ণিতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্নকে একত্রে বলা হয় ‘মিলেনিয়াম প্রবলেমস’ বা ‘সহস্রাব্দের সমস্যা’। বিশ্বের অগ্রগণ্য গণিতবিদদের নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে উৎসাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই সমস্যাগুলি বেছে নেওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার ওপেনএআই দাবি করেছে, তাদের সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সেই সমস্যাগুলির একটির সমাধান করে ফেলেছে।

এই ঘোষণা আরও স্পষ্ট করে দিল, গণিতচর্চার সর্বোচ্চ স্তরেও মৌলিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রকে মানুষের মেধা ও সাফল্যের অন্যতম শিখর বলে মনে করা হয়েছে। পরিবর্তনটি কিছু গণিতবিদকে উৎসাহিত করছে, আবার অন্যদের মনে উদ্বেগও তৈরি করছে।

গত এক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থা এমন বহু সমস্যার সফল সমাধান করেছে, যেগুলি কয়েক দশক ধরে গণিতবিদদের ধাঁধায় রেখেছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে ওপেনএআইয়ের প্রযুক্তি যে সমস্যাটির সমাধান করেছে বলে দাবি, আগের সমস্যাগুলি তার মতো জটিল ছিল না। সেগুলিকে ঘিরে এত ব্যাপক নজরও ছিল না। গণিতে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে যে সমস্যাগুলি নিয়ে, ‘সহস্রাব্দের সমস্যা’ তার মধ্যে অন্যতম।

ওপেনএআইয়ের গবেষক সেবাস্তিয়াঁ বুবেক সংস্থার নতুন সমাধান সম্পর্কে বলেছেন, “গত বারো মাসে যে অগ্রগতির ধারা আমরা দেখেছি, এটি তার এক অসাধারণ পরিণতি।”

সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ মডেলগুলির একটি মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় ‘নাভিয়ের–স্টোকস অস্তিত্ব ও মসৃণতার সমস্যা’র সমাধান করেছে। মডেলটি এখনও সাধারণের ব্যবহারের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। সমস্যাটির কেন্দ্রে রয়েছে একগুচ্ছ সমীকরণ, যা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে প্রায়ই ব্যবহৃত হয়।

এই সমীকরণগুলি জল ও অন্যান্য প্রবাহী পদার্থের গতিবিধি বর্ণনা করে। নাভিয়ের–স্টোকস সমস্যার প্রশ্নটি হল, বিশেষ কোনও পরিস্থিতিতে এই সমীকরণগুলি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে কি না। সমস্যাটির সমাধানের সুস্পষ্ট কোনও ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই। ওপেনএআইয়ের দেওয়া প্রমাণের দাবি, ঠিক এমনই একটি পরিস্থিতি তারা চিহ্নিত করেছে।

অন্তত তাত্ত্বিকভাবে এর অর্থ দাঁড়াবে, নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলিই ভেঙে পড়তে পারে। যেমন, জলকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে, যেখানে তা আপনা থেকেই বিস্ফোরিত হবে। তবে গণিতবিদ ও পদার্থবিদেরা মনে করেন না, গাণিতিক এই ভাঙন বাস্তব জগতে সত্যিই এমন কোনও পরিণতি ঘটাতে পারে।

নতুন সহস্রাব্দে গণিতের অগ্রগতি পরিমাপ করার একটি উপায় হিসেবে ক্লে ম্যাথেমেটিক্স ইনস্টিটিউট ২০০০ সালে সাতটি ‘সহস্রাব্দের সমস্যা’ বেছে নিয়েছিল। তারই একটি নাভিয়ের–স্টোকস সমস্যা। ল্যান্ডন টি. ক্লে নামে এক মার্কিন ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করেছিল, প্রতিটি সমস্যার প্রথম সঠিক সমাধানের জন্য দশ লক্ষ ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। ওপেনএআইয়ের এই ঘোষণার আগে পর্যন্ত সাতটির মধ্যে মাত্র একটির সমাধান হয়েছিল।

লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টেরেন্স টাও বলেছেন, “এই প্রশ্নগুলি এক-একটি বাতিঘর। এগুলি এমন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু, যা মানুষের বৈজ্ঞানিক প্রয়াসকে আকর্ষণ করে।” অনেকের মতে, টাও তাঁর প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ।

সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত গণিতচর্চার ক্ষতি করতে পারে বলে যে গণিতবিদেরা প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন, টাও তাঁদের অন্যতম। তাঁর বক্তব্য, মানুষের সামান্য সাহায্য নিয়েই যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারে, তা হলে গণিত সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, “সমস্যা সমাধান করতে যে পরিশ্রম করতে হয়, তা থেকে প্রায়ই অনেক কিছু শেখা যায়। সেই চেষ্টা আপনাকে কিছু শেখায়। ব্যাপারটা অনেকটা শরীরচর্চার কেন্দ্রে গিয়ে একশো বার ভার তোলার লক্ষ্য নেওয়ার মতো।”

তাঁর সংযোজন, “এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশ্নের সমাধান করতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া থেকে শেখার মূল্যটি পাওয়া যায় না। যেন শরীরচর্চার কেন্দ্রে এমন যন্ত্র রাখা হয়েছে, যা আপনার হয়ে ভার তুলে দেবে।”

তবে টাও এবং অন্যেরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এখনও গণিতবিদেরা সাহায্য করেন। ওপেনএআই জানিয়েছে, নাভিয়ের–স্টোকস সমস্যার সমাধানে তারা বিপুল সংখ্যক ‘এআই এজেন্ট’, অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কর্মসূচিকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে নিয়োগ করেছিল। সংস্থার গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলি এক দল থেকে অন্য দলে পৌঁছে দিয়েছেন।

ওপেনএআইয়ের গবেষক ড্যান রবার্টস বলেছেন, “আমাদের ভূমিকাটা ছিল অনেকটা ভ্রমরের মতো। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভাবনার পরাগায়ন ঘটানো এবং নানা তথ্যের টুকরো পৌঁছে দেওয়া।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থা অগ্রগণ্য গণিতবিদদের আগের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলিকেও কাজে লাগাতে পারে। অথবা স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের গবেষণারই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। ওপেনএআইয়ের ঘোষণার আগের রাতে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ট্রিস্টান বাকমাস্টার সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, তিনি আর এক গণিতবিদের সঙ্গে একই ধরনের গবেষণা করছিলেন। ওই গণিতবিদ কাজ করেন ওপেনএআইয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রপিকে।

মঙ্গলবার একটি ব্লগ পোস্টে ওপেনএআই স্বীকার করেছে, অন্য গণিতবিদেরা একই ধরনের গবেষণা করছেন শুনেই তারা নাভিয়ের–স্টোকস সমস্যার পিছনে নিজেদের সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে। তবে সংস্থাটির বক্তব্য, “কোনও উপায়েই আমরা তাঁদের কাজের কোনও অংশ দেখিনি।”

ওপেনএআইয়ের মতো সংস্থাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে ব্যবহার করে ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’। বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ব্যবস্থাগুলি নানা দক্ষতা শেখে। প্রায় দু’বছর আগে থেকে সংস্থাগুলি এই ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে ‘রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং’ নামে আর একটি পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় বারবার চেষ্টা, ভুল এবং সংশোধনের মধ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন আচরণ আয়ত্ত করতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাজার হাজার অঙ্কের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে করতে তারা শিখতে পারে, কোন পদ্ধতি সঠিক উত্তরে পৌঁছে দেয়, আর কোনটি দেয় না। ওপেনএআইয়ের মতো গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা জটিল প্রতিক্রিয়াব্যবস্থা তৈরি করেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বুঝিয়ে দেয় কখন তার কাজ সঠিক হয়েছে, আর কখন ভুল হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত সংবাদবিষয়ক বিষয়বস্তুর কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। সংস্থা দু’টি মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সৃজনশীল লেখালেখি, দর্শন ও নীতিবিদ্যার মতো ক্ষেত্রে রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং নিখুঁত করে তোলা কঠিন। কারণ, সেখানে কোন উত্তর ঠিক এবং কোনটি ভুল, তা বস্তুনিষ্ঠভাবে নির্ধারণ করা সহজ নয়। কিন্তু গণিতের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অত্যন্ত উপযোগী।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘লিন’ নামে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণ করতে শিখতে পারে। ভাষাটি প্রথমে মানুষের গণিতচর্চার সহায়ক হিসেবে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজের কম্পিউটার কোড লেখার মতো দক্ষ হয়ে ওঠায়, তারাও লিন ব্যবহার করে নিজেদের গাণিতিক প্রমাণ তৈরি করতে পারছে।

জানুয়ারিতে ওপেনএআই এবং হারমনিক নামে আর একটি নবীন সংস্থা জানিয়েছিল, তাদের দু’টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে ‘এরদশ সমস্যা’র একটির সমাধান করেছে। বিংশ শতাব্দীর গণিতবিদ পল এরদশের উত্থাপিত কিছু দুরূহ অমীমাংসিত প্রশ্ন এই নামে পরিচিত।

কিছু গণিতবিদ অবশ্য বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি সমাধানটি আগে তার সাহায্য ছাড়াই করা কাজের থেকে খুব আলাদা নয়। টাও বলেছিলেন, “আমার কাছে ব্যাপারটা এমন এক অত্যন্ত চতুর ছাত্রের মতো মনে হয়, যে পরীক্ষার জন্য সব কিছু মুখস্থ করেছে, কিন্তু বিষয়টির গভীর উপলব্ধি নেই।”

কিন্তু মাস গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওপেনএআই এবং অন্য সংস্থাগুলির প্রযুক্তি আরও নানা সমস্যার সমাধান করতে থাকে। কখনও কখনও সেই সমাধান অনেক বেশি চমকপ্রদও হয়েছে।

ওপেনএআই জানিয়েছে, নাভিয়ের–স্টোকস সমস্যার সমাধানে একযোগে কাজ করেছে দশ হাজার পর্যন্ত এআই এজেন্ট। এত বিপুল সংখ্যক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থা চালাতে সম্ভবত কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। এর একটি কারণ, এই প্রযুক্তি চালানোর বিশেষ ধরনের চিপগুলি সচল রাখতে বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

ওপেনএআইয়ের গবেষক নোয়াম ব্রাউন একে “অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া” বলেছেন। তবে তাঁর সংযোজন, ওপেনএআইয়ের মতো সংস্থাগুলি প্রযুক্তির কার্যদক্ষতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালানোর খরচ সাধারণত কমতে থাকে।

মঙ্গলবার সংস্থাটি তাদের সমাধানের বিবরণ দিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে লিন ভাষায় লেখা প্রমাণও রয়েছে। ফলে বাইরের গণিতবিদেরা দেখতে পারবেন, কী ভাবে সংস্থার এআই এজেন্টগুলি সমস্যাটির সমাধান করেছে।

কিন্তু টাওয়ের মতে, মানুষ নিজের চেষ্টায় সমস্যাটির সমাধান করলে যে মূল্য পাওয়া যেত, এটি তার দুর্বল বিকল্প। তিনি ওপেনএআইয়ের সঙ্গে এমন এক পথপ্রদর্শকের তুলনা করেছেন, যিনি দুর্গম অরণ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটি জলপ্রপাতের পথ খুঁজে পান।

টাও বলেছেন, “এর কিছু মূল্য আছে। কিন্তু কেউ এক বার জলপ্রপাতে যাওয়ার একটি নির্দিষ্ট পথ দেখিয়ে দিলে মানুষ সেই পথ ধরেই যায়। অন্য পথ খোঁজার পিছনে তখন আর ততটা সময় দেয় না।”