Home খবর হরমুজের ছায়া: যুদ্ধের হুমকি, রুপির পতন

হরমুজের ছায়া: যুদ্ধের হুমকি, রুপির পতন

Authored By পার্বণ
94 views 3 minutes read
A+A-
Reset

পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের গন্ধ ঘনীভূত হচ্ছে, আর সেই অস্থিরতার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ভারতের অর্থনীতিতে। আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন এই দুই বাস্তবতা আসলে একই সুতোয় বাঁধা—সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই তাদের একত্রে নিয়ে এসেছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানকে কড়া বার্তা দিচ্ছেন, অন্যদিকে সেই উত্তেজনার অভিঘাতে ভারতীয় রুপি নেমে যাচ্ছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে। এই দ্বিমুখী সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শক্তি, তেল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী—হরমুজ প্রণালী।

ট্রাম্পের বক্তব্যে যেমন কূটনৈতিক সংযমের ছাপ রয়েছে, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণভাবে উচ্চারিত হয়েছে খোলামেলা সামরিক হুমকি। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের “নতুন ও তুলনামূলকভাবে যুক্তিসঙ্গত” নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে—যা থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পথ খুঁজছে। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যদি হরমুজ প্রণালী—যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়—ব্যাহত হয় বা বন্ধ হয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও তেলক্ষেত্র ধ্বংস করতেও দ্বিধা করবে না। অর্থাৎ, আলোচনার আড়ালে এখানে কার্যকর রয়েছে প্রতিরোধমূলক সামরিক নীতির এক পরিচিত রূপ—আলোচনা টিকিয়ে রাখতে শক্তির প্রদর্শন।

এই হুমকির রাজনৈতিক গুরুত্ব যতটা স্পষ্ট, তার অর্থনৈতিক প্রভাব সম্ভবত আরও গভীর। বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি নির্ভর করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তার ওপর। ইরান যদি এই জলপথে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তা শুধু পশ্চিম এশিয়ার সীমাবদ্ধ সমস্যা থাকবে না; বরং তা রূপ নেবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে। আর সেই সম্ভাবনার আভাসেই এখন আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়েছে।

এই অস্থিরতার তাৎক্ষণিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ভারতের অর্থনীতিতে। ভারতীয় রুপি মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ₹৯৫.১৪-এ নেমে গিয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। এর পেছনে কাজ করছে একাধিক সমান্তরাল চাপ—প্রথমত, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে; দ্বিতীয়ত, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক পুঁজি প্রত্যাহার, যা মার্চ মাসেই প্রায় ₹১.১৪ লক্ষ কোটির ঘরে পৌঁছেছে; এবং তৃতীয়ত, ডলারের প্রতি বিশ্বজুড়ে চাহিদা বৃদ্ধি, যা উদীয়মান অর্থনীতিগুলিকে আরও চাপে ফেলছে।

ভারতের ক্ষেত্রে এই সংকট দ্বিমাত্রিক। একদিকে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক—ফলে তেলের দাম বাড়লে সরাসরি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, চলতি হিসাবের ঘাটতি প্রসারিত হয় এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ে। অন্যদিকে, রুপির দুর্বলতা সেই আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে—ফলে সৃষ্টি হয় আমদানি-নির্ভর মূল্যবৃদ্ধির এক জটিল চক্র। এই পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ব্যবহার করে তারা বাজারে হস্তক্ষেপ করছে বটে, তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই চাপ কতদিন সামাল দেওয়া সম্ভব?

সমগ্র পরিস্থিতি একটি বৃহত্তর সত্যকে সামনে আনে: আজকের বিশ্বে ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতি আর আলাদা কোনও ক্ষেত্র নয়। ট্রাম্পের একটি বক্তব্য, কিংবা ইরানের একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ—তা সরাসরি কলকাতার বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘পারস্পরিক ঝুঁকির সংযোগ’—অর্থাৎ, এক অঞ্চলের অস্থিরতা অন্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

ফলে, বিশ্ব এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, অন্যদিকে যুদ্ধের সম্ভাবনা; একদিকে শক্তি নিরাপত্তা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। ট্রাম্পের হুমকি এবং রুপির পতন—এই দুই ঘটনাই একই বৃহত্তর কাহিনির পৃথক অধ্যায়, যেখানে শক্তির রাজনীতি শেষ পর্যন্ত এসে মিশে যায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতায়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles