খবর

উৎপাদনে ঘাটতি, ন’বছরের সর্বনিম্নে মজুত—উৎসবের আগেই চিনির দামে তেতো স্বাদ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • নিজস্ব সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: দশেরা ও দীপাবলির এখনও দেরি।
  • কিন্তু উৎসবের মরসুম শুরু হওয়ার আগেই চিনির দাম সাধারণ মানুষের মুখে তেতো স্বাদ এনে দিয়েছে।
  • গত এক মাসে দেশের বহু বাজারে খুচরো চিনির দাম কিলোগ্রাম-পিছু প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

নিজস্ব সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি: দশেরা ও দীপাবলির এখনও দেরি। কিন্তু উৎসবের মরসুম শুরু হওয়ার আগেই চিনির দাম সাধারণ মানুষের মুখে তেতো স্বাদ এনে দিয়েছে। গত এক মাসে দেশের বহু বাজারে খুচরো চিনির দাম কিলোগ্রাম-পিছু প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে। উৎপাদন পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক কমে যাওয়া, ন’বছরের সর্বনিম্ন স্তরে মজুত নেমে আসা, উৎসবের আগাম চাহিদা এবং একাংশের মজুতদারিকে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ক্রেতা বিষয়ক দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দেশে চিনির সর্বাধিক প্রচলিত খুচরো দাম ছিল কিলোগ্রাম-পিছু ৬৫ টাকা। অথচ ২১ জুলাই তা ছিল ৪৫ টাকা। জুলাইয়ের শেষে দাম বেড়ে ৫০ টাকায় পৌঁছয়। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে কিলোগ্রাম-পিছু ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি হিসাবে অবশ্য সারা দেশের গড় খুচরো দাম ২০ জুলাইয়ের ৪৮ টাকা ১৮ পয়সা থেকে ২০ আগস্ট ৫৫ টাকা ৭০ পয়সায় উঠেছে। বাজারভেদে দামের ফারাক থাকলেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সর্বত্রই স্পষ্ট।

কলাপুরের মতো প্রধান পাইকারি বাজারে অগস্টের গোড়া থেকে চিনির দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে কুইন্টাল-পিছু ৫,৩৫০ টাকায় পৌঁছেছে। চিনিকলগুলি যে দামে কর বাদ দিয়ে চিনি বিক্রি করে, সেই কারখানা-ছাড় মূল্যও কিলোগ্রাম-পিছু ৫৭ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ফলে পরিবহণ, কর এবং ব্যবসায়ীদের লাভ যোগ হওয়ার পরে খুচরো বাজারে দাম আরও বাড়ছে।

সঙ্কটের মূলে রয়েছে প্রত্যাশার তুলনায় কম উৎপাদন। চলতি ২০২৫-২৬ চিনি মরসুমে আখ উৎপাদক রাজ্যগুলি প্রথমে ৩৪৩ লক্ষ টন চিনি উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছিল। কেন্দ্র এখন জানিয়েছে, প্রকৃত উৎপাদন প্রায় ৩০৬ লক্ষ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে—প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় ৩৭ লক্ষ টন বা প্রায় ১১ শতাংশ কম। অতিবৃষ্টি ও জল জমে থাকা ছাড়াও আখে ‘রেড রট’ এবং ‘টপ বোরার’ রোগের প্রকোপ ফলন ও চিনি উদ্ধারের হার কমিয়েছে। মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক রাজ্যে পরিস্থিতির প্রভাব বেশি পড়েছে।

জাতীয় সমবায় চিনি কল মহাসঙ্ঘের আগের হিসাবে, চলতি মরসুম শেষে দেশে চিনির মজুত প্রায় ৪১ লক্ষ টনে নেমে আসতে পারে। ২০১৬-১৭ মরসুমে মজুত ছিল ৩৯ লক্ষ ৪০ হাজার টন। ফলে বর্তমান মজুত গত ন’বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৮০ থেকে ২৯০ লক্ষ টন। কাগজে-কলমে অক্টোবরের নতুন আখ মাড়াই শুরু হওয়া পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর মতো চিনি থাকলেও বাজারে সরবরাহের ঘাটতি এবং মজুত নিয়ে উদ্বেগই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চিনির মূল্যবৃদ্ধির জন্য আখ থেকে জ্বালানি ইথানল উৎপাদনকে দায়ী করার অভিযোগ অবশ্য কেন্দ্র খারিজ করেছে। সরকারের বক্তব্য, ২০২২-২৩ মরসুমে উৎপাদিত চিনির প্রায় ১২ শতাংশ ইথানলের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। চলতি মরসুমে সেই হার কমে প্রায় ৯ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট ইথানল উৎপাদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ভুট্টা-সহ খাদ্যশস্য থেকে আসছে। তাই ইথানলের জন্য আখ বা চিনি সরিয়ে নেওয়াই বাজারে বর্তমান ঘাটতির প্রধান কারণ নয়।

কেন্দ্রের মতে, কম উৎপাদনের সঙ্গে উৎসবের আগাম চাহিদা, বিশ্ববাজারে সরবরাহের সঙ্কোচন, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ব্যবসায়ীদের একাংশের ফাটকা কারবার ও মজুতদারি মিলেই দাম বাড়িয়েছে। ২০২৬-২৭ সালে বিশ্ববাজারে চিনির ঘাটতি প্রায় ৩৩ লক্ষ টন হতে পারে বলেও সরকারি হিসাবে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

দাম নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ব্যবসায়ীদের চিনি মজুত রাখার সময়সীমা ৩০ দিনে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এবার মাসে ১০ টনের বেশি চিনি ব্যবহারকারী মিষ্টি, কোমল পানীয় ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংস্থার মতো বৃহৎ ক্রেতাদের সর্বাধিক ১৫ দিনের প্রয়োজনের সমপরিমাণ মজুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিনিকলগুলির গুদামে থাকা মজুত যাচাইয়ের ব্যবস্থাও শুরু হচ্ছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে কেন্দ্র ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শুল্ক ছাড়াই ১০ লক্ষ টন কাঁচা চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারতকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি আমদানি করতে হচ্ছে। সাধারণত আমদানির উপরে ১০০ শতাংশ শুল্ক থাকে। বন্দর-সংলগ্ন শোধনাগারগুলি আমদানি করা কাঁচা চিনি পরিশোধন করে দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারবে। তবে ব্রাজিল থেকে মূল আমদানি অক্টোবরের আগে এসে পৌঁছনোর সম্ভাবনা কম। ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সামনে গণেশ চতুর্থী, দশেরা ও দীপাবলি। এই সময়ে মিষ্টি, চকোলেট, পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরিতে চিনির চাহিদা স্বাভাবিক ভাবেই বাড়ে। তাই আমদানি দ্রুত বাজারে না পৌঁছলে এবং মজুতদারি বন্ধ না হলে উৎসবের আগে সাধারণ পরিবারকে আরও চড়া দামেই চিনি কিনতে হতে পারে। কেন্দ্র সরবরাহ যথেষ্ট বলে আশ্বাস দিলেও বাজারের হিসাব আপাতত তেমন মিষ্টি নয়।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles