হাইলাইটস:
- স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়লেন গুগল ও অ্যালফাবেটের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই।
- ভাষণ শুরু হতেই শতাধিক ছাত্রছাত্রী আসন ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং “ফ্রি প্যালেস্টাইন” স্লোগান তোলেন।
- বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল ইজরায়েল সরকারের সঙ্গে গুগলের ‘প্রজেক্ট নিম্বাস’ চুক্তি।
- প্রায় ২০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান, যার মধ্যে ছিলেন ৩,৬০০ স্নাতক।
- বিতর্ক এড়িয়ে পিচাই তাঁর বক্তৃতায় আশাবাদ, অধ্যবসায় ও জীবনের সিদ্ধান্তের গুরুত্বের উপর জোর দেন।
বাংলাস্ফিয়ার: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন সাধারণত ছাত্রছাত্রীদের জীবনের এক স্মরণীয় উৎসব। কিন্তু ২০২৬ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠানটি স্মরণীয় হয়ে রইল অন্য এক কারণে। গুগল ও অ্যালফাবেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্ট্যানফোর্ডের প্রাক্তন ছাত্র সুন্দর পিচাই যখন মঞ্চে উঠে বক্তব্য শুরু করেন, তখনই একদল ছাত্রছাত্রী প্রতিবাদস্বরূপ অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান।
রবিবার স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫তম সমাবর্তনে প্রায় ২০ হাজার অতিথি, পরিবার-পরিজন ও শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ৩,৬০০ জন ডিগ্রি গ্রহণকারী ছাত্রছাত্রী ছিলেন। অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন পিচাই, যিনি ১৯৯৫ সালে স্ট্যানফোর্ড থেকে উপাদান বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।
কিন্তু তাঁর বক্তৃতা শুরু হওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। শতাধিক ছাত্রছাত্রী আসন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করেন। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনি পতাকা, কেউ কেউ কেফিয়েহ পরে এসেছিলেন। বিক্ষোভকারীরা “ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন” স্লোগান দিতে থাকেন।
এই প্রতিবাদের পেছনে রয়েছে ‘প্রজেক্ট নিম্বাস’ নামে পরিচিত একটি বিতর্কিত চুক্তি। ২০২১ সালে গুগল এবং অ্যামাজন ইসরায়েল সরকারের সঙ্গে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিষেবা প্রদানের চুক্তি করে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রযুক্তি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে নজরদারি ও সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহার হতে পারে। যদিও গুগল বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
স্ট্যানফোর্ডের ‘স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন’ এবং ‘নো টেক ফর অ্যাপারথাইড’ নামে দুটি সংগঠন আগেই এই ওয়াকআউটের ডাক দিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, এই প্রতিবাদ সুন্দর পিচাইকে ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য করে নয়; বরং প্রযুক্তি সংস্থাগুলির নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলাই এর উদ্দেশ্য।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গত কয়েক বছরে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ছাত্র আন্দোলন ক্রমশ জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতিবাদ, অবস্থান বিক্ষোভ এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। স্ট্যানফোর্ডও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে সমাবর্তনের মতো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানেও সেই রাজনৈতিক আবহ প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি জগতের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কথা বললে অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্রদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই সম্ভবত পিচাই তাঁর বক্তৃতায় এআই প্রসঙ্গ প্রায় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান।
বরং তিনি নিজের জীবন থেকে নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ভারতের চেন্নাই থেকে স্ট্যানফোর্ডে পড়তে আসার দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জীবনে সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এগিয়ে চলার সাহসটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি স্নাতকদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের পছন্দ এবং সিদ্ধান্তই তোমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে।”
পিচাইয়ের বক্তৃতার মূল বার্তা ছিল ‘আশাবাদকে বেছে নেওয়া’। দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতার মধ্যে হতাশ না হয়ে নতুন সুযোগ খোঁজার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, বিশ্বের সামনে যত বড় চ্যালেঞ্জই থাকুক না কেন, আগামী প্রজন্মের হাতে রয়েছে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা।
তবে সমাবর্তনের আলোচনায় শেষ পর্যন্ত পিচাইয়ের বক্তৃতার চেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে ছাত্রদের প্রতিবাদ। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুষ্ঠানের ঘটনা নয়; বরং প্রযুক্তি সংস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কর্পোরেট নৈতিকতার প্রশ্নে নতুন প্রজন্মের অবস্থানকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
স্ট্যানফোর্ডের সমাবর্তন তাই এ বছর কেবল ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠান ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল এমন এক মঞ্চ, যেখানে প্রযুক্তি ও রাজনীতির জটিল সম্পর্ক নিয়ে তরুণ প্রজন্ম তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল। আর সেই মঞ্চের কেন্দ্রে ছিলেন ভারতের সন্তান, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি নেতা সুন্দর পিচাই।