Home খবর মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ভাঙল পাহাড়, ভাঙল ঘর: কাশ্মীরে জলবায়ুর নির্মম মুখ

মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ভাঙল পাহাড়, ভাঙল ঘর: কাশ্মীরে জলবায়ুর নির্মম মুখ

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
19 views 4 minutes read
A+A-
Reset

১৯ জুলাই ভোরের আগেই পির পাঞ্জাল পর্বতমালায় বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। ভারতের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম মুররার বাসিন্দা হাজি মহম্মদ লতিফ তখন বাড়ির বাইরে। মেয়ে তাঁকে বলেছিল, বৃষ্টি বাড়ছে—পরিবারের গাড়িটা যেন নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখেন।

“গাড়িটা সবে পার্ক করেছি,” ৪৮ বছরের লতিফের মনে পড়ে। “ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি পাহাড়ের দিক থেকে জল ধেয়ে আসছে।”

তারপর সবকিছু ঘটে কয়েক মিনিটের মধ্যে।

মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে কাদা, বিশাল পাথর আর উন্মত্ত জলের স্রোত। লতিফের নিজের হাতে গড়া বাড়িটি মুহূর্তেই ধসে পড়ে। সেই বাড়িতে গুজ্জর সম্প্রদায়ের তাঁর পরিবারের পাঁচ প্রজন্ম একসঙ্গে থাকত।

পরিবারের আট সদস্য তখন বাড়ির ভিতরে। লতিফ বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ভোর হতেই তাঁর বহু বছরের সঞ্চয়, ঘর এবং পরিবারের মানুষ—সবকিছুই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।

চারদিকে ধ্বংস, বিচ্ছিন্ন মুররা

ঘটনার চার দিন পর মুররায় পৌঁছে দেখা যায়, বিদ্যুৎ নেই, রাস্তা নেই, মোবাইল যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। বন্যার জলে ভেসে গেছে সড়ক এবং ঝুলন্ত সেতু।

গ্রামে পৌঁছনোর একমাত্র উপায়—ধস ও কাদায় ভরা পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটা।

স্থানীয় মানুষজন তখন মাথায় করে ময়দার বস্তা, রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার এবং ওষুধ নিয়ে ফিরছেন। পাহাড়ের ঢাল এতটাই অস্থির যে ভারী খননযন্ত্রও সেখানে পৌঁছতে পারেনি।

সেনাবাহিনী, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন। অন্য একটি দল সুরান নদীর উত্তাল স্রোতে নিখোঁজদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।

পুঞ্চ জেলার বাফলিয়াজ শহরের উপরে, শ্রীনগর থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে পির পাঞ্জালের কোলে মুররা। এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দাই গুজ্জর। হিমালয়ের অন্যতম বড় পশুপালক সম্প্রদায় হিসেবে তাঁদের জীবন বহুদিন ধরেই গবাদি পশু, কৃষিকাজ এবং মৌসুমি পরিযানের সঙ্গে জড়িয়ে।

কিন্তু প্রকৃতির বদলে যাওয়া ছন্দ সেই জীবনকেই এখন অনিশ্চিত করে তুলছে।

‘আমি শুধু ওদের খুঁজে পেতে চাই’

লতিফ এখন ভাই মহম্মদ বশিরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরের ভিতর মহিলাদের কান্না, পুরুষদের নীরবতা আর কোরআনের আয়াত পাঠের শব্দ—শোক যেন গোটা গ্রামকে গ্রাস করেছে।

মোবাইলে ১৬ বছরের ছেলে সাজ্জাদ আহমেদের ছবি দেখাতে দেখাতে লতিফ বলেন, “এই বাড়িটা আমি পরিবারের জন্যই বানিয়েছিলাম।”

ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছিল সাজ্জাদের। এখনও তার দেহ উদ্ধার হয়নি।

দুর্যোগের কয়েক দিন আগেই পরিবারের সবাই মিলে আনন্দের একটি ভিডিও করেছিলেন। সেই হাসিমুখের ছবিই এখন লতিফের কাছে ছেলের শেষ স্মৃতি।

শোকসভা চলার মধ্যেই খবর আসে—নদীর অনেকটা নীচে আরও একটি দেহ উদ্ধার হয়েছে।

ঘরজুড়ে হঠাৎ নেমে আসে নিস্তব্ধতা। গ্রামের বুক চিরে আবার এগিয়ে যায় একটি শেষযাত্রা।

চার দিন ধরে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নদীর ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ৪৫ বছরের মহম্মদ রাজাক। তাঁর কথায়, “নদীর প্রতিটি বাঁক আমরা খুঁজে দেখছি। এখনও আশা ছাড়িনি। ওদের খুঁজে পাবই।”

একের পর এক বিপর্যয়

চলতি মাসে জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে একের পর এক মেঘভাঙা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসে অন্তত ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির অন্যতম মুররা।

কিন্তু বিপর্যয়ের ছবি শুধু এই গ্রামেই আটকে নেই।

প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের রাজৌরিতে মনাওয়ার তাউই নদী উপচে পড়ে রাস্তা, অসংখ্য গাড়ি এবং শহরের প্রধান বেলা বাসস্ট্যান্ড ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলি ঢেকে যায় কাদা ও ধ্বংসাবশেষে। বহু বাড়ি ভেঙে পড়ে, ভেসে যায় গবাদি পশু। শত শত পরিবার হারায় নিজেদের ঘর।

আরও উত্তরে, নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে গুরেজ উপত্যকার বাসিন্দারাও বলছেন, আবহাওয়ার পুরনো ছন্দ আর নেই।

২০ জুলাই আচুরা গ্রামে মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ১১টি পরিবারের ফসল নষ্ট হয়। উপত্যকার একমাত্র সড়কও বন্ধ হয়ে যায়।

২৬ বছরের স্থানীয় বাসিন্দা আমির আসগর খানের কথায়, “আগে সবাই জানত কখন তুষারপাত হবে, কখন চাষ করতে হবে। এখন কিছুই আর নিশ্চিত নয়। প্রতি বছর বৃষ্টি আরও তীব্র হচ্ছে।”

তাঁর আশঙ্কা, ঘন ঘন মেঘভাঙা বৃষ্টি তাঁদের জীবিকাকেই ক্রমশ বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

জলবায়ু বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে পাহাড়ের জীবন

ভারী বৃষ্টিতে লাদাখ এবং পাকিস্তান-শাসিত গিলগিট-বালতিস্তানেও ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে। ফলে গোটা পশ্চিম হিমালয়জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পশ্চিম হিমালয়ে অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। খাড়া পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে এই ধরনের প্রবল বৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে বন্যা ও ভূমিধস ডেকে আনতে পারে।

ফলে আগে থেকেই ভৌগোলিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি জনপদগুলি আরও বিপন্ন হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন তাদের পুরনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেও আরও প্রকট করে তুলছে।

আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিমডি)-র মতে, পশ্চিম হিমালয়ে এখন ঘন ঘন এমন চরম বর্ষণ হচ্ছে, যা মেঘভাঙা বৃষ্টি, বন্যা এবং ভূমিধসের পরিস্থিতি তৈরি করছে।

অন্যদিকে দ্রুত হিমবাহ গলতে থাকায় আগামী কয়েক দশকে প্রথমে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তার পরেই দেখা দিতে পারে আরও বড় জলসংকট।

অর্থাৎ পাহাড়ি মানুষকে সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে এক অদ্ভুত দ্বিমুখী বিপদের—কখনও অতিরিক্ত জল, কখনও জলের তীব্র অভাব।

আইসিমডির এক বিশেষজ্ঞের কথায়, অভিযোজনের পরিকল্পনাতেও তাই দুই সমস্যাকেই একসঙ্গে মাথায় রাখতে হবে।

শুধু ত্রাণ নয়, বদলাতে হবে প্রস্তুতিও

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপর্যয় মোকাবিলায় এখনই কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—স্থানীয় স্তরে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, উচ্চভূমিতে আরও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তৈরি, ক্ষতিগ্রস্ত জলাধার ও পাহাড়ি জলধারা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে রাস্তা ও অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণ।

জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখের আদিবাসী সমাজ নিয়ে গবেষণা করা সমাজবিজ্ঞানী ড. সুহেল রসুল মিরের মতে, গুজ্জর, বকরওয়াল এবং দার্দ-শিনের মতো পশুপালক সম্প্রদায়ই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার।

কারণ তাঁদের জীবন সরাসরি বন, নদী, চরাঞ্চল এবং মৌসুমি যাযাবর জীবনের সঙ্গে যুক্ত।

“এগুলি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়,” তিনি বলেন। “জলবায়ুর চরম পরিবর্তন যত বাড়ছে, তারা শুধু বাড়িঘর বা গবাদি পশু হারাচ্ছে না। হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত পরিবেশজ্ঞান এবং ঐতিহ্যবাহী জীবনধারাও।”

মুররায় অপেক্ষা এখনও শেষ হয়নি

ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে লতিফের এখন আর হারানোর মতো কিছু নেই। বাড়ি নেই। ছেলে এখনও নিখোঁজ।

আছে শুধু অপেক্ষা।

“আমি শুধু ওদের খুঁজে পেতে চাই,” তিনি বলেন। “তারপর সবাইকে একসঙ্গে কবর দিতে পারব।”

পির পাঞ্জালের পাহাড়ে বৃষ্টি থামলেও মুররার মানুষের কাছে সেই রাতের আতঙ্ক এখনও থামেনি। আর ধ্বংসস্তূপের নীচে শুধু কয়েকটি প্রাণের সন্ধানই নয়—সম্ভবত চাপা পড়ে আছে একটি পাহাড়ি জীবনের পুরনো, পরিচিত ছন্দও।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles