হাইলাইটস:
- প্যারিস থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরের ঐতিহাসিক ফন্তেনব্লো অরণ্যে ভয়াবহ দাবানল।
- ইতিমধ্যেই প্রায় ৮০০ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, সরানো হয়েছে প্রায় ৯০০টি বাড়ির বাসিন্দাদের।
- আগুন নেভাতে দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে বিশেষ অগ্নিনির্বাপক বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে—প্যারিস অঞ্চলে যা নজিরবিহীন।
- প্রায় ১০টি পৃথক স্থান থেকে আগুন লাগায় পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা।
- একই সময়ে স্পেনে দাবানলে মৃত বেড়ে ১৩, প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সতর্কবার্তা—”জলবায়ু সংকট প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।”
নিজস্ব প্রতিবেদন: ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত ঐতিহাসিক ফন্তেনব্লো অরণ্যে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে রীতিমতো লড়াই চালাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে বিশেষ অগ্নিনির্বাপক বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠাতে হয়েছে—প্যারিস অঞ্চলের ইতিহাসে যা প্রথম।
রবিবার বিকেলে শুরু হওয়া আগুন ইতিমধ্যেই প্রায় ৮০০ হেক্টর বনভূমি গ্রাস করেছে। রাজধানী থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে এত বড় দাবানল অত্যন্ত বিরল বলে জানিয়েছে ফরাসি প্রশাসন।
সোমবার বিকেল পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। সেন-এ-মার্ন অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান পিয়ের ওরি জানান, দাবানল এখনও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাপপ্রবাহের জেরে প্যারিস অঞ্চল এখনও সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
ফন্তেনব্লোর মেয়র জুলিয়েন গঁদার বলেন, “এমন দৃশ্য আমরা আগে কখনও দেখিনি। এই ঐতিহাসিক বনভূমি এখন নজিরবিহীন সংকটের মুখে।”
দমকল বাহিনীর আশঙ্কা, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানান, আপাতত আগুনের বিস্তার ঠেকানোই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। প্রায় ৯০০টি বাড়ির বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনও বাড়ি পুড়ে যাওয়া বা হতাহতের খবর নেই।
তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে একটি বিষয়। রবিবার বিকেলের শেষ দিকে প্রায় ১০টি পৃথক জায়গা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ফলে পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরে ফ্রান্সে ইতিমধ্যেই ৩২ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা দাবানলে পুড়েছে, যা গত বছরের মোট ক্ষয়ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার পর দাবানল লাগানোর অভিযোগে ইতিমধ্যেই ৪৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
দাবানলের প্রভাব পড়েছে পরিবহণেও। প্যারিসের গার দ্য লিয়ঁ স্টেশন থেকে ছাড়া ও সেখানে পৌঁছনো দ্রুতগতির ট্রেনের পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক ট্রেন আট ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে চলেছে। যদিও সোমবার সকাল থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
প্রায় ৪০০ জন দমকলকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। তাঁদের সহায়তায় দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে পাঠানো হয়েছে বিশেষ অগ্নিনির্বাপক বিমান, দুটি হেলিকপ্টার এবং একটি নজরদারি বিমান। ফরাসি দমকল বাহিনীর মুখপাত্র এরিক ব্রোকার্দি বলেন, “প্যারিস অঞ্চলে আগুন নেভাতে দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে এভাবে বিমান পাঠানোর ঘটনা এই প্রথম। আমাদের প্রধান লক্ষ্য মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা।”
এদিকে একই সময়ে স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলেও দাবানলের ভয়াবহতা বাড়ছে। মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩, এখনও নিখোঁজ ১০ জন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পাঁচজন ব্রিটিশ, তিনজন বেলজিয়ান, একজন ফরাসি এবং একজন স্পেনীয় নাগরিক।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, “জলবায়ু সংকট সত্যিই প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। শুধু আগুন লাগার পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না, আগাম প্রস্তুতি ও প্রতিরোধই এখন সবচেয়ে জরুরি।”
বিশ্ব আবহাওয়া বিশ্লেষক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন-এর বিজ্ঞানীদের মতে, চলতি বছরের জুনে ইউরোপে দেখা দেওয়া চরম তাপপ্রবাহ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া কার্যত সম্ভব ছিল না। তাঁদের সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।