ভারতের মাটিতে বসে সাংবাদিক বৈঠক করা কিংবা আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে—ঢাকার এই অভিযোগ উড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর কটাক্ষ, একটি সাংবাদিক বৈঠকের জোরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে তাঁকে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, দেশে ফিরে যেতে তিনি প্রস্তুত। এমনকি আওয়ামি লিগ চাইলে দলের সভাপতির পদ থেকেও সরে দাঁড়াবেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বা বিএনপি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে—এমন কোনও শর্ত মানতে তিনি রাজি নন।

একটি সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর দেশত্যাগ, ভারতে অবস্থান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়, আওয়ামি লিগের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। লিখিত উত্তরের পাশাপাশি দীর্ঘ টেলিফোন কথোপকথনেও তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। বাংলাদেশে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বীকার করেননি। বরং তাঁর দাবি, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য পূর্বপরিকল্পিত অভিযান চালানো হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকা ছাড়ার ঘটনা সম্পর্কে হাসিনার বক্তব্য, তিনি স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেননি। ক্রমশ অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে তাঁর নিরাপত্তারক্ষী, পরিবারের সদস্য এবং দলীয় নেতারা তাঁকে গণভবন ছাড়তে বাধ্য করেন। তাঁর দাবি, সেই দিন তাঁকে এবং তাঁর বোন শেখ রেহানাকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল। তিনি টুঙ্গিপাড়ায় যেতে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগও পাননি।

হাসিনার কথায়, হেলিকপ্টারে ওঠার পরেই তিনি জানতে পারেন তাঁকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকেরাই নিয়েছিলেন। অতি অল্প সময়ের নোটিসে ভারত তাঁকে আশ্রয় এবং নিরাপত্তা দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ। তবে নিজের দেশ থেকে এভাবে বেরিয়ে আসতে হওয়াটা মানসিকভাবে মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ছিল।

বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য কোনও দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছেন—এমন খবরও অস্বীকার করেছেন হাসিনা। আমেরিকা, ব্রিটেন কিংবা উপসাগরীয় কোনও দেশে যাওয়ার প্রস্তাব তাঁর ছিল না বলেই দাবি। তাঁর যুক্তি, ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের একেবারে পাশে। ফলে এখান থেকে দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব। অতীতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-সহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পরেও তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পথে বাধা এসেছিল। ২০০৭ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিলেন। এবারও তিনি ফিরবেন বলে জানিয়েছেন।

কবে, কোন পথে কিংবা কোন সীমান্ত দিয়ে ফিরবেন, সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য এড়িয়ে গিয়েছেন হাসিনা। শুধু বলেছেন, সময় হলে সব জানাবেন। তাঁর কটাক্ষ, বাংলাদেশের সরকার একদিকে ভারতকে তাঁকে ফেরত পাঠাতে বলছে, অন্যদিকে তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার কথা বললেই আপত্তি তুলছে।

ভারতে অবস্থানকালে হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কিংবা কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেননি। দুই নেতার সঙ্গেই তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজে থেকে সাক্ষাতের চেষ্টা করেননি। হাসিনা জানিয়েছেন, আপাতত আত্মীয়স্বজন এবং আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন।

গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে হাসিনার সাংবাদিক বৈঠকের পর বাংলাদেশের সরকার অভিযোগ করেছিল, তাঁর বক্তব্য ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট করেছে। এই অভিযোগকে কার্যত বিদ্রুপ করে হাসিনা বলেন, “একটি সাংবাদিক বৈঠক কীভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে? আমি জানতাম না, আমি এত শক্তিশালী যে আমার একটি সাংবাদিক বৈঠক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে দিতে পারে।”

এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা তথা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লন্ডনবাসের উদাহরণ দিয়েছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, ২০০৭ সালে রাজনীতি থেকে দূরে থাকার মুচলেকা দেওয়ার পরেও তারেক লন্ডন থেকে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন, অনলাইনে বক্তৃতা করেছেন এবং সাংবাদিক বৈঠক করেছেন। অথচ হাসিনার সরকার কখনও ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাঁকে চুপ করিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়নি। তাঁর দাবি, বিদেশে আশ্রিত কোনও রাজনৈতিক নেতার মতপ্রকাশ বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের উপর চাপ সৃষ্টি করা গণতান্ত্রিক আচরণ নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান শাসনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন হাসিনা। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দেশে বহু সংবাদমাধ্যমের দফতর ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে; সাংবাদিক নিহত ও কারাবন্দি হয়েছেন এবং কয়েকশো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলির স্বাধীন যাচাই সাক্ষাৎকারে হাজির করা হয়নি। তবে হাসিনার বক্তব্য, তাঁর সাংবাদিক বৈঠক নয়, বরং সত্য এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে ভয় পাওয়াই বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা।

আওয়ামি লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বিরোধীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং নারী ও শিশুসহ সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তিনি। জামায়াতে ইসলামির উপর তাঁর সরকারের নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে এখনও সঠিক বলে মনে করেন হাসিনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা এবং যুদ্ধাপরাধে জামায়াত নেতাদের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।

আওয়ামি লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার বিনিময়ে তিনি দলের সভাপতির পদ ছাড়বেন কি না—এই প্রশ্নে হাসিনা জানান, দল চাইলে তিনি সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। কিন্তু দলীয় নেতৃত্ব কে দেবেন, তা আওয়ামি লিগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেই স্থির হবে। সরকার বা বিএনপি সেই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ১৯৮১ সালে ভারতে নির্বাসিত থাকার সময়েও দলীয় কাউন্সিলই তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করেছিল বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর জন্য ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাইতেও অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর যুক্তি, মাঠে কাজ করা পুলিশ প্রতিটি পদক্ষেপের আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নেয় না। হামলা, থানা পোড়ানো এবং পুলিশ হত্যার পরিস্থিতিতে বাহিনী তাদের নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিল। তাঁর তরফে গুলি চালানোর কোনও ব্যক্তিগত নির্দেশ ছিল না বলে দাবি করেছেন হাসিনা। বরং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীরা ব্যাপক হত্যা, গ্রেফতার, নির্যাতন এবং ঘরবাড়ি ভাঙচুরের শিকার হয়েছেন বলে তাঁর অভিযোগ।

আন্দোলনকারী তরুণদের ‘রাজাকার’ বলে দূরে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও সরাসরি মানেননি হাসিনা। তিনি বলেছেন, “আমার মানুষ” বলতে বিশেষ প্রসঙ্গে তিনি নির্যাতিত দলীয় কর্মীদের বোঝালেও বাংলাদেশের সব নাগরিকই তাঁর আপন। তবে ২০২৪ সালের আন্দোলনকে নিছক কোটা সংস্কারের স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন বলে মানতে নারাজ তিনি। হাসিনার দাবি, সরকার উৎখাতই আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এবং আপসের কোনও সুযোগ রাখা হয়নি।

ভারতে সাম্প্রতিক যুব আন্দোলন নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়; ভারতের মানুষ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই তার মোকাবিলা করবে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে তাঁর সুর দ্ব্যর্থহীন—রাজনৈতিক ও আইনি বিপদ সত্ত্বেও তিনি দেশে ফিরবেন। সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে তাই একদিকে যেমন নিজের শাসনকালের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার স্পষ্ট বার্তাও দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী।