চার মাসেই অস্বস্তির মেঘ: নামবদল-রংবদল বিতর্কে দূরত্ব তৈরি করছে বিজেপি

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গে বিপুল রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্ষমতায় এসেছিল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার।
- নতুন সরকারের বয়স এখনও চার মাস পূর্ণ হয়েছে মাত্র।
- অথচ এর মধ্যেই প্রশাসনিক সাফল্যের হিসাবকে পিছনে ফেলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে একের পর এক বিতর্ক।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গে বিপুল রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্ষমতায় এসেছিল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। নতুন সরকারের বয়স এখনও চার মাস পূর্ণ হয়েছে মাত্র। অথচ এর মধ্যেই প্রশাসনিক সাফল্যের হিসাবকে পিছনে ফেলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে একের পর এক বিতর্ক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলের প্রস্তাব, সংবাদপত্রের দফতরের দেওয়ালে গেরুয়া রং লাগানো—সব মিলিয়ে বিরোধীদের আক্রমণের পাশাপাশি এখন উদ্বেগ শোনা যাচ্ছে বিজেপি ও সংঘ পরিবারের অন্দরেও।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিতর্কগুলির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দূরত্ব তৈরি করতে হচ্ছে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বকে। দল যেন বোঝাতে চাইছে, সরকার পরিচালনার ঘোষিত লক্ষ্য উন্নয়ন ও সুশাসন; প্রতিষ্ঠানগুলির নাম বা ভবনের রং বদলানো নয়। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনটিই প্রমাণ করছে, দলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি সমান্তরাল রাজনৈতিক সংস্কৃতি দ্রুত মাথা তুলছে।
সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং বাম ছাত্রসংগঠনগুলির সংঘর্ষের পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। দেওয়াললিখন মুছে দেওয়া, তার জায়গায় ফের রাজনৈতিক স্লোগান লেখা এবং ‘ফ্রি প্যালেস্তাইন’-এর পাল্টা ‘ফ্রি পাক-অধিকৃত কাশ্মীর’ লেখার অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। এর মধ্যেই যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম বদলে শ্রীঅরবিন্দের নামে রাখার প্রস্তাব দেন। শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহাসিক সম্পর্ককেই তিনি যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
কিন্তু বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দ্রুত জানিয়ে দেন, নামবদলের প্রস্তাব দলের কর্মসূচির অংশ নয়। বিধায়ক যা বলেছেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত মত। নতুন সরকার যখন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনকে প্রধান পরিচয় হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তখন নামবদলের রাজনীতি সেই প্রচারকে আড়াল করে দিচ্ছে—দলের অস্বস্তির কারণ সম্ভবত সেখানেই।
তার মধ্যেই কলকাতার একটি প্রথম সারির সংবাদপত্রের দফতরের সামনে বিক্ষোভ এবং ভবনের একাংশে গেরুয়া রং লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নতুন বিতর্ক তৈরি করে। সংবাদপত্রটির একটি শিরোনাম নিয়ে আপত্তি থেকেই ওই বিক্ষোভ হয়েছিল বলে অভিযোগ। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং শাসকদলের সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা—দুই নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
এ ক্ষেত্রেও শমীক দল ও সরকারকে সরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, কোনও নির্দিষ্ট জায়গার রং বদলানোর জন্য নয়। যারা সংবাদপত্রের দফতরে এমন কাজ করেছে, তারা বিজেপির কর্মী নয় এবং ঘটনার সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। রাজ্য সভাপতির এই স্পষ্ট অস্বীকৃতির পরও অবশ্য রাজনৈতিক প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে—দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ ভয় দেখায় বা গায়ের জোরে মত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে?
এই প্রশ্নই আরও তীব্রভাবে তুলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত বাংলা সাপ্তাহিক ‘স্বস্তিকা’। সাম্প্রতিক সংখ্যায় পত্রিকাটি সরাসরি বিজেপিতে ‘দুষ্কৃতীদের প্রবেশ’ নিয়ে সতর্ক করেছে। তাদের বক্তব্য, বিজেপির সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ কোনও বিরোধী দল নয়; আসল পরীক্ষা মানুষের প্রত্যাশার মুখোমুখি হওয়া। পনেরো বছরের তৃণমূল শাসনকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষ যদি বিজেপিকে ক্ষমতায় এনে থাকে, তবে সেই পুরনো শাসনসংস্কৃতিরই প্রতিলিপি নতুন সরকারের আমলে দেখতে চাইবে না।
সাপ্তাহিকটির সতর্কবার্তা আরও কঠোর। সামান্য অংশের ভোটারের মধ্যেও যদি ধারণা তৈরি হয় যে বর্তমান বিজেপি আসলে তৃণমূল জমানার দুষ্কৃতিনির্ভর রাজনীতির নতুন সংস্করণ, তা হলে জনসমর্থনের বড় অংশ দ্রুত সরে যেতে পারে। বাংলার ইতিহাসে একবার ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তির ফিরে আসা কঠিন—এই অভিজ্ঞতার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির এক প্রবীণ নেতার ব্যাখ্যায়, ক্ষমতায় আসার পরে দল দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বহু নতুন মানুষ যোগ দিচ্ছেন, যাঁদের বিজেপি বা সঙ্ঘের সাংগঠনিক সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। তাঁদের একাংশ মনে করছেন, তৃণমূলের আমলে যে পদ্ধতিতে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হত, বিজেপির শাসনেও সেই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যাবে। কেউ আবার দেওয়াল গেরুয়া করে বা চড়া মন্তব্য করে নেতৃত্বের নজরে পড়তে চাইছেন। সমস্যাটি তাই শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার নয়; ক্ষমতার সঙ্গে সংগঠনের চরিত্র বদলে যাওয়ার আশঙ্কাও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবেই সুযোগ ছাড়ছে না। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর অভিযোগ, বিজেপিতে কেউ প্রকাশ্য মুখ, কেউ মুখোশ—রাজ্য সভাপতির নির্দেশও অনেকে মানছেন না। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের কটাক্ষ, নতুন শাসনে এখন নামবদল, রংবদল, পুলিশ দিয়ে ভয় দেখানো এবং দলবদলই প্রধান কাজ।
চার মাসের মাথায় শুভেন্দু সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী পরীক্ষা। একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রশাসন, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের ফল দেখাতে হবে; অন্যদিকে ঠেকাতে হবে ক্ষমতার টানে আসা সুযোগসন্ধানী এবং বাহুবলী সংস্কৃতিকে। রাজনৈতিক পালাবদলকে প্রকৃত পরিবর্তনে রূপ দিতে না পারলে নতুন পতাকার নীচে পুরনো অভ্যাসই ফিরে আসবে। সঙ্ঘের সতর্কবার্তার মূল সুরও সেটিই—মানুষ সরকার বদলেছেন, শুধু শাসকের রং বদলানোর জন্য নয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



