খবর থেকে সিংহাসনে!

যা জানা জরুরি
- সাংবাদিকের রাজ্যাভিষেক, পাশে উত্তরাধিকার-বিতর্ক—প্রয়াত রাজার শিশুপুত্রের দাবি ঘিরে বিভক্ত তোরোর রাজপরিবার টেলিভিশনের পর্দায় এত দিন অন্যের খবর শোনাতেন তিনি।
- উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী তোরো রাজ্যের ত্রয়োদশ রাজা হিসেবে মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর অভিষেক হল ৫৬ বছরের সাংবাদিক এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমার।
- রাজনাম নিয়েছেন এডওয়ার্ড রুকিডি নিয়াবঙ্গো প্রথম।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সাংবাদিকের রাজ্যাভিষেক, পাশে উত্তরাধিকার-বিতর্ক—প্রয়াত রাজার শিশুপুত্রের দাবি ঘিরে বিভক্ত তোরোর রাজপরিবার
টেলিভিশনের পর্দায় এত দিন অন্যের খবর শোনাতেন তিনি। এ বার নিজেই খবরের শিরোনাম। উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী তোরো রাজ্যের ত্রয়োদশ রাজা হিসেবে মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর অভিষেক হল ৫৬ বছরের সাংবাদিক এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমার। রাজনাম নিয়েছেন এডওয়ার্ড রুকিডি নিয়াবঙ্গো প্রথম। তবে রাজকীয় আচার-অনুষ্ঠানের জৌলুসের আড়ালেই রয়ে গেল উত্তরাধিকার নিয়ে রাজপরিবারের টানাপড়েন। প্রয়াত রাজার এক শিশুপুত্রের দাবিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে সেই বিতর্ক।
কিজানাঙ্গোমা উগান্ডার রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার সংস্থা ইউগান্ডা ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনে সংবাদপাঠক এবং সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি প্রয়াত রাজা ওয়ো নিম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি চতুর্থের আত্মীয়। ওয়ো গত অগস্টে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান।
১৯৯৫ সালে বাবার মৃত্যুর পর মাত্র তিন বছর বয়সে তোরোর সিংহাসনে বসেছিলেন ওয়ো। সেই শিশুরাজাকে বড় হতে দেখেছে তোরোর বহু মানুষ। তাঁর অকালমৃত্যুর পর স্বাভাবিক ভাবেই সামনে আসে উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রশ্ন। আর সেখানেই শুরু হয় রাজপরিবারের অন্দরের টানাপড়েন।
কার উত্তরাধিকার?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রয়াত রাজার মা বেস্ট কেমিগিসা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়েরা। তাঁদের দাবি, ওয়ো একটি শিশুপুত্র রেখে গিয়েছেন এবং নিজের উইলে তাকেই উত্তরাধিকারী করে গিয়েছেন। তোরোর প্রথা অনুযায়ী, স্বীকৃত পুত্রেরই সিংহাসনে বসার কথা।
কিন্তু সেই শিশুকে এখনও জনসমক্ষে আনা হয়নি। নতুন রাজা বেছে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা বাবিতো রাজগোষ্ঠীর ২১ সদস্যের কমিটিও তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে শুধু শিশুটির অস্তিত্ব নয়, তাঁর পরিচয় এবং উত্তরাধিকার পাওয়ার বৈধতা—দু’টিই এখন প্রশ্নের মুখে।
রাজমাতা কেমিগিসার বক্তব্য, প্রয়াত রাজার শেষ ইচ্ছাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, শিশুটি আমেরিকার টেক্সাসে রয়েছে। উত্তরাধিকার নিয়ে তৈরি উত্তেজনা ও বিভাজনের কারণে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
অন্য দিকে, নির্বাচন কমিটির বক্তব্য, তোরোর প্রচলিত রীতিনীতি মেনেই কিজানাঙ্গোমাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের তথ্যমন্ত্রীর দাবি, কথিত পুত্রকে কোথাও হাজির করা হয়নি। ফলে একই রাজগোষ্ঠীর অন্য একটি বংশশাখার হাতে গিয়েছে মুকুট।
উইলেও কি মেটাবে বিতর্ক?
স্পেনের সংবাদপত্র এল পাইস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবারের তরফে পেশ করা উইলের সংশ্লিষ্ট অংশটি ২০২২ সালের। সেখানে মৃত্যুর সময় জীবিত এবং জৈবিক পুত্র হিসেবে বৈধ ভাবে স্বীকৃত সন্তানকে উত্তরাধিকারী করার শর্তের উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, উইলে ওই শর্তের উল্লেখ থাকলেই শিশুটির পরিচয় বা তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতির প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছে না। সরকারের সমর্থন পেয়েছে নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্ত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর কিজানাঙ্গোমাকে রাজা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। কমিটির ১৯ জন সদস্য সেই সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করেন। ১২ সেপ্টেম্বর ফোর্ট পোর্টালের কারাম্বি রাজসমাধিতে সমাহিত করা হয় ওয়োকে।
প্রয়াত রাজার বোন রুথ কোমুনতালেও পরিবারের দাবির পক্ষে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই উত্তরাধিকার নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
রাজা হলেন, রাজনীতি নয়
অভিষেক ঘিরে অবশ্য উৎসবে কোনও খামতি ছিল না। তোরোর রাজধানী ফোর্ট পোর্টালে পালিত হয় ঐতিহ্যবাহী নানা আচার। মধ্যরাতের পর রাজপ্রাসাদের দিকে হাঁটেন নতুন রাজা। ছিল মুকুটের জন্য প্রতীকী যুদ্ধ, নাচ ও বাদ্যযন্ত্রের আয়োজনও। করুজিকা প্রাসাদকে ঘিরে উৎসবের মধ্যেই শুরু হল কিজানাঙ্গোমার নতুন অধ্যায়।
তবে এই রাজপদ উগান্ডার রাষ্ট্রক্ষমতার সমার্থক নয়। উগান্ডা একটি প্রজাতন্ত্র। তোরোর মতো ঐতিহ্যবাহী রাজ্যগুলির রাজাদের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। তাঁদের ভূমিকা মূলত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। তাই সম্প্রদায়ের আনুগত্য ও আস্থা এই নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
নতুন রাজা মানুষের জন্য প্রাসাদ উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি ঐক্য ও উন্নয়নে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। সাংবাদিকতার দীর্ঘ জীবনে তৈরি হওয়া যোগাযোগের অভিজ্ঞতাকেও মানুষের কাজে লাগানোর আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু মুকুট মাথায় উঠলেই যে বিতর্কের অবসান হয়, তোরোর রাজপরিবারের ক্ষেত্রে আপাতত তেমনটা বলা যাচ্ছে না। এক পক্ষ সামনে রাখছে প্রয়াত রাজার শেষ ইচ্ছাকে, অন্য পক্ষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজগোষ্ঠীর স্বীকৃতি ও প্রচলিত নির্বাচনপদ্ধতিকে।
তাই নতুন রাজার সামনে শুধু রাজপরিবারের ঐতিহ্য বহনের দায়িত্ব নয়, বিভক্ত পরিবারের আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও থাকছে। আর সেই চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে এখনও একই প্রশ্ন—প্রয়াত রাজার কথিত শিশুপুত্র আদৌ কে, এবং তোরোর সিংহাসনে তাঁর দাবির স্বীকৃতি মিলবে কি না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



