International

নেপালে মার্কিন ‘ত্রাণ’ কতটুকু?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য আমেরিকার প্রাথমিক পাঁচ লক্ষ ডলারের জরুরি সাহায্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
  • আন্তর্জাতিক ত্রাণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের অভিযোগ, এত বড় বিপর্যয়ের তুলনায় এই অর্থ কার্যত নামমাত্র।
  • তাঁদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডিকে ভেঙে দেওয়ার পর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমেরিকার একসময়ের শক্তিশালী পরিকাঠামো এখন অনেকটাই দুর্বল।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য আমেরিকার প্রাথমিক পাঁচ লক্ষ ডলারের জরুরি সাহায্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের অভিযোগ, এত বড় বিপর্যয়ের তুলনায় এই অর্থ কার্যত নামমাত্র। তাঁদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএআইডিকে ভেঙে দেওয়ার পর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমেরিকার একসময়ের শক্তিশালী পরিকাঠামো এখন অনেকটাই দুর্বল।

গত সপ্তাহের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বতে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এখনও প্রায় ৪,৪০০ জন নিখোঁজ। কাদা ও ধসে চাপা পড়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলিতে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে চলছে তল্লাশি।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রথমে নেপালের জন্য পাঁচ লক্ষ ডলারের জরুরি সাহায্য ঘোষণা করে। অঙ্কটি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় সমালোচনা। সমাজমাধ্যমে অনেকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন খাতে বিপুল ব্যয়ের সঙ্গে নেপালের জন্য বরাদ্দ অর্থের তুলনা টেনে প্রশ্ন তোলেন, এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ে আমেরিকার সাহায্য এত কম কেন?

সমালোচনার মুখে পরে সাহায্যের পরিমাণ বাড়িয়ে ৩৬ লক্ষ ডলার করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই অর্থ দিয়ে দুর্গত ১০ হাজার পরিবারের কাছে তিন মাস পর্যন্ত খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি কম্বল, মশারি এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চাদরও সরবরাহ করা হবে।

তবে মানবিক সহায়তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়তি অর্থও বিপর্যয়ের ব্যাপ্তির তুলনায় যথেষ্ট নয়। তাঁদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ইউএসএআইডি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সংস্থাটিকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিলুপ্ত করার পর বিদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আমেরিকার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে তাঁদের দাবি। ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত ‘সরকারি দক্ষতা দপ্তর’-এর উদ্যোগে সংস্থাটিকে কার্যত ভেঙে দেওয়া হয়। পরে ইউএসএআইডির কিছু দায়িত্ব মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য এই সমালোচনা মানছে না। তাদের দাবি, আমেরিকা এখনও নেপালের বন্যা-পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে সহায়তা করছে। পাঁচ লক্ষ ডলারের প্রাথমিক বরাদ্দটিও ছিল দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব হাতে আসার আগেই যাতে সাহায্যের কাজ শুরু করা যায়, সেই কারণেই প্রথমে ওই অর্থ ঘোষণা করা হয়েছিল বলে দপ্তরের বক্তব্য। ইউএসএআইডি বিলুপ্ত হওয়ার কারণে আমেরিকার প্রতিক্রিয়ায় কোনও বিলম্ব হয়নি বলেও দাবি করেছে তারা।

কিন্তু ইউএসএআইডির বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান মার্ক ওয়ার্ড এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। ত্রাণকাজে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ তাঁকে ‘মিস্টার ডিজাস্টার’ নামে ডাকতেন।

ওয়ার্ডের কথায়, “এই ঘোষণা আমেরিকার পক্ষে লজ্জাজনক এবং নেপালের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা।” তাঁর মতে, ইউএসএআইডি সক্রিয় থাকলে বিপর্যয়ের পরপরই বিশেষজ্ঞদের একটি দল নেপালে পৌঁছে যেত। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মিলে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজনের হিসাব করা হতো। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ঠিক করা হতো কত অর্থ ও কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন।

ওয়ার্ড বলেন, “আমি নিশ্চিত, ঘোষিত অঙ্কটির চেয়ে সেই সাহায্যের পরিমাণ অনেক বেশি হতো।”

একই সুর ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো এবং মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিদেশবিষয়ক কমিটির প্রাক্তন কর্মী জর্জ ইনগ্রামের কথাতেও। তাঁর মন্তব্য, “আমেরিকার হয়ে আমি লজ্জিত। এই অঙ্ক ঘোষণা না করাই সম্ভবত ভালো হতো।”

ইনগ্রামের মতে, মোট কত অর্থ দেওয়া উচিত, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ে শুরুতেই মাত্র পাঁচ লক্ষ ডলার ঘোষণা করাটা অত্যন্ত কম। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজনের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমেরিকার উচিত ছিল অপেক্ষা করা এবং তারপর সাহায্যের পরিমাণ নির্ধারণ করা।

বন্যার খবর প্রকাশ্যে আসার পর হোয়াইট হাউসের বিদায়ী প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছিলেন, নেপালে মার্কিন দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, আমেরিকা সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে প্রথম অগ্রাধিকার সব সময়ই মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা। তাই যত বেশি সম্ভব আমেরিকানকে উদ্ধারের দিকেই তাঁদের মনোযোগ ছিল।

নেপালের সঙ্গে ইউএসএআইডির পুরনো সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন ওয়ার্ড। ভূপ্রকৃতির কারণে দেশটিতে ভূমিকম্প, বন্যা ও ভূমিধস প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ফলে পরবর্তী দুর্যোগের প্রস্তুতি এবং মোকাবিলায় নেপালি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন মার্কিন বিশেষজ্ঞেরা।

ওয়ার্ড বলেন, “বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে নেপালের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অন্য কোনও দেশের সঙ্গে ছিল না।” তাঁর দাবি, ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার পর সেই বিশেষজ্ঞদের কাঠামোটিই আর নেই।

এখন নেপালের উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে প্রতিবেশী ভারত ও চিন। ওয়ার্ডের মতে, এতে শুধু মানবিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও আমেরিকার ক্ষতি হতে পারে।

তাঁর প্রশ্ন, “চিন ও ভারতের হাতে নেতৃত্ব চলে যাওয়া কি সত্যিই আমেরিকার স্বার্থে? পৃথিবী স্থিতিশীল থাকলে আমেরিকাও বেশি নিরাপদ থাকে।”

ওয়ার্ডের যুক্তি, বিশ্বের কোথাও বড় বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমেরিকার উপরেও পড়তে পারে। অস্থিরতা বাড়লে শরণার্থী সঙ্কট তৈরি হয়, মানুষ সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে একসময় মার্কিন সেনাকেও মোতায়েন করতে হতে পারে। সেই তুলনায় বিপর্যয়ের শুরুতেই মানবিক সহায়তা পাঠানো অনেক কম খরচের এবং বেশি কার্যকর।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অবশ্য দাবি করেছে, নেপালে তাদের প্রতিক্রিয়া “দ্রুত, নমনীয় এবং বাস্তব পরিস্থিতিনির্ভর”। কোনও পূর্বনির্ধারিত অর্থের অঙ্কের মধ্যে সাহায্যকে আটকে রাখা হয়নি বলেও তাদের বক্তব্য।

দপ্তরের এক মুখপাত্রের দাবি, এই প্রয়োজনভিত্তিক ব্যবস্থার ফলে বিপর্যয়ের পূর্ণ চিত্র হাতে আসার আগেই জরুরি সাহায্য পাঠানো সম্ভব হয়েছে। পরিস্থিতির মূল্যায়ন এখনও চলছে এবং প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতে আমেরিকার সাহায্যের পরিমাণও বাড়তে পারে।

তবে ইউএসএআইডি ভেঙে দেওয়ার পর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক দুর্যোগগুলির একটিতে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা সহজে থামছে না। নেপালের বন্যা তাই শুধু মানবিক বিপর্যয়ের চিত্রই সামনে আনেনি—প্রশ্ন তুলেছে, বিশ্বের অন্যতম বড় ত্রাণদাতা হিসেবে আমেরিকার পুরনো ভূমিকা কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles