যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের কূটনৈতিক সম্পর্কে ফের বড় ধাক্কা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত মারিয়া লুইজা রিবেইরো ভিওত্তির ভিসা বাতিল করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ব্রাজিলের পাল্টা পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত।
ব্রাজিল সরকার ট্রাম্প মনোনীত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিয়োগে এখনও সম্মতি দেয়নি। পাশাপাশি গত মাসে দুই মার্কিন কূটনীতিককেও ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল ব্রাসিলিয়া। সব মিলিয়ে ট্রাম্প ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
‘বহিষ্কার করা হয়নি’, দাবি ওয়াশিংটনের
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর স্পষ্ট করেছে, ভিওত্তিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। তবে ব্রাজিল যদি ট্রাম্পের মনোনীত রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল পেরেজের নিয়োগ অনুমোদন না করে, তাহলে আরও কূটনৈতিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে।
পেরেজ ফ্লোরিডার রিপাবলিকান নেতা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক মুখপাত্রের বক্তব্য, ব্রাজিলকে সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য কয়েক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্রাসিলিয়া বারবার বিষয়টি পিছিয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের ভাষায়, এটি ‘রেসিপ্রোকাল’ বা পারস্পরিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ, ভিওত্তি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে গেলে তাঁকে ফের দেশে ঢুকতে নতুন করে ভিসার আবেদন করতে হবে।
ব্রাসিলিয়ার অভিযোগ, ‘বৈরী পদক্ষেপের অংশ’
ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেছে লুলা সরকার। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের দফতরের বক্তব্য, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আদর্শগত কারণেই ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে বৈরী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ব্রাসিলিয়ার আরও অভিযোগ, কূটনৈতিক রীতি লঙ্ঘন করে ব্রাজিলের সম্মতি পাওয়ার আগেই ড্যানিয়েল পেরেজের নাম রাষ্ট্রদূত হিসেবে ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন।
ব্রাজিলের দাবি, পেরেজের মনোনয়ন নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। আগামী ৪ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটের আগে এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবশ্য পাল্টা বক্তব্য স্পষ্ট—মার্কিন প্রেসিডেন্ট কাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করবেন, সেই সিদ্ধান্তে অন্য কোনও দেশের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।
ভোট ব্যবস্থা নিয়েও মুখোমুখি দুই দেশ
কূটনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত আরও আগে। গত মাসে ব্রাজিল মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রমবিষয়ক সহকারী সচিব রাইলি বার্নস এবং তাঁর এক সহকর্মীকে ভিসা দিতে অস্বীকার করে।
২৭ থেকে ৩০ জুলাই ব্রাজিল সফরের কথা ছিল তাঁদের। নির্বাচন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা ছিল।
ওয়াশিংটনের দাবি, এটি ছিল স্বাভাবিক কূটনৈতিক সফর। কিন্তু ব্রাসিলিয়ার অভিযোগ, সফরের আসল উদ্দেশ্য ছিল ব্রাজিলের ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা।
সেই কারণেই ভিসা আটকে দেয় লুলা সরকার।
বলসোনারো ইস্যুতেও বাড়ছে উত্তাপ
এই বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো এবং তাঁর সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে কোনও প্রমাণ ছাড়াই ব্রাজিলের ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় কারচুপির অভিযোগ তুলে আসছেন।
২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বলসোনারো দোষী সাব্যস্ত হন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষিত হন।
এখন পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। ৮০ বছর বয়সি লুলা ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন। তাঁর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো—জইর বলসোনারোর ছেলে এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত।
ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে ব্রাজিলের আসন্ন নির্বাচনও জড়িয়ে পড়েছে।
শুল্কের চাপেও সম্পর্ক তিক্ত
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিরোধও ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন হাজার হাজার ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ব্রাজিল অন্যায্য বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে এবং জোরপূর্বক শ্রম রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
লুলা সরকার অবশ্য এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে। ব্রাসিলিয়ার দাবি, এর পিছনে আসলে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা রয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম মাদক পাচারকারী সংগঠনকে বিদেশি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেই সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করেছে লুলা সরকার।
সংঘাত বাড়লেও দরজা খোলা রাখছে ওয়াশিংটন
তবে সম্পর্কের অবনতি সত্ত্বেও কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, তারা ব্রাজিলের সঙ্গে ফের স্বাভাবিক, স্বচ্ছ এবং গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।
কিন্তু তার আগে ভিসা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, নির্বাচন, শুল্ক এবং বলসোনারো-ইস্যুতে জমে থাকা বিরোধের বরফ গলাতে হবে। আপাতত যা পরিস্থিতি, তাতে ট্রাম্প–লুলা সংঘাতের পরবর্তী পর্ব আরও উত্তপ্ত হওয়ারই ইঙ্গিত মিলছে।