শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার ‘অপরাধে’ পশ্চিমবঙ্গের এক তরুণীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক রাখার সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিল ইলাহাবাদ হাই কোর্ট। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের স্নাতক, ২৫ বছরের আকৃতি চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওই কঠোর আইন প্রয়োগকে ‘খেয়ালখুশিমতো’ এবং ‘অস্পষ্ট’ বলে বর্ণনা করেছে আদালত। বেআইনি আটকের জন্য তাঁকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি অতুল শ্রীধরন এবং বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ আকৃতির দায়ের করা বন্দি-প্রত্যক্ষীকরণ আবেদনের শুনানি শেষে এই নির্দেশ দেয়। আদালত জানিয়েছে, অন্য কোনও মামলায় তাঁকে হেফাজতে রাখার প্রয়োজন না থাকলে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। তবে নয়ডার শ্রমিক-বিক্ষোভ ঘিরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় এখনও জামিন না পাওয়ায় জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আটকাদেশ খারিজ হলেও তাঁর এখনই কারামুক্তি হচ্ছে না।

পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের বাসিন্দা আকৃতিকে গত ১১ এপ্রিল নয়ডার বোটানিক্যাল গার্ডেন মেট্রো স্টেশন থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ। প্রথমে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় তাঁকে আটক করার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। পরে ১৩ মে উত্তরপ্রদেশ সরকার তাঁর এবং সাংবাদিক সত্যম বর্মার বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করে। সেই থেকে গৌতম বুদ্ধ নগরের কাসনা জেলে বন্দি রয়েছেন আকৃতি। প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা সেই প্রতিরোধমূলক আটকের বৈধতাই হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।

এপ্রিল মাসে নয়ডার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকেরা উন্নত মজুরি ও কাজের পরিবেশের দাবিতে বিক্ষোভে নেমেছিলেন। এক পর্যায়ে বিক্ষোভ হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। পাথর ছোড়া, অগ্নিসংযোগ এবং যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। পুলিশ মোট ১৫টি মামলা দায়ের করে, কয়েকশো মানুষকে অভিযুক্ত করে এবং অন্তত ৬০ জনকে গ্রেফতার করে। আকৃতির বিরুদ্ধে ১১টি মামলায় নাম রয়েছে। অভিযোগগুলির মধ্যে খুনের চেষ্টা, গুরুতর আঘাত করার অভিপ্রায়, মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন করা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রও রয়েছে।

পুলিশের দাবি ছিল, আকৃতি এবং সত্যম ‘মজদুর বিগুল দস্তা’র সক্রিয় সদস্য। তাঁরা এমন একটি বিশেষ মতাদর্শে বিশ্বাসী, যেখানে হিংসার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়। দিল্লির করাবল নগরে এক সহ-অভিযুক্তের পরিচালিত পাঠাগারে বসে কথিত হিংসাত্মক আন্দোলনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও সরকারের দাবি। আকৃতির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ‘গ্রেট মার্টায়ার্স অব দ্য ইন্ডিয়ান রেভোলিউশন’ নামে একটি বইকেও ‘বিতর্কিত সাহিত্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল প্রশাসন। আকৃতির আইনজীবীরা অবশ্য জানান, ঘটনাটি ছিল দরিদ্র শ্রমিকদের শিশুদের জন্য একটি পাঠাগারের উদ্বোধন—হিংসার ষড়যন্ত্র নয়।

শুনানিতে রাজ্য সরকারের প্রমাণ নিয়েই একাধিক প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। আকৃতি কোথায় শ্রমিকদের পাথর ছুড়তে বা গাড়িতে আগুন দিতে বলেছিলেন, তার নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিন বা দৃশ্যগত প্রমাণ দেখাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকার কয়েক জন সাক্ষীর বয়ানের উল্লেখ করলেও আদালত জানতে চায়, বিক্ষোভের ধারণচিত্রে আকৃতিকে সত্যিই উস্কানি দিতে দেখা যাচ্ছে কি না। অভিযোগপত্র পেশ হয়ে যাওয়ার পরেও কোন সাক্ষী কোথায় তাঁর নাম করেছেন, তা স্পষ্ট করে দেখাতে না পারায় অসন্তোষ প্রকাশ করে বেঞ্চ।

প্রমাণ পেশের জন্য সরকার আরও সময় চাইলে বিচারপতি শ্রীধরন তা দিতে অস্বীকার করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, অভিযুক্ত তরুণী ইতিমধ্যেই প্রায় পাঁচ মাস কারাগারে কাটিয়েছেন। আদালতের প্রশ্ন ছিল, এত দীর্ঘ সময় আটক রাখার পরেও প্রশাসন কেন অবিলম্বে তার দাবির সমর্থনে নথি ও ধারণচিত্র দেখাতে পারছে না।

আকৃতির পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কলিন গনসালভেস, চার্লি প্রকাশ এবং মানিক গুপ্ত সওয়াল করেন। তাঁদের বক্তব্য, আটকাদেশের অভিযোগগুলি ছিল সামগ্রিক, সাধারণ এবং প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট তথ্যবিহীন। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, পাঁচ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছ থেকে আদায়ের ইঙ্গিতও দিয়েছে আদালত—জেলাশাসক থেকে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক পর্যন্ত যাঁরা আটক অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের দায় নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে লিখিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দেশের এই অংশের বিস্তারিত স্পষ্ট নয়। রাজ্যের আইনজীবী আটকাদেশ খারিজ হওয়ার কথা স্বীকার করলেও ক্ষতিপূরণ নিয়ে মন্তব্য করেননি।

আকৃতি ইতিমধ্যে পাঁচটি মামলায় জামিন পেয়েছেন। বাকি ছ’টি মামলায় তাঁর জামিনের আবেদন হাই কোর্টে শুনানির অপেক্ষায়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের শৃঙ্খল কাটলেও সাধারণ ফৌজদারি মামলার কারণে তিনি আপাতত কাসনা জেলেই থাকবেন।

আকৃতির বাবা অরুণ চৌধুরী বলেন, তাঁর মেয়ে কোনও অন্যায় করতে পারেন না—এই বিশ্বাস তাঁর বরাবরই ছিল। দরিদ্র মানুষের অধিকারের জন্য আকৃতি লড়েছেন এবং ভবিষ্যতেও লড়বেন বলে তিনি জানান। হাই কোর্টের নির্দেশটি একই সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এবং কোনও বিক্ষোভে অংশগ্রহণকে জাতীয় নিরাপত্তার বিপদ হিসেবে দেখানোর আগে প্রশাসনের প্রমাণ পেশের দায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া এক কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে রইল।