হাইলাইটস:

  • দিল্লি হাই কোর্ট নিউজক্লিক ও তার প্রতিষ্ঠাতা প্রবীর পুরকায়স্থের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা (EOW)-র এফআইআর এবং ইডির (ED) ইসিআইআর (ECIR) খারিজ করে দিয়েছে।
  • আদালত বলেছে, অভিযোগগুলো সত্য ধরে নিলেও ভারতীয় দণ্ডবিধির প্রতারণা (420) বা বিশ্বাসভঙ্গের (406) অপরাধ গঠিত হয় না।
  • বিচারপতি নীনা বনসাল কৃষ্ণা এই মামলাকে “আইনের প্রক্রিয়ার চরম অপব্যবহার” বলে মন্তব্য করেছেন।
  • রায়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে।

কী ছিল মামলার পটভূমি?

২০২০ সালে দিল্লি পুলিশের ইকনমিক অফেন্সেস উইং (EOW) নিউজ পোর্টাল নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের করে। অভিযোগ ছিল, বিদেশি বিনিয়োগ ও বিদেশি অর্থায়নের নিয়ম লঙ্ঘন করে সংস্থাটি অর্থ গ্রহণ করেছে এবং সেই অর্থের ব্যবহারে প্রতারণা ও অনিয়ম হয়েছে। সেই এফআইআরকে ভিত্তি করেই পরে ইডি অর্থপাচার আইনের অধীনে তদন্ত শুরু করে এবং ইসিআইআর নথিভুক্ত করে।

এই মামলাটি সেই বহুল আলোচিত ইউএপিএ (UAPA) মামলার থেকে আলাদা। ইউএপিএ মামলায় ২০২৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রবীর পুরকায়স্থের গ্রেপ্তারকে বেআইনি ঘোষণা করে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিল।

আদালত কী বলেছে?

দিল্লি হাই কোর্টের মূল বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আদালত বলেছে, এফআইআরে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলি সম্পূর্ণ সত্য বলেও ধরে নিলে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা) এবং ৪০৬ (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ)-এর অপরিহার্য উপাদান উপস্থিত নেই। অর্থাৎ অভিযোগের ভিত্তিতেই অপরাধের কাঠামো দাঁড়াচ্ছে না।

আরও কঠোর ভাষায় আদালত মন্তব্য করেছে যে এই মামলা চালিয়ে যাওয়া “gross abuse of the process of law”—অর্থাৎ আইনের প্রক্রিয়ার চরম অপব্যবহার।

কেন ইডির মামলাও খারিজ হয়ে গেল?

ভারতের অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন (PMLA)-এর কাঠামো অনুযায়ী ইডির মামলা সাধারণত একটি “predicate offence” বা মূল অপরাধের উপর নির্ভরশীল।

যদি মূল এফআইআর-ই টিকতে না পারে, তাহলে তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অর্থপাচারের মামলাও টিকে থাকা কঠিন।

দিল্লি হাই কোর্ট সেই যুক্তিই গ্রহণ করেছে। আদালত বলেছে, যেহেতু মূল এফআইআর বাতিল করা হয়েছে, তাই ইডির ইসিআইআরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে যায়।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ

রায়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ সম্ভবত এখানেই।

বিচারপতি নীনা বনসাল কৃষ্ণা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে এই ধরনের ফৌজদারি প্রক্রিয়া কেবল আইনের অপব্যবহারই নয়, বরং আবেদনকারীদের “স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার” উপর আঘাত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

এই মন্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।

আদালত সরাসরি বলেনি যে সরকার সংবাদমাধ্যমকে দমন করতে চেয়েছে। কিন্তু আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তদন্তকারী সংস্থাগুলির ক্ষমতা সীমাহীন নয় এবং সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার ক্ষেত্রে আইনি ভিত্তি অত্যন্ত শক্ত হতে হবে।

এই রায়ের আইনি তাৎপর্য

এই রায় তিনটি বড় বার্তা দিচ্ছে।

প্রথমত, কোনও ব্যবসায়িক বা নিয়ন্ত্রক (regulatory) বিরোধকে সবসময় ফৌজদারি অপরাধে রূপান্তর করা যায় না। বিদেশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনও প্রশ্ন থাকলেই তা প্রতারণা হয়ে যায় না।

দ্বিতীয়ত, তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে দেখাতে হবে যে অপরাধের মৌলিক উপাদান বাস্তবিকই বিদ্যমান। শুধুমাত্র সন্দেহ বা অভিযোগ যথেষ্ট নয়।

তৃতীয়ত, আদালত আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে ফৌজদারি আইনকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক তাৎপর্য

এই রায়কে শুধু নিউজক্লিকের জয় বা সরকারের পরাজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আসলে এটি রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক হস্তক্ষেপ।

গত কয়েক বছরে সংবাদমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিরোধী মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, তদন্ত প্রক্রিয়াই অনেক সময় শাস্তিতে পরিণত হচ্ছে।

দিল্লি হাই কোর্টের এই রায় সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিল। আদালত কার্যত বলেছে যে ফৌজদারি তদন্তেরও সাংবিধানিক সীমারেখা আছে এবং সেই সীমা অতিক্রম করলে আদালত হস্তক্ষেপ করবে।

সামনে কী?

তাত্ত্বিকভাবে তদন্তকারী সংস্থাগুলি সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। ফলে আইনি লড়াই এখানেই পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে, এমন বলা যাবে না।

তবে আপাতত নিউজক্লিক ও প্রবীর পুরকায়স্থের জন্য এটি একটি বড় আইনি জয়। একই সঙ্গে এই রায় ভবিষ্যতের বহু মামলায় উদ্ধৃত হতে পারে, বিশেষত যেখানে নিয়ন্ত্রক বা প্রশাসনিক অভিযোগকে ফৌজদারি মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে।

উপসংহার

দিল্লি হাই কোর্টের এই রায় শুধু একটি এফআইআর বাতিলের ঘটনা নয়। এটি বিচারব্যবস্থার তরফে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—রাষ্ট্রের তদন্ত ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তার ব্যবহার আইনের সীমার মধ্যেই হতে হবে। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অপরাধের আইনি উপাদান না থাকলে ফৌজদারি মামলা টিকতে পারে না। আর সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে সেই নীতি আরও বেশি গুরুত্ব পায়, কারণ বিষয়টি সরাসরি গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।