মস্তিষ্কে এআই, বাঁচল দৃষ্টি

যা জানা জরুরি
- সেই দৃশ্য তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিহ্নিত করে দিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু ও রক্তনালির অবস্থান—টিউমার বাদ দিতে গিয়ে যেগুলির সামান্য ক্ষতিও বড় বিপদ…
- লন্ডনে এমনই এক অস্ত্রোপচারে সফল ভাবে মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করা হল ৪৮ বছরের রিস হিবার্টের।
- হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চলমান অস্ত্রোপচারের দৃশ্য সরাসরি বিশ্লেষণকারী এআইয়ের সহায়তায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে তিনিই বিশ্বের প্রথম রোগী।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার চলছে। সামনে পর্দায় ভেসে উঠছে শরীরের ভিতরের ছবি। সেই দৃশ্য তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিহ্নিত করে দিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু ও রক্তনালির অবস্থান—টিউমার বাদ দিতে গিয়ে যেগুলির সামান্য ক্ষতিও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। লন্ডনে এমনই এক অস্ত্রোপচারে সফল ভাবে মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করা হল ৪৮ বছরের রিস হিবার্টের। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চলমান অস্ত্রোপচারের দৃশ্য সরাসরি বিশ্লেষণকারী এআইয়ের সহায়তায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে তিনিই বিশ্বের প্রথম রোগী। তাঁর দৃষ্টিশক্তিও রক্ষা পেয়েছে।
অস্ত্রোপচারটি হয় ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হসপিটালসের অধীন ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারিতে। চিকিৎসা-গবেষণার অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয়। হাসপাতালের ২৭ অগস্টের বিবৃতি অনুযায়ী, অস্ত্রোপচার না হলে হিবার্টের দৃষ্টিশক্তি আরও খারাপ হতে পারত, এমনকি অন্ধত্বও দেখা দিতে পারত।
অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন স্নায়ুশল্যচিকিৎসক অধ্যাপক হানি মার্কাস। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসক দানিয়াল খানও দলের অংশ ছিলেন।
বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা হিবার্ট পেশায় গ্রাহক পরিষেবা ব্যবস্থাপক এবং দুই সন্তানের বাবা। বিবিসিকে উদ্ধৃত করে ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ জানিয়েছে, এক দিন হাঁটতে বেরিয়ে আচমকাই রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। খিঁচুনিও হয়। পরে পরীক্ষায় পিটুইটারি গ্রন্থিতে ১১ মিলিমিটারের একটি টিউমার ধরা পড়ে। সেটি ক্যানসারজনিত ছিল না, কিন্তু অবস্থানের কারণে ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
শুরুতে অবশ্য তড়িঘড়ি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। পরে প্রবল ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং হাঁটার সময় বারবার হোঁচট খাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে দৃষ্টির পাশের অংশও সংকুচিত হতে থাকে।
এমন অবস্থায় নতুন প্রযুক্তির সহায়তায় অস্ত্রোপচারের গবেষণায় প্রথম রোগী হওয়ার প্রস্তাব পান হিবার্ট। সম্মতিও দেন। তাঁর যুক্তি ছিল সহজ—রোগীরা গবেষণায় অংশ না নিলে চিকিৎসকেরা শিখবেন কী ভাবে, আর চিকিৎসাবিজ্ঞানই বা এগোবে কী করে?
এত ঝুঁকি কেন?
পিটুইটারি গ্রন্থির চারপাশে জায়গা খুবই কম। অথচ এই অঞ্চলের কাছেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি এবং দৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত স্নায়ু। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় সামান্য ভুলও গুরুতর ক্ষতি করতে পারে।
নতুন এআই ব্যবস্থার কাজ ছিল অস্ত্রোপচারের সরাসরি দৃশ্য বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক গঠনগুলি চিহ্নিত করতে চিকিৎসকদের সাহায্য করা। অর্থাৎ কোথায় সতর্ক হতে হবে, কোন অংশ এড়িয়ে চলা জরুরি—সেই সিদ্ধান্তের জন্য চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত তথ্য পাচ্ছিলেন।
প্রযুক্তিটি তৈরি করেছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকেরা। আগের একাধিক অস্ত্রোপচারের চিহ্নিত ভিডিয়ো ব্যবহার করে ব্যবস্থাটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষণার প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে থাকা সোফিয়া বানোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সূক্ষ্ম শারীরিক গঠন, অস্ত্রোপচারের যন্ত্র এবং যন্ত্রের সঙ্গে কলার সম্পর্ক শনাক্ত করতেই এই প্রযুক্তি তৈরি।
গবেষণায় অর্থ দিয়েছে ব্রিটেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ এবং গুগল।
এআই সার্জন নয়, সহকারী
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—এআই নিজে অস্ত্রোপচার করেনি। অস্ত্রোপচারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল চিকিৎসকদের হাতেই।
মার্কাসের ব্যাখ্যায়, প্রযুক্তিটি অনেকটা অভিজ্ঞ সহকারীর অতিরিক্ত নজরের মতো কাজ করেছে। অর্থাৎ চিকিৎসকের দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাৎক্ষণিক ভাবে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা। তাই ঘটনাটিকে ‘এআই দিয়ে মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার’ বলা হলেও, যন্ত্র স্বাধীন ভাবে রোগীর শরীরে অস্ত্রোপচার করেছে—এমনটা নয়।
ফিরছে দৃষ্টি, ফিরছে স্বাভাবিক জীবন
অস্ত্রোপচারের পরে হিবার্ট তাঁর দৃষ্টির পাশের অংশে দ্রুত উন্নতি টের পান বলে বিবিসিকে উদ্ধৃত করা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরবর্তী আট সপ্তাহে ধীরে ধীরে শক্তিও ফিরে আসে এবং আগের উপসর্গগুলি কমে যায়।
এলবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারটি হয়েছিল মে মাসে। হাসপাতাল আগে গবেষণার কাজে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করলেও রোগীর অস্ত্রোপচারে এই প্রয়োগ ছিল প্রথম। হিবার্ট ইতিমধ্যেই কাজে ফিরেছেন। গ্রাহক পরিষেবার চাকরির পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত তিনি।
তবে এই একটি সাফল্য থেকেই প্রযুক্তিটিকে প্রমাণিত চিকিৎসা-পদ্ধতি বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। একজন রোগীর ক্ষেত্রে সফল ফল পাওয়া গেলেও একই ধরনের সব অস্ত্রোপচারে এআই সমান কার্যকর হবে কি না, কিংবা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় জটিলতা সত্যিই কমবে কি না—তা বলার জন্য আরও রোগীর তথ্য, তুলনামূলক গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
একই ভাবে, ‘বিশ্বের প্রথম’ দাবিটিও নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুনত্ব হল—মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার চলাকালীন সরাসরি দৃশ্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসককে এআইয়ের সাহায্য দেওয়া। চিকিৎসাক্ষেত্রে এআইয়ের সমস্ত ধরনের ব্যবহার মিলিয়ে এটিই প্রথম ঘটনা—এমন দাবি নয়।
হিবার্টের ঘটনা তাই একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক এবং পরীক্ষামূলক। সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তকে অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে সাহায্য করার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। এখন বড় প্রশ্ন, নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় সেই সম্ভাবনা কতটা নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হয় এবং নিরাপত্তা বজায় রেখে কত বেশি রোগীর কাছে এই প্রযুক্তি পৌঁছতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



