হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা ঘিরে ইরানের অন্দরে যখন রাজনৈতিক টানাপোড়েন তুঙ্গে, তখনই নিজের পদত্যাগের জল্পনায় জল ঢাললেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তাঁর স্পষ্ট বার্তা—পদ ছাড়ছেন না, বরং নিজের অবস্থানেই অনড় থাকছেন।
অন্যদিকে ইরানের কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাকে ‘নিষ্ফল’ বলে খারিজ করেছে। ফলে হরমুজ নিয়ে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা যত এগোচ্ছে, ততই ইরানের ক্ষমতার অন্দরমহলের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসছে।
‘পদত্যাগ করছি না’
দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে তিনি তা আনুষ্ঠানিকভাবেই ঘোষণা করবেন। তাঁর কথায়, তিনি পদত্যাগ করছেন না এবং নিজের অবস্থান থেকে সরে আসারও কোনও প্রশ্ন নেই।
এর আগে ইরানের একাধিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে কট্টরপন্থীদের বাধার মুখে পেজেশকিয়ান একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
এই দাবি সামনে আনেন মোহাম্মদ বাঘের খারাজি, যিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের আত্মীয়। তাঁর অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে পেজেশকিয়ান নিজেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন মনে করছিলেন।
খারাজির আরও দাবি, পেজেশকিয়ান বারবার পদত্যাগের হুমকি দেওয়ায় মোজতবা খামেনেই তাঁকে সতর্ক করেছিলেন—পরের বার পদত্যাগপত্র দিলে তা গ্রহণ করা হবে।
তবে খামেনেইয়ের দপ্তর মঙ্গলবার এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
সেনাবাহিনীর সঙ্গেও ‘পূর্ণ সমন্বয়’
সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান নিজের সরকারের সঙ্গে ইরানের সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নিয়েও মুখ খোলেন। তাঁর দাবি, সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর পূর্ণ সমন্বয় রয়েছে।
জানুয়ারির বিক্ষোভে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যুর যে দাবি ছড়িয়েছে, তারও কোনও প্রমাণ এখনও কেউ দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাক্ষাৎকারের পিছনে পেজেশকিয়ানের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে—কট্টরপন্থীদের অভিযোগ খণ্ডন করা এবং দেখানো যে সমঝোতা ও ঐকমত্যের রাজনীতি দুর্বলতার প্রতীক নয়।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেহদি তাবাতাবাইও পদত্যাগের গুঞ্জনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া’ বলে দাবি করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর অভিযোগ, কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক জনরায় মেনে নিতে না পেরে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং এভাবে তারা ইরানের শত্রুদের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
সংস্কারপন্থী সাংবাদিক আহমদ জেইদাবাদিও সতর্ক করেছেন, এ ধরনের গুজব দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
হরমুজ চুক্তিতেই আসল সংঘাত?
তবে পদত্যাগের জল্পনার আড়ালে আরও বড় সংঘাতটি সম্ভবত হরমুজ প্রণালী নিয়ে সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান সমঝোতা।
রবিবার পেজেশকিয়ান জানান, জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তৈরি হওয়া সমঝোতা স্মারক ভবিষ্যতে ইরানের বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর বক্তব্য, ইরানকে এমন কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে যাতে প্রতিপক্ষও স্বাক্ষরিত চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য হয়।
কিন্তু পেজেশকিয়ানের এই অবস্থানের সঙ্গে যে ইরানের কট্টরপন্থী শিবিরের বড় অংশ একমত নয়, তা স্পষ্ট হয়ে যায় পরের দিনই।
সোমবার কট্টরপন্থীদের প্রভাবাধীন অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও সমঝোতার আশা ‘নিষ্ফল’। শান্তির নামে আত্মসমর্পণের যে কোনও প্রচেষ্টাকে তারা ‘অমার্জনীয় বিশ্বাসঘাতকতা’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।
তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা মানে মরীচিকার পেছনে ছোটা।
মোজতবা খামেনেইও কি চাপে?
ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইও।
নীতিগতভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিরোধী। কিন্তু পেজেশকিয়ানের অনুরোধে আলোচনার পথ খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই জানা যায়।
এখন হরমুজ প্রণালী নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার সম্ভাবনা যত এগোচ্ছে, ততই ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরের পুরনো মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসছে।
একদিকে পেজেশকিয়ান চাইছেন কূটনীতির মাধ্যমে সমঝোতার রাস্তা খোলা রাখতে। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা মনে করছে, আমেরিকার সঙ্গে যে কোনও আপসই আত্মসমর্পণের নামান্তর।
ফলে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাটি এখন শুধু ইরান-আমেরিকার কূটনৈতিক দরকষাকষি নয়—ইরানের ক্ষমতার অন্দরেও এটি হয়ে উঠেছে এক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।