দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাসের কাছে সত্য নিকেতনে ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত একটি পাঁচতলা বাড়ি ভেঙে দুই ছাত্রের মৃত্যুর পর ফের আলোচনার কেন্দ্রে রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ ছাত্র-আবাসনকেন্দ্রটি। রিং রোডের পাশে অবস্থান, দক্ষিণ ক্যাম্পাস মেট্রো স্টেশনে সরাসরি যাতায়াতের সুবিধা এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কলেজের নৈকট্য—সব মিলিয়ে শহরের বাইরে থেকে আসা পড়ুয়াদের কাছে সত্য নিকেতন দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা এবং সুলভ ছাত্রাবাসের সংখ্যার মধ্যে যে বিপুল ব্যবধান রয়েছে, তার অনেকটাই পূরণ করে আসছিল এই এলাকা।

দক্ষিণ ক্যাম্পাসের আশপাশে রয়েছে শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর কলেজ, জেসাস অ্যান্ড মেরি কলেজ, মৈত্রী কলেজ, এআরএসডি কলেজ, রামলাল আনন্দ কলেজ, মতিলাল নেহরু কলেজ এবং আর্যভট্ট কলেজ। এই সাতটি কলেজের মধ্যে মাত্র দু’টির নিজস্ব ছাত্রাবাস রয়েছে। শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর কলেজে ছাত্রাবাসের আসনসংখ্যা প্রায় ১৭৫। মৈত্রী কলেজে সেই সংখ্যা মাত্র ২৭। ফলে বিপুলসংখ্যক পড়ুয়াকে আশপাশের বেসরকারি পেয়িং গেস্ট বা পিজি আবাসনের উপর নির্ভর করতে হয়।

একসময় সত্য নিকেতন ছিল মূলত আবাসিক এলাকা। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেখানকার অধিকাংশ পুরনো বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তাঁদের বাড়ির জায়গায় গড়ে উঠেছে দেশলাইয়ের বাক্সের মতো ছোট ছোট ফ্ল্যাট, যার অনেকগুলিই পরে পিজি আবাসনে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু এই আবাসনগুলির সব ক’টি পুর-নিয়ম মেনে চলে না। বাড়ি ভেঙে পড়ার পর পুর কর্তৃপক্ষ এলাকায় অভিযান চালিয়ে একের পর এক পিজির সাইনবোর্ড খুলে দিয়েছে।

এলাকার পরিকাঠামো জীর্ণ হলেও ভাড়ায় কোনও ছাড় নেই। তিন বেলা খাবার-সহ একটি ঘর ভাগাভাগি করে থাকার জন্য পড়ুয়াদের মাসে প্রায় ১৩ হাজার টাকা দিতে হয়। সত্য নিকেতনের সরু গলিগুলির দু’পাশে এখন সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাফে, খাবারের দোকান, শরীরচর্চাকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্র। তুলনায় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও কলেজে পড়াশোনার বার্ষিক খরচ—কলেজ ও পাঠক্রম অনুসারে—প্রায় ১৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ, অনেক পড়ুয়ার ক্ষেত্রে কলেজের এক বছরের খরচের চেয়েও পিজিতে কয়েক মাস থাকার ব্যয় বেশি।

পঁচিশ বছর আগে ছবিটা ছিল অন্য রকম

সত্য নিকেতনেই বড় হয়েছেন সানি গুপ্ত। তাঁর কথায়, বছর পঁচিশ আগে গোটা এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটি পিজি এবং সামান্য কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল।

তিনি বলেন, “এটি তখন মূলত আবাসিক এলাকা ছিল। কাছাকাছি এতগুলি কলেজ থাকা এবং কলেজগুলিতে পর্যাপ্ত ছাত্রাবাস না থাকায় ধীরে ধীরে বসতবাড়িগুলি পিজিতে বদলে যেতে শুরু করে। তার সঙ্গে গড়ে ওঠে কাফে এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এখন পুরনো বাসিন্দাদের মধ্যে মাত্র কয়েকটি পরিবার এলাকায় রয়ে গিয়েছে।”

বহুতল বিপর্যয়ের ঘটনা নতুন করে দেখিয়ে দিয়েছে, ছাত্রদের আবাসন-সংকটের চাপে সত্য নিকেতনের চরিত্র কত দ্রুত এবং কতটা অপরিকল্পিতভাবে বদলে গিয়েছে। প্রবল চাহিদার সুযোগ নিয়ে বহু পিজি-মালিক ছোট ছোট ঘরে ঠাসাঠাসি করে পড়ুয়াদের রাখেন। কোনও কোনও ঘরে আলো-বাতাস ঢোকারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।

শহরের বাইরে থেকে পড়তে আসা গীতিকা ঝা বলেন, “পিজি-মালিকদের মনোভাব হল—থাকতে হলে থাকুন, না হলে চলে যান। তাঁরা জানেন, চাহিদা বিপুল। তাই ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে দেন। কারণ কোনও শয্যাই খালি পড়ে থাকবে না। কোনও কোনও ঘরে দু’টি বিছানার মধ্যে কয়েক ইঞ্চির বেশি ব্যবধান থাকে না।”

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, যে পাঁচতলা বাড়িটি ভেঙে পড়েছে, সেখানে আরও বেশি পড়ুয়াকে রাখার ব্যবস্থা করতে ভূগর্ভস্থ অংশে নির্মাণকাজ চলছিল। সেই কাজের সঙ্গে বিপর্যয়ের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ভেঙে পড়া বাড়িটির কাছেই একটি পিজিতে দু’বছর ছিলেন প্রাচী গোয়েল। তিনি বলেন, “প্রতি বছর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নতুন পড়ুয়ারা কলেজের কাছাকাছি থাকার জায়গা খুঁজতে আসেন। শহরটি তাঁদের কাছে অপরিচিত। যাতায়াতের সুবিধার কারণে সত্য নিকেতন তাঁদের সহজেই আকর্ষণ করে। তবে শহরটি কিছুটা চিনে নেওয়ার পরে এবং কলেজে যাতায়াতের সময় হিসাব করে অধিকাংশ ছাত্রী দ্বিতীয় বর্ষে অন্যত্র চলে যান।”

সত্য নিকেতনের বিপজ্জনক বাড়ি, অস্বাস্থ্যকর ঘর কিংবা মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া—কোনওটিই নতুন সমস্যা নয়। কিন্তু সুলভ ও নিরাপদ ছাত্রাবাসের বিকল্প না থাকায় প্রতি বছর নতুন পড়ুয়ারা একই ফাঁদে পা দেন। পাঁচতলা বাড়িটির ধ্বংসস্তূপ তাই শুধু একটি নির্মাণের ব্যর্থতার চিহ্ন নয়; দিল্লির উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার আড়ালে বেড়ে ওঠা গভীর আবাসন-সংকটেরও নির্মম স্মারক।