সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: মুসলিমরা বিজেপিকে ভোট দেন না, শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্য শুনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি ওঠে, তা সহজ: কেন দেবেন? কোনও রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়া নাগরিকের বাধ্যবাধকতা নয়। ভোট পেতে হলে তাঁর আস্থা অর্জন করতে হয়। তাঁর নিরাপত্তা, সম্মান, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস দিতে হয়। অথচ বিজেপির রাজনীতিতে মুসলিম নাগরিককে প্রায়ই এমন এক পরীক্ষার্থীর জায়গায় দাঁড় করানো হয়, যাঁকে নিজের দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হবে, কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে, সন্দেহের জবাব দিতে হবে। এতগুলি পরীক্ষা পাশ করার পরে তাঁর হাতে ভোটের অধিকারটি যেন অনুগ্রহ করে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সমস্যা ভোটারের অনীহায়, না এই ব্যবহারে?

প্রথমে শুভেন্দুর বক্তব্যের একটি তথ্যগত সংশোধন প্রয়োজন। মুসলিমদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন কম,এ কথা বলা যায়। কোনও মুসলিম বিজেপিকে ভোট দেন না, এ কথা বলা যায় না। ক্রিস্তফ জাফরেলো ও হিলাল আহমেদের গবেষণায়, লোকনীতি–সিএসডিএসের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রায় আট শতাংশ মুসলিম ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন। এটি সারা দেশের সমীক্ষাভিত্তিক হিসাব, পশ্চিমবঙ্গের ফল নয়, সরকারি ধর্মভিত্তিক ভোটগণনাও নয়। তবু শূন্য আর আটের মধ্যে যে পার্থক্য আছে, তা বোঝার জন্য বিশেষ অঙ্ক জানার দরকার পড়ে না। রাজনৈতিক বক্তৃতায় সেই পার্থক্যটি মুছে দেওয়া সুবিধাজনক, বিশ্লেষণে নয়।

আরও বড় কথা, মুসলিম সমাজ কোনও একটি বোতামে চালিত যন্ত্র নয়। সেখানে ধনী ও দরিদ্র আছেন, জমির মালিক ও ক্ষেতমজুর আছেন, ব্যবসায়ী ও পরিযায়ী শ্রমিক আছেন। নারী ও পুরুষের অভিজ্ঞতা এক নয়; শহর ও গ্রামের প্রয়োজনও এক নয়। কংগ্রেস, বামপন্থী, তৃণমূল, আঞ্চলিক দল কিংবা বিজেপির প্রতি তাঁদের সমর্থনের কারণও আলাদা হতে পারে। সকলকে এক বাক্যে বেঁধে ফেললে মানুষের রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধিটাই অস্বীকার করা হয়। হিন্দু ভোটারের মতবদলকে যদি সচেতন সিদ্ধান্ত বলা হয়, মুসলিম ভোটারের সিদ্ধান্তকে শুধু ধর্মীয় নির্দেশের ফল হিসেবে দেখার অধিকার থাকে কী?

এই আলোচনায় শুভেন্দুর নিজের রাজনৈতিক ভাষা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই বিজেপির রাজ্য কার্যকারিণীর বৈঠকে তিনিই সর্বজনীন উন্নয়নের পরিচিত স্লোগান বন্ধ করার কথা বলেছিলেন, সংখ্যালঘু মোর্চার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত অবস্থানের মর্ম ছিল, যাঁরা আমাদের সঙ্গে, আমরা তাঁদের সঙ্গে। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, তাঁর বক্তব্য দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে; প্রশাসন ও উন্নয়ন নিয়ে নয়। সেই ব্যাখ্যাটিও মনে রাখতে হবে। কিন্তু প্রথম বক্তব্যে যে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা যায়, পরের ব্যাখ্যায় তা সম্পূর্ণ মুছে যায় কি?

দল বলতে পারে, সীমিত শক্তি কোথায় ব্যয় করবে, সেটি তার সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু যাঁদের কাছে পৌঁছনোর সংগঠনটিই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, তাঁদের সমর্থন না পাওয়াকে পরে তাঁদের অপরাধ বানানো চলে না। সম্পর্কের উদ্যোগ নেবেন না, সম্পর্কের অভাব নিয়ে অভিযোগ করবেন,এই যুক্তি রাজনীতির মঞ্চে হাততালি পেতে পারে, বিশ্বাস তৈরি করে না। বরং ভোটারের মনে প্রশ্ন জাগায়: আমার সমর্থন নিশ্চিত হলেই যদি আপনার সহমর্মিতা জাগে, বিরোধিতা করলে আমার জায়গা কোথায়? গণতন্ত্রের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নিশ্চয়তাটি তো বিরোধী নাগরিকের জন্যই। সমর্থকের পাশে দাঁড়াতে বিশেষ উদারতা লাগে না।

তাহলে বিজেপি মুসলিমদের জন্য কোনও সদর্থক উদ্যোগই নেয়নি? এমন দাবি করাও তথ্যের প্রতি অবিচার হবে। পিছিয়ে থাকা পসমন্দা মুসলিমদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা দল করেছে। কেন্দ্রের ‘পিএম বিকাশ’ প্রকল্পে স্বীকৃত ছয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, মহিলাদের উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং বিদ্যালয়ছুটদের শিক্ষায় সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। এই উদ্যোগগুলি বাস্তব; শুধু বিরোধিতার সুবিধার জন্য সেগুলি মুছে দেওয়া উচিত নয়। তবে প্রকল্পের অস্তিত্ব, তার বাস্তব সুফল এবং সরকারের প্রতি রাজনৈতিক আস্থা—তিনটি আলাদা বিষয়। প্রথমটির ঘোষণা দিয়ে বাকি দুটির সাফল্য প্রমাণ করা যায় না।

পশ্চিমবঙ্গেও উপনির্বাচনের মুখে শুভেন্দু সংখ্যালঘুদের বিজেপিকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, সরকারি প্রকল্প ধর্ম দেখে সুবিধা দেয় না; অন্নপূর্ণা ও আবাস প্রকল্পে সংখ্যালঘুরাও উপকৃত হচ্ছেন। এই বক্তব্যের যথার্থ অংশটি স্বীকার করাই উচিত: উন্নয়নে ধর্মীয় বাছবিচার চলতে পারে না। কিন্তু সেখান থেকে ভোটের প্রত্যাশা পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক আছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া এবং শাসক দলের রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুমোদন করা একই কাজ নয়। একজন নাগরিক প্রথমটি গ্রহণ করে দ্বিতীয়টি প্রত্যাখ্যান করতেই পারেন। তাতে তাঁর সততা বা নাগরিকত্বের কোনও ঘাটতি হয় না।

সরকারি টাকা কোনও দলের পারিবারিক সঞ্চয় নয়। মুসলিম নাগরিকও জিনিসপত্র কেনেন, পরোক্ষ কর দেন, শ্রম দেন, উৎপাদন করেন, দেশের অর্থনীতিতে অংশ নেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি সহায়তা পাওয়া তাঁর অধিকার। সেই সহায়তার পাশে অলিখিত শর্ত বসিয়ে দেওয়া যায় না,পরের নির্বাচনে আমাদের ভোট দিতে হবে। ভোটের বিনিময়ে দয়া বিতরণ জমিদারি সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই; প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে নয়। একই কথা তৃণমূলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনও মহিলা সরকারি ভাতা পান বলে তাঁর ভোট কোনও নেত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে যায় না। নাগরিকের প্রাপ্যকে দলীয় ঋণ বানানোর চেষ্টা সব রঙের রাজনীতিতেই আপত্তিকর।

বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি হয় যখন উন্নয়নের ভাষার পাশেই অপমানের ভাষা চলে। ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল রাজস্থানের বাঁশওয়াড়ার সভায় নরেন্দ্র মোদী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সম্পদ বণ্টনের অভিযোগ তুলতে গিয়ে মুসলিমদের প্রসঙ্গের সঙ্গে ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং বেশি সন্তান থাকার কথা জুড়েছিলেন। পরে তিনি ধর্মীয় বিভাজন তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু সেই বক্তৃতায় আক্রান্ত বোধ করার কারণ মুসলিম শ্রোতার ছিল। দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন এমন ভাষা ব্যবহার করেন, তখন সেটিকে কোনও অখ্যাত কর্মীর অসংযত মন্তব্য বলে সরিয়ে রাখা যায় না।

একজন দরিদ্র মুসলিম পরিবারের কর্তার কথা ভাবা যাক। তিনি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি শুনছেন, আবার তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সন্দেহের মধ্যে ফেলার কথাও শুনছেন। কোন কথাটিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, তা তাঁর অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করবে। চাকরির প্রশিক্ষণ মূল্যবান, কিন্তু রাস্তায় নিরাপদে চলাফেরার নিশ্চয়তাও মূল্যবান। সরকারি ঘর মূল্যবান, কিন্তু প্রতিবেশীর চোখে চিরস্থায়ী সন্দেহভাজন হয়ে না থাকার মর্যাদাও মূল্যবান। মানুষ শুধু কিছু সুবিধার যোগফল নয়। তাঁর ভয়, আত্মসম্মান, সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগ এবং সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষাও আছে। ভোটের হিসাবে এই অনুভূতিগুলি বাদ দিলে হিসাবটাই ভুল হবে।

সন্দেহটি নিছক বিরোধীদের বানানো গল্প কি না, ইতিহাসের কয়েকটি দৃশ্য তার উত্তর দেয়। ২০১৮ সালে ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে আলিমুদ্দিন আনসারিকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় নিম্ন আদালতে দণ্ডিত আটজন জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জয়ন্ত সিন্হা তাঁদের মালা পরিয়েছিলেন। সমালোচনার পরে তিনি দুঃখপ্রকাশ করেন; আইন নিজের পথে চলবে বলেও জানান। এখানে পরবর্তী ব্যাখ্যা যেমন সত্য, মালা পরানোর ঘটনাটিও সত্য। একজন মুসলিম ভোটার কোন দৃশ্যটি মনে রাখবেন, সেটা কোনও দল ঠিক করে দিতে পারে না। তাঁর ভয়কে অমূলক বলার আগে সেই ছবির রাজনৈতিক অর্থ স্বীকার করতে হবে।

বাড়ি ভাঙাকে অপরাধ দমনের প্রদর্শনী করে তোলার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে, অপরাধের অভিযোগ বা দণ্ডসিদ্ধির কারণেই কারও সম্পত্তি ভেঙে দেওয়া যায় না, প্রশাসন বিচারকের ভূমিকা নিতে পারে না। বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা এবং অভিযুক্তকে শাস্তি দিতে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া আলাদা বিষয়। এই পার্থক্য সকলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু রাজনৈতিক মঞ্চে ধ্বংসের দৃশ্যকে শক্তির প্রতীক করা হলে অসুরক্ষিত মানুষ আশ্বাসের বদলে আতঙ্ক পেতে পারেন। সেই আতঙ্ক নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না।

অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্তরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বেআইনি প্রবেশের অভিযোগ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে হয়; ধর্মীয় পরিচয় তার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশে হিন্দুর উপর অত্যাচারের প্রতিবাদও অবশ্যকর্তব্য। সেই অপরাধের দায় ভারতের মুসলিম প্রতিবেশীর নয়। এই সাধারণ পার্থক্যগুলি মেনে চলতে কোনও বিশেষ মতাদর্শের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ন্যায়ের একই মাপকাঠি। সীমান্তের ওপারের সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা চাইব, এপারের সংখ্যালঘুর উদ্বেগ শুনব না,এই অবস্থান নৈতিকভাবে টেকে না। প্রতিবেশী দেশের অন্যায় আমাদের দেশের নাগরিকের অধিকার কমিয়ে দেওয়ার অনুমতিপত্র হতে পারে না। নইলে প্রতিবাদেও ন্যায় থাকে না; থাকে শুধু সুবিধামতো পক্ষ বেছে নেওয়া।

প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিও ছোট নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র মুসলিম প্রার্থী ছিলেন কেরলের মালাপ্পুরমের এম আব্দুল সালাম। এত বড় একটি জাতীয় দলের প্রার্থীতালিকায় এই উপস্থিতি রাজনৈতিক অংশীদারির সীমা বুঝিয়ে দেয়। অবশ্যই মুসলিম নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব শুধু মুসলিম জনপ্রতিনিধিই করতে পারেন, এমন কোনও কথা নেই। কিন্তু কোনও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় প্রায় অনুপস্থিত থাকলে সমান অংশীদারির প্রতিশ্রুতি দুর্বল হয়। শুধু সুবিধাভোগীর তালিকায় নাম থাকলেই ক্ষমতার দরজায় প্রবেশাধিকার তৈরি হয় না। গ্রহণকারীর আসন আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আসন এক নয়।

এর অর্থ মুসলিম সমাজের ভিতরের রক্ষণশীলতা, নারীর প্রতি অবিচার বা ধর্মীয় নেতৃত্বের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, তা নয়। অবশ্যই যাবে। কোনও ধর্মই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, কোনও ধর্মগুরুরই মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে যাঁদের অধিকার নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের সমান নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার উপর। মুসলিম মহিলার মুক্তির কথা বলার পাশাপাশি তাঁর পরিচয়কে বিদ্রুপ করা হলে মুক্তির প্রতিশ্রুতিটি সন্দেহের মধ্যে পড়ে। ন্যায়ের দাবি তখন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ভাষার বদলে রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার বলে মনে হতে পারে।

বিজেপির সঙ্গে মুসলিম ভোটারের দূরত্ব বোঝার জন্য নিরাপত্তাভিত্তিক ভোটের যুক্তিটিও বুঝতে হবে। কোনও ভোটার যদি মনে করেন একটি দল তাঁর জীবনকে বেশি অনিশ্চিত করবে, তবে সেই দলকে হারাতে সক্ষম প্রার্থীকে তিনি বেছে নিতে পারেন। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতি গভীর প্রেম প্রমাণিত হয় না। অনেক সময় এটি উপলব্ধ বিকল্পগুলির মধ্যে কম বিপজ্জনকটিকে বেছে নেওয়া। যে ভোটার নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দুশ্চিন্তায় আছেন, তাঁকে আগে আদর্শ রাজনৈতিক বিকল্প আবিষ্কার করে আসতে বলা নিষ্ঠুরতা। তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যায়; সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানবিক কারণটিকে বাতিল করা যায় না।

এখানেই তৃণমূলের মতো দলেরও জবাবদিহি আছে। বিজেপির ভয় দেখিয়ে মুসলিম ভোট পাওয়া আর মুসলিম নাগরিকের শিক্ষা, কাজ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উন্নতি করা এক বিষয় নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি কিংবা ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা উন্নয়নের বিকল্প হতে পারে না। সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক সমর্থনকে স্থায়ী আমানত মনে করলে তাঁদের স্বাধীন বিচারবুদ্ধিকে সেখানেও অপমান করা হয়। তৃণমূলের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। কিন্তু সেই ব্যর্থতার কারণে বিজেপির প্রতি আস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্মাবে, এমন দাবি অযৌক্তিক। একটি দলের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি অন্য দলের বিভাজনমূলক ভাষাকে গ্রহণযোগ্য করে না।

আসলে এই ব্যবস্থায় দুই ধরনের রাজনীতিরই সুবিধা হতে পারে। এক পক্ষ মুসলিমদের ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের সংগঠিত করতে চায়; অন্য পক্ষ প্রথম পক্ষের ভয় দেখিয়ে মুসলিমদের নিজের পাশে রাখতে চায়। মাঝখানে নাগরিকের প্রয়োজন চাপা পড়ে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই কেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নেই কেন, কাজের জন্য বাড়ি ছাড়তে হয় কেন—এসব প্রশ্ন ধর্মীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় হারিয়ে যায়। এটি কোনও গোপন আঁতাতের অভিযোগ নয়; পরস্পরকে শক্তি জোগানো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ। বিভাজন যত বাড়ে, কাজের হিসাব চাওয়ার জায়গা তত সঙ্কুচিত হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দরিদ্র মানুষের।

শুভেন্দুর বক্তব্যের আর একটি বিপদ হল, এতে বিজেপি ও হিন্দু সমাজকে সমার্থক ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। অথচ বিজেপির বিরোধিতা মানেই হিন্দুবিরোধিতা নয়। যেমন তৃণমূলের বিরোধিতা মানেই মুসলিমবিরোধিতা নয়। রাজনৈতিক দল মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠান; তাদের নীতি বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়, জোট বদলায়। ধর্মীয় পরিচয়কে দলের সঙ্গে এমনভাবে বেঁধে দেওয়া হলে সরকারের সমালোচনাও ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে চালানো সহজ হয়। গণতন্ত্রে এই সুবিধা কোনও দলকে দেওয়া যায় না। একজন হিন্দু বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেও হিন্দু থাকেন; একজন মুসলিম বিজেপিকে সমর্থন করলেও তাঁর মুসলিম পরিচয় কমে না।

একইভাবে বিজেপির প্রত্যেক ভোটারকে মুসলিমবিদ্বেষী বলে দাগিয়ে দেওয়াও অন্যায়। কেউ প্রশাসনিক পরিবর্তন চাইতে পারেন, কেউ দুর্নীতিতে বিরক্ত হতে পারেন, কেউ অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখতে পারেন। দলের সমর্থকদের এই বৈচিত্র্য স্বীকার করলেই সংখ্যালঘু ভোটারের বৈচিত্র্যও স্বীকার করতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে বহু কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করব, সংখ্যালঘুর সিদ্ধান্তকে একমাত্র ধর্ম দিয়ে বুঝব—এই পদ্ধতি শুরুতেই পক্ষপাতদুষ্ট। মানুষের ভোটকে সম্মান করার অর্থ তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। অর্থ হল, তাঁরও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বিচার করার ক্ষমতা আছে, এই সত্য মেনে নেওয়া। যে সম্মান নিজের জন্য চাই, অন্যের জন্যও সেটুকু রাখতে হয়।

ভোট না দেওয়াকে অকৃতজ্ঞতা বলা হলে আরও একটি অদ্ভুত দাবি উঠে আসে: সরকার নাগরিকের জন্য যা করেছে, সেটিই তাঁর সিদ্ধান্তের একমাত্র মাপকাঠি হতে হবে। কিন্তু নাগরিক হিসাব করবেন যা হয়নি, যা ক্ষতি হয়েছে এবং সামনে কী হতে পারে, সেসবও। রাস্তা তৈরি হয়েছে বলে বেকারত্বের প্রশ্ন শেষ হয় না। ভাতা পাওয়া গেছে বলে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বন্ধ হয় না। উন্নয়নের কৃতিত্ব দাবি করার অধিকার শাসকের আছে; সেই কৃতিত্বের মূল্য কতটা, তা নির্ধারণের অধিকার ভোটারের। নিজের কাজের নম্বর নিজেই দিয়ে ভোটারের হাতে শুধু স্বাক্ষরের কলম ধরানো চলে না।

সদর্থক ভূমিকার বিচার তাই কোনও একটি প্রকল্প, সফর বা সৌজন্যসাক্ষাতে শেষ হয় না। তার মাপকাঠি প্রতিদিনের প্রশাসন। একই অপরাধে একই ব্যবস্থা হচ্ছে কি? ঘৃণা ছড়ালে দলের পরিচয় নির্বিশেষে বাধা আসছে কি? অভিযোগ জানাতে গিয়ে নাগরিক নিজের নাম বা পোশাক নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ছেন কি? এগুলি বিশেষ সুবিধার দাবি নয়। একজন হিন্দুর জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, মুসলিমের জন্যও তেমনই। সমান আচরণের দাবি উঠলেই তাকে তোষণ বলা হলে বৈষম্য দূর করার পথটিই বন্ধ হয়ে যায়। তখন সমতার প্রতিশ্রুতি কাগজে থাকে, জনজীবনে তার উল্টো পাঠ শেখানো হয়।

কোনও সম্প্রদায়ের সমর্থন কম পাওয়া রাজনৈতিক দলের আত্মসমীক্ষার কারণ হওয়া উচিত। তাঁরা আমাদের সম্পর্কে কী শুনছেন, আমাদের আচরণে কী দেখছেন, কেন বিশ্বাস করছেন না—এগুলি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। পরিবর্তে যদি বলা হয়, ওরা এমনই, ওরা কখনও ভোট দেবে না, তাহলে নিজের দায়িত্ব থেকে পালানো হয়। তাতে অবিশ্বাস আরও জমে; সেই অবিশ্বাসকে আবার আগের অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায়। দরজা বন্ধ করে বলা খুব সহজ, দেখুন, কেউ ভিতরে আসছেন না। কিন্তু বন্ধ দরজার দায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ঘাড়ে চাপালে যুক্তির চেয়ে ঔদ্ধত্যই বেশি প্রকাশ পায়।

শুভেন্দুর অভিযোগের উত্তর তাই মুসলিম সমাজের কাছে আনুগত্যের হলফনামা চেয়ে পাওয়া যাবে না। বিজেপির কিছু উন্নয়নমূলক উদ্যোগ ও যোগাযোগের চেষ্টা আছে, কিন্তু সেগুলির পাশে বিভাজনের ভাষা এবং অসম অংশীদারির অভিজ্ঞতাও আছে। ভোটার এই গোটা অভিজ্ঞতার বিচার করেন। তাঁর অসম্মতি কোনও অপরাধ নয়, তাঁর ভয় কোনও চরিত্রদোষ নয়, তাঁর অধিকার কোনও পুরস্কার নয়। মুসলিম নাগরিক বিজেপিকে ভোট দিতে স্বাধীন, না দিতেও সমান স্বাধীন। শাসকের দায়িত্ব দুই অবস্থাতেই অপরিবর্তিত। যিনি ভোট দিলেন না, তাঁরও নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। গণতন্ত্রে সরকার গড়ার অনুমতি পাওয়া যায়; নাগরিকের বিবেকের মালিকানা পাওয়া যায় না।