Home International যুদ্ধ থামবে, নাকি ছড়াবে? ইরানের ‘প্রক্সি’ ছক

যুদ্ধ থামবে, নাকি ছড়াবে? ইরানের ‘প্রক্সি’ ছক

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
17 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটলেও সংঘাত যে এখনও শেষের কাছাকাছি নয়, ইরানের সাম্প্রতিক কৌশল সেই আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনের দাবি, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডে হামলা না চালিয়ে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ইরান-সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলিকে সক্রিয় করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল তেহরান।

ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন। তাই কৌশল ছিল অন্যরকম—যুদ্ধ যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করা এবং তার মূল্য ক্রমশ বাড়িয়ে তোলা।

তেহরানের হিসাব ছিল, মার্কিন সেনা মোতায়েন, সামরিক ব্যয়, তেলের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সর্বোপরি আমেরিকান জনমতের উপর চাপ বাড়তে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হতে পারে।

‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’-এর পুরনো কৌশল, নতুন প্রয়োগ

এই পরিকল্পনার ভিত্তি ইরানের বহুদিনের তথাকথিত ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’ নীতি। অর্থাৎ, নিজের ভূখণ্ডে যুদ্ধ আটকে না রেখে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখা।

এই কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া এবং অন্যান্য ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনের দাবি, মার্কিন বাহিনী যদি ফের ইরানের সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনায় বড় হামলা চালায়, তাহলে এই গোষ্ঠীগুলি একযোগে মার্কিন ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক পরিকাঠামোকে নিশানা করতে পারে।

লক্ষ্য হবে একটি সীমিত সংঘাতকে দ্রুত গোটা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।

নজরে হরমুজ

এই কৌশলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টগুলির একটি হতে পারে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

ইরান অতীতে একাধিকবার হরমুজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। সম্পূর্ণ অবরোধ কার্যকর করা কঠিন হলেও জাহাজ চলাচলে বাধা, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কিংবা সমুদ্রপথে মাইন পেতে বাণিজ্যিক পরিবহণে অনিশ্চয়তা তৈরি করা সম্ভব।

তার প্রভাব পড়তে পারে তেলের দামে। আর তেলের দাম বাড়লে তার ঢেউ পৌঁছতে পারে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে।

সরাসরি যুদ্ধ নয়, ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’

ইরানের সামরিক পরিকল্পনায় তাই সরাসরি শক্তির লড়াইয়ের বদলে গুরুত্ব পেয়েছিল ‘war of attrition’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের ধারণা

এই কৌশলের লক্ষ্য দ্রুত শত্রুকে পরাজিত করা নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা।

ইরানের হিসাব ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অনেক বেশি হলেও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ক্রমশ বাড়তে থাকবে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই বাড়বে সামরিক ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।

তবে প্রক্সি বাহিনী কতটা সক্ষম?

এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও এখানেই।

গত কয়েক বছরে ইরানের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি গোষ্ঠী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইজরায়েলের ধারাবাহিক অভিযানে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব ও সামরিক পরিকাঠামো দুর্বল হয়েছে। সিরিয়া ও ইরাকেও ইরান-ঘনিষ্ঠ একাধিক ঘাঁটি হামলার শিকার হয়েছে।

ফলে অতীতের মতো একযোগে এবং বড় মাত্রায় আঘাত হানার ক্ষমতা এখনও তাদের রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তার উপর প্রক্সি গোষ্ঠীর হামলা সবসময় তেহরানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। কোনও হামলায় যদি বড় সংখ্যায় মার্কিন সেনা নিহত হন, তাহলে ওয়াশিংটন আরও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। তখন সংঘাত সীমিত রাখার বদলে তা আরও বড় যুদ্ধে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তেহরানের ঘরেও চাপ কম নয়

বাইরের লড়াইয়ের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরেও পরিস্থিতি সহজ নয়।

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং পরিকাঠামোগত চাপের মধ্যে নতুন করে বড় যুদ্ধ দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করতে পারে।

ফলে তেহরানের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে শক্তি প্রদর্শন করে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মধ্যে রাখা, অন্যদিকে এমন কোনও পদক্ষেপ না করা যাতে সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়।

মিত্রদেরও টেনে আনার ছক

ইরানের সম্ভাব্য কৌশলের আরেকটি দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অংশীদারদের উপর চাপ বাড়ানো।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কাতার কিংবা বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং জ্বালানি পরিকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে শুধু ওয়াশিংটন নয়, গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণই বদলে যেতে পারে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থাৎ, যুদ্ধের ময়দান শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে গোটা অঞ্চলে এবং তার বাইরেও।

ট্রাম্পের জন্যও দ্বৈত সমীকরণ

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানও ছিল দ্বিমুখী। একদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত রাখার বার্তা, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের দরজা খোলা রাখা।

ইরানও একই ধরনের হিসাব কষছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে—প্রয়োজনে দ্রুত সংঘাত বাড়ানো যাবে, আবার পরিস্থিতি অনুকূল হলে আলোচনার টেবিলেও ফেরা যাবে।

আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে প্রক্সি বাহিনীর ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধের বদলে একাধিক অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী সংঘাতের গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর যেমন বাড়ে, তেমনই সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনের মূল বার্তা স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রচলিত সামরিক শক্তির লড়াইয়ে ইরান হয়তো জিততে পারবে না, কিন্তু যুদ্ধের ‘দাম’ বাড়িয়ে দিতে পারে।

সেই দাম হতে পারে মার্কিন সেনা, সামরিক ব্যয়, তেলের বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কিংবা ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

যুদ্ধবিরতি টেকসই না হলে, তেহরানের আসল অস্ত্র তাই শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়—সময়, অনিশ্চয়তা এবং বহু ফ্রন্টে চাপ।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles