ফুরোচ্ছে ‘আমেরিকান স্বপ্ন’? ফিরছেন হ্যারি-মেগান

যা জানা জরুরি
- নিজস্ব সংবাদদাতা: ২০২০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে নাটকীয় ভাবে সরে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন সাসেক্সের ডিউক ও ডাচেস।
- রাজকীয় পরিচয়ের বাইরে নিজেদের আলাদা ব্র্যান্ড তৈরি করার স্বপ্নও ছিল স্পষ্ট।
- নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্রায় ১০ কোটি ডলারের চুক্তি, স্পটিফাইয়ের সঙ্গে প্রায় ২ কোটি ডলারের পডকাস্ট চুক্তি—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, হ্যারি ও মেগান এবার নিজেরাই হয়ে…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিজস্ব সংবাদদাতা: ২০২০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে নাটকীয় ভাবে সরে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন সাসেক্সের ডিউক ও ডাচেস। রাজকীয় পরিচয়ের বাইরে নিজেদের আলাদা ব্র্যান্ড তৈরি করার স্বপ্নও ছিল স্পষ্ট। নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্রায় ১০ কোটি ডলারের চুক্তি, স্পটিফাইয়ের সঙ্গে প্রায় ২ কোটি ডলারের পডকাস্ট চুক্তি—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল, হ্যারি ও মেগান এবার নিজেরাই হয়ে উঠবেন এক শক্তিশালী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান।
ছ’বছর পরে সেই ছবিটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। স্পটিফাইয়ের সঙ্গে চুক্তি শেষ, নেটফ্লিক্সের চুক্তিও আগের তুলনায় অনেক ছোট পরিসরে। একের পর এক প্রকল্প প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এর মধ্যেই ব্রিটেনে ফেরার টান আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তবে কি শেষের পথে হ্যারি-মেগানের ‘আমেরিকান স্বপ্ন’?
হ্যারির ব্রিটেনে ফেরার ইচ্ছা অবশ্য নতুন নয়। নিজের দেশকে তিনি এখনও ভালবাসেন বলে একাধিক বার জানিয়েছেন। গত বছর ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ব্রিটেনকে তিনি বরাবরই ভালবেসেছেন এবং দেশ থেকে দূরে থেকে নিজের পছন্দের কাজগুলি করা কঠিন। বাবা রাজা চার্লসের অসুস্থতার পর সেই টান আরও বেড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্য দিকে, আমেরিকার বিনোদন দুনিয়ায় তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজপরিবারের পরিচিতি থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো
২০২০ সালে নিজেদের প্রযোজনা সংস্থা আর্চওয়েলের মাধ্যমে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে বড় অঙ্কের চুক্তি করেন হ্যারি-মেগান। পরিকল্পনা ছিল কাহিনিনির্ভর অনুষ্ঠান, তথ্যচিত্র এবং সব বয়সের দর্শকের জন্য নানা ধরনের প্রযোজনা তৈরি করা। একই সময়ে স্পটিফাইয়ের সঙ্গে পডকাস্ট চুক্তিও তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় দেয়।
নেটফ্লিক্সের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২২ সালে। মুক্তি পায় তথ্যচিত্র সিরিজ ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’। রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ঘিরে তৈরি সিরিজটি বিপুল দর্শক টানে এবং নেটফ্লিক্সের অন্যতম সফল তথ্যচিত্র হয়ে ওঠে।
কিন্তু সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করা সহজ হয়নি।
এর পর ‘লাইভ টু লিড’, হ্যারির পোলো নিয়ে তথ্যচিত্র এবং মেগানের জীবনযাপনভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘উইথ লাভ, মেগান’-এর মতো প্রকল্প এলেও সেগুলি ‘হ্যারি অ্যান্ড মেগান’-এর মতো সাড়া ফেলতে পারেনি। ‘পোলো’ নেটফ্লিক্সের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলির প্রথম দশেও জায়গা করতে পারেনি। মেগানের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বমালার দর্শকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। শিশুদের জন্য পরিকল্পিত অ্যানিমেশন সিরিজ ‘পার্ল’ শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়।
মেগানের জীবনযাপনভিত্তিক সংস্থা ‘অ্যাজ এভার’-এর সঙ্গেও নেটফ্লিক্সের অংশীদারিত্ব মাত্র সাত মাসের মাথায় শেষ হয়। যদিও নেটফ্লিক্সের সঙ্গে হ্যারি-মেগানের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। নতুন চুক্তিটি অনেক ছোট—মূলত ‘ফার্স্ট লুক’ বা কোনও প্রকল্প অন্যদের দেখানোর আগে নেটফ্লিক্সকে দেখানোর অধিকারভিত্তিক।
পডকাস্টেও একই ছবি
স্পটিফাইয়ের সঙ্গে প্রায় ২ কোটি ডলারের চুক্তিও শেষ হয় ২০২৩ সালে। সেই চুক্তির আওতায় মেগানের ‘আর্কিটাইপস’ পডকাস্টের মাত্র ১২টি পর্ব তৈরি হয়েছিল। অতিথিদের তালিকায় ছিলেন সেরিনা উইলিয়ামস ও মারায়া কেরির মতো পরিচিত নাম।
এর পর ২০২৫ সালে লেমোনাডা মিডিয়ার সঙ্গে ‘কনফেশনস অব আ ফিমেল ফাউন্ডার’ নামে নতুন পডকাস্ট শুরু করেন মেগান। কিন্তু তৈরি হয় মাত্র ন’টি পর্ব। পরে তিনি জানান, দ্বিতীয় পর্বমালা হবে না—‘অ্যাজ এভার’-এর ব্যবসায় বেশি মন দিতে চান তিনি।
হ্যারি-মেগানের গণমাধ্যম অভিযান নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। স্পটিফাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরে সংস্থার কর্তা বিল সিমন্স প্রকাশ্যেই তাঁদের তীব্র কটাক্ষ করেছিলেন।
তবে শিল্পবিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিষয়টি শুধু হ্যারি-মেগানের সাফল্য বা ব্যর্থতার নয়। গোটা বিনোদন শিল্পই বদলে গিয়েছে।
তারকা হলেই এখন আর দর্শক মেলে না
সামাজিক গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ম্যাট নাভারার মতে, হ্যারি-মেগান যখন আমেরিকায় পা রেখেছিলেন, তখন তাঁদের হাতে ছিল বিপুল পরিচিতি এবং অসংখ্য সুযোগ। কিন্তু এখন দর্শকদের সামনে বিনোদনের বিকল্প এত বেশি যে কোনও তারকার নাম একাই দর্শক ধরে রাখতে পারে না।
তাঁর যুক্তি, খ্যাতি প্রথম বার দর্শককে টানতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয় বার ফিরিয়ে আনতে পারে শুধু অনুষ্ঠানের মান।
‘সৃষ্টিকর্তা অর্থনীতি’র বিশ্লেষক ইভান শাপিরোর মতে, পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে কারণ মেগানের প্রতিযোগী এখন শুধু অন্য অভিনেতা বা প্রযোজকেরা নন—স্মার্টফোন হাতে থাকা বিশ্বের প্রায় প্রত্যেক মানুষই কোনও না কোনও ভাবে সেই প্রতিযোগিতার অংশ।
হ্যারি-মেগানের অভিজ্ঞতা তাই নতুন গণমাধ্যমের একটি বড় পরিবর্তনকেই সামনে আনে: বিখ্যাত হওয়া আর নিয়মিত ভাল কনটেন্ট তৈরি করা এক জিনিস নয়।
এ বার কি অভিনয়ে ফিরছেন মেগান?
এই পরিস্থিতিতেই মেগানের পুরনো পেশায় ফেরার জল্পনা জোরালো হয়েছে। ‘স্যুটস’-এর পর অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানো মেগান সম্প্রতি ফের পর্দায় কাজ করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে খবর।
‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-এর প্রাক্তন সম্পাদক টিনা ব্রাউনও জানিয়েছেন, ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’-য় তারকা বিচারক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে অভিনয়ে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। তাঁর মতে, অন্যের তৈরি সফল অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুবিধা মেগান নতুন করে উপলব্ধি করেছেন।
শুক্রবার রাতে আরও জোরালো হয় সেই জল্পনা। ‘ভ্যারাইটি’-র খবর অনুযায়ী, গাই রিচির ‘দ্য জেন্টলমেন’ সিরিজের তৃতীয় পর্বমালায় মেগানের অভিনয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
ব্রিটেনে ফিরলে কি নতুন সুযোগ?
হ্যারি-মেগান ব্রিটেনে ফিরলেও তাঁদের প্রযোজনার কাজ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। আর্চওয়েল এখন তুলনামূলক ভাবে প্রচলিত প্রযোজনা সংস্থার মতো কাজ করছে। নেটফ্লিক্সের জন্য পোলোকে ঘিরে একটি নাটক এবং ‘মিট মি অ্যাট দ্য লেক’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ-সহ কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে বলে জানা যাচ্ছে।
আর ব্রিটেনে ফিরে গেলে প্রযোজনার ক্ষেত্রে তাঁদের বিশেষ অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ব্রিটেন এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনার কেন্দ্র। হলিউডের বাইরে থেকেও বড় আন্তর্জাতিক প্রযোজনা তৈরি করা এখন স্বাভাবিক ঘটনা।
হ্যারির ক্ষেত্রেও আপাতত মনোযোগ রয়েছে অন্য দিকে। তাঁর স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’-এর সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করা সহজ নয়। আপাতত আগামী বছর বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হতে চলা ইনভিক্টাস গেমসের প্রস্তুতিতেই তিনি বেশি মন দিচ্ছেন।
অন্য দিকে, মেগানের ব্যবসা ‘অ্যাজ এভার’ এগোলে ভবিষ্যতে ফের পডকাস্টেও ফিরতে পারেন তিনি।
তাই হ্যারি-মেগানের ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা এখনই বলা কঠিন। বরং তাঁদের সামনে হয়তো নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। রাজপরিবারের পরিচিতি তাঁদের দরজা খুলে দিতে পারে, কিন্তু সেই দরজার ওপারে টিকে থাকতে হলে এখনও তাঁদের নিজেদের যোগ্যতাতেই দর্শক জিততে হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



