন্দীগ্রামে তাদের প্রার্থী মিলন প্রধান, রেজিনগরে মহম্মদ আব্দুল্লাহিল কাফি।

কংগ্রেসের আপত্তির পিছনে রয়েছে নিজেদের সংগঠন ফের গড়ে তোলার হিসাব। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদনে দলীয় সূত্রের বক্তব্য, দীর্ঘ ক্ষয়ের পরে বাংলায় কংগ্রেস স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জমি উদ্ধারের চেষ্টা করছে। এই সময়ে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করলে সেই উদ্যোগ বাধা পেতে পারে। স্থানীয় কর্মীদের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলের শাসনকালে যাঁদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে এত দ্রুত হাত মেলানোর যুক্তি কর্মীদের বোঝানো কঠিন বলে মনে করছেন কংগ্রেস নেতৃত্বের একাংশ।

এর সঙ্গে অতীতের অভিজ্ঞতাও জড়িয়ে। আগের জোট থেকে তৃণমূলের বেরিয়ে যাওয়া এবং কংগ্রেস কর্মীদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। এই অভিযোগগুলির রাজনৈতিক প্রভাব এখনও কাটেনি বলেই কংগ্রেস সূত্রের দাবি। ফলে বিজেপির বিরোধিতা করার প্রশ্নে জাতীয় স্তরের সহযোগিতা থাকলেও বাংলার দুটি কেন্দ্রে আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে একই চোখে দেখছে না প্রদেশ নেতৃত্ব।

তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের ধারণা ছিল, শুভেন্দুর শক্ত ঘাঁটি নন্দীগ্রামে লড়াই চালিয়ে রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দেওয়া সম্ভব হলেও সাফল্য পাওয়া কঠিন। তুলনায় সংখ্যালঘুপ্রধান রেজিনগরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বেশি বলে তাঁরা মনে করছিলেন। এই বিবেচনা থেকেই দুই আসনে পৃথক দলের প্রার্থীকে সমর্থনের ভাবনা এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনও কেন্দ্রের সামাজিক গঠন থেকেই ভোটের ফল নিশ্চিত করা যায় না; দলের সংগঠন, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত আসল ফল নির্ধারণ করবে।

নন্দীগ্রাম নিয়ে এই জল্পনার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জমি আন্দোলনের সূত্রে এলাকাটি মমতার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। অথচ ২০২১ সালে সেখানেই শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন তিনি। পরে ভবানীপুরের উপনির্বাচনে জিতে বিধানসভায় ফেরেন। এ বছরের নির্বাচনে শুভেন্দু ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম, দুই আসনেই জেতেন; ভবানীপুরে পরাজিত হন মমতা। শুভেন্দু ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে ফের ভোট হচ্ছে।

উপনির্বাচন ঘোষণার পরে মমতা নিজে নন্দীগ্রামে দাঁড়াবেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলেছিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির জানিয়েছিল, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তারা প্রার্থী দেবে না। মমতাকে বিধানসভায় দেখতে চাওয়ার কথা বলার পাশাপাশি তাঁর নির্বাচনী পরাজয় নিয়ে কটাক্ষও করেছিলেন বিদ্রোহী নেতারা। সেই আহ্বান গ্রহণ করে মমতা অবশ্য প্রার্থী হননি।

রবিবার মমতা শিবির নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে এবং রেজিনগরে রবিউল আলম চৌধুরীর নাম ঘোষণা করে। সঞ্চিতা পেশায় শিক্ষিকা এবং স্থানীয় দলীয় কর্মী। নন্দীগ্রামে প্রাক্তন মন্ত্রী অখিল গিরির নাম নিয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে তৃণমূল সূত্রে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বেছে নেওয়া হয়নি। ফলে কংগ্রেসকে আসন ছাড়ার দাবিটি এমন সময়ে উঠেছে, যখন মমতা শিবির নিজস্ব প্রার্থীও ঘোষণা করে ফেলেছে।

লড়াই আরও জটিল করেছে তৃণমূলের বিভাজন। ঋতব্রত শিবিরও দুই কেন্দ্রে আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। দলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ নির্বাচন কমিশনের বিচারাধীন। তাই এই উপনির্বাচনে বিজেপির মোকাবিলার পাশাপাশি তৃণমূলের দুই অংশের মধ্যে সমর্থনের শক্তি যাচাইয়ের প্রশ্নও রয়েছে। সমঝোতা না হলে একই ভোটের জন্য একাধিক বিরোধী প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

বিজেপি নন্দীগ্রামে প্রার্থী করেছে শুভেন্দুর নিহত প্রাক্তন আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে। রেজিনগরে তাদের প্রার্থী শাখারভ সরকার। রেজিনগর আসনটি খালি হয়েছে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের পদত্যাগে; তিনি নওদার আসনটি রেখেছেন। দুই কেন্দ্রেই বাম প্রার্থীও রয়েছেন। অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত কোনও প্রার্থী প্রত্যাহার না হলে লড়াই হবে বহুমুখী। ভোটগণনা নির্ধারিত রয়েছে ৯ অক্টোবর।

এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের কাছে প্রশ্ন, বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট একত্র করা বেশি জরুরি, নাকি নিজেদের হারানো সংগঠন পুনরুদ্ধার। মমতা শিবিরের কাছে প্রশ্ন, নির্বাচনী বিপর্যয় ও দলীয় ভাঙনের পরে কোথায় কতটা শক্তি নিয়ে নামা সম্ভব। নন্দীগ্রাম নিয়ে কথিত প্রস্তাব সেই ভিন্ন অগ্রাধিকারের দিকেই ইঙ্গিত করছে। তবে মমতা নিজে কংগ্রেসের দ্বারস্থ হয়েছিলেন— এমন সিদ্ধান্ত টানার ক্ষেত্রে তৃণমূলের অস্বীকার এবং প্রকাশ্যে নিশ্চিত তথ্যের সীমাবদ্ধতা দুটিই মনে রাখতে হবে।