International

উবরের ‘বস’ অ্যালগরিদম, আতঙ্কে চালকেরা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • কাজ কে পাবেন, কত টাকায় পাবেন—সবই যেন ঠিক করে দিচ্ছে এক ‘প্রাণহীন বস’।
  • উবরের চালকদের অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত সংস্থার অ্যালগরিদম তাঁদের কাজ ও পারিশ্রমিক নিয়ন্ত্রণ করছে।
  • সেই ‘ব্ল্যাক বক্স’ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চালকেরা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

কাজ কে পাবেন, কত টাকায় পাবেন—সবই যেন ঠিক করে দিচ্ছে এক ‘প্রাণহীন বস’। উবরের চালকদের অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত সংস্থার অ্যালগরিদম তাঁদের কাজ ও পারিশ্রমিক নিয়ন্ত্রণ করছে। সেই ‘ব্ল্যাক বক্স’ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চালকেরা। মামলার আর্থিক অঙ্ক কয়েকশো কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

মামলাকারীদের অভিযোগ, উবরের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালকদের বিপুল ব্যক্তিগত ও আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ করে কাজ বণ্টন এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণ করছে। এর ফলে তথ্য সুরক্ষা আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে, পাশাপাশি কৌশলে কম পারিশ্রমিকে কাজ করানো হচ্ছে চালকদের। উবরের ইউরোপীয় সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে হওয়ায় আমস্টারডামের জেলা আদালতে দায়ের হয়েছে মামলাটি। ইউরোপীয় ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের দাবি, একসঙ্গে এত চালকের এমন আইনি পদক্ষেপ এই প্রথম।

মামলার কেন্দ্রে রয়েছে উবরের অস্বচ্ছ ‘ব্ল্যাক বক্স’ অ্যালগরিদম। অভিযোগ, চালকদের সম্পর্কে সংগৃহীত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি যাত্রার জন্য ব্যক্তিভেদে পারিশ্রমিক ঠিক করে এই ব্যবস্থা। চালকদের আশঙ্কা, কে সর্বনিম্ন কত টাকায় কাজ করতে রাজি, অ্যালগরিদম সেই তথ্য ‘শিখে’ নেয়। তারপর সেই সীমার কাছাকাছি পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

চালকদের অভিজ্ঞতাতেও মিলছে এমন অভিযোগের প্রতিফলন। একই যাত্রার জন্য দু’জন চালককে ভিন্ন পারিশ্রমিকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। আবার কোনও চালক দূরের গন্তব্যে যাত্রী পৌঁছে দেওয়ার পর তাঁর ফিরতি যাত্রার ভাড়াও কমে যেতে পারে। কারণ, অ্যালগরিদম ধরে নেয়, খালি গাড়ি নিয়ে ফেরার চেয়ে কম পারিশ্রমিকেও সেই যাত্রা নেওয়া চালকের কাছে আকর্ষণীয় হবে।

রটারডামের ৪১ বছর বয়সি উবরচালক মহম্মদ শিরওয়ার কথায়, ‘‘মনে হয় কেউ সব সময় আপনাকে দেখছে এবং আপনার দুর্বলতাগুলি জেনে নিচ্ছে। এখানে মালিকই হল অ্যালগরিদম।’’ তাঁর দাবি, ব্যবস্থা ক্রমাগত বুঝে নিচ্ছে একজন চালক কত কম টাকায় কাজ করতে রাজি। ফলে প্রস্তাবিত পারিশ্রমিক কমতে থাকলেও জীবিকার তাগিদে চালককে সেই কাজ নিতে হয়।

উত্তর লন্ডনের টটেনহামের চালক কোলা ওবার অভিজ্ঞতাও একই প্রশ্ন তুলেছে। এক সহকর্মীর সঙ্গে বিরতি নেওয়ার সময় একই যাত্রার প্রস্তাব পান দু’জন। সহকর্মীকে দেওয়া হয় ২৭ পাউন্ড, অথচ ওবাকে দেওয়া হয় ২৩ পাউন্ড। তাঁদের সন্দেহ, এর আগে ওবা কয়েকটি কম পারিশ্রমিকের যাত্রা গ্রহণ করেছিলেন বলেই অ্যালগরিদম ধরে নিয়েছিল, তিনিও কম টাকায় কাজটি নেবেন।

উবর অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানেনি। সংস্থার দাবি, পারিশ্রমিকের এমন পার্থক্যের পিছনে চালকের আচরণ নয়, অবস্থান, চাহিদার মাত্রা, উৎসাহভাতা কিংবা পরীক্ষামূলক মূল্যব্যবস্থার মতো একাধিক কারণ থাকতে পারে।

তবু ওবার কাছে বিষয়টি উদ্বেগের। তাঁর কথায়, ‘‘আমার সব তথ্য তাদের কাছে রয়েছে এবং তারা সেই তথ্য আমার স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।’’ তাঁর অভিযোগ, অ্যালগরিদমই কার্যত ঠিক করে দিচ্ছে তিনি কত আয় করবেন, কতক্ষণ কাজ করবেন, পরিবারকে কতটা সময় দিতে পারবেন কিংবা কখন বিশ্রাম নেবেন।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বৃহত্তর প্রশ্ন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল এখন শুধু ব্যবসায়িক বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ নেই; কর্মীদের আচরণ ও তথ্য বিশ্লেষণ করে কে কোন কাজ পাবেন, কত পারিশ্রমিক পাবেন—সেই সিদ্ধান্তেও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ মানুষের মাথার উপর তৈরি হচ্ছে এক নতুন ধরনের ‘কৃত্রিম ম্যানেজার’।

এই বিতর্কের মধ্যেই গত মাসে নেদারল্যান্ডসের তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ উবরকে ৮২ কোটি ৫০ লক্ষ ইউরো জরিমানা করে। অভিযোগ ছিল, যথেষ্ট নোটিস না দিয়েই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে চালকদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। উবর জানিয়েছে, তারা সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করবে।

এর পাশাপাশি চালকহীন গাড়ির দিকেও এগোচ্ছে সংস্থাটি। লন্ডন থেকে জাগরেব পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন শহরে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে উবরের। প্রাথমিক পর্যায়ে অবশ্য গাড়িতে মানুষের তত্ত্বাবধান থাকবে।

চালকদের হয়ে মামলাটির নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘ওয়ার্কার ইনফো এক্সচেঞ্জ’। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা জেমস ফারার এর আগে ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্টে উবরচালকদের শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছিলেন।

বর্তমান মামলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের প্রায় ২ লক্ষ ৪১ হাজার চালকের স্বার্থ জড়িত। অভিযোগ, উবর বেআইনি ভাবে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চালকদের আচরণগত প্রোফাইল তৈরি করে কাজ ও পারিশ্রমিক নির্ধারণ করছে। এমনকি চালকদের তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল প্রশিক্ষণেও বেআইনি ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি মামলাকারীদের।

ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি এই ধরনের ব্যবস্থা বন্ধ করার নির্দেশও চাওয়া হয়েছে। মামলাকারীদের যুক্তি, উবরের এই পদ্ধতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ তথ্য সুরক্ষা বিধি বা জিডিপিআর লঙ্ঘন করছে।

তাঁদের আরও দাবি, ২০২৩ সালে ব্রিটেনে গতিশীল পারিশ্রমিক ব্যবস্থা চালুর পর চালকদের বার্ষিক আয় প্রায় পাঁচ হাজার পাউন্ড কমেছে। চলতি বছর নেদারল্যান্ডসেও একই ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

উবরের প্রধান নির্বাহী দারা খোসরোশাহি অবশ্য ২০২৩ সালেই বলেছিলেন, চালকদের পছন্দ ও আচরণগত প্রবণতা বুঝে তাঁদের কাছে নির্দিষ্ট ধরনের যাত্রা পাঠানোর ব্যবস্থা আরও উন্নত করা সম্ভব। তবে সেই বক্তব্যের অর্থ চালকদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের পারিশ্রমিক কমানো নয় বলে সংস্থার দাবি।

উবর সমস্ত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। সংস্থার বক্তব্য, কোনও চালকের ব্যক্তিগত আচরণের ভিত্তিতে যাত্রার পারিশ্রমিক পরিবর্তন করা হয় না। অতীতে তিনি কতগুলি যাত্রা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেই তথ্যও ব্যক্তিগত ভাড়া নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় না।

সংস্থার দাবি, যাত্রাপথ, সময় এবং গন্তব্যের মতো তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতেই ভাড়া নির্ধারিত হয়। যাত্রা গ্রহণের আগেই চালকেরা গন্তব্য ও সম্ভাব্য আয় দেখতে পান। উবরের যুক্তি, গতিশীল মূল্যব্যবস্থা বরং কম আকর্ষণীয় যাত্রার ক্ষেত্রে বেশি পারিশ্রমিক দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে, ফলে চালকদের মোট আয়ের সম্ভাবনাও বাড়ে।

তবে ২০২৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি সমীক্ষায় ভিন্ন ছবি উঠে এসেছিল। গবেষণায় দাবি করা হয়, গতিশীল অ্যালগরিদম চালুর পরে চালকদের আয় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। উবর সেই গবেষণাকে অসম্পূর্ণ এবং বাছাই করা তথ্যের উপর নির্ভরশীল বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

জেমস ফারারের অভিযোগ, ‘‘উবরের অ্যালগরিদম বহু বছর ধরেই চালকদের আয় সংকুচিত করেছে। তার চেয়েও আপত্তিকর হল, প্রযুক্তির সাহায্যে গোপনে চালকদের আচরণ পর্যবেক্ষণ ও প্রভাবিত করা।’’

মামলার নেতৃত্বে থাকা ডাচ আইনজীবী আন্তন একারের বক্তব্যও একই দিকে। তাঁর মতে, মানুষের জীবিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এমন কোনও কম্পিউটার ব্যবস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না, যার কাজের পদ্ধতিই স্বচ্ছ নয়। প্রশ্নটা তাই শুধু উবরের চালকদের পারিশ্রমিকের নয়—প্রশ্ন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে শেষ কথা বলবে মানুষ, নাকি অ্যালগরিদম?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles