পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২০২৩ সালের অগস্ট থেকে কারাবন্দি। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ, সরকারি উপহার বিক্রি, বেআইনি বিবাহ এবং সন্ত্রাসবাদ-সহ একশোরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে বলে তাঁর দাবি। একাধিক মামলায় দণ্ডিত হলেও কয়েকটি সাজা ইতিমধ্যে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। কিন্তু অন্তত দু’টি বড় দুর্নীতি মামলার সাজা এবং ২০২৩ সালের ৯ মে-র হিংসা সংক্রান্ত বিচার তাঁকে কারাগারে রাখার প্রধান আইনি ভিত্তি হয়ে রয়েছে।

আল-কাদির ট্রাস্ট মামলা

ইমরানের মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা ১৯ কোটি পাউন্ড বা আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসলামাবাদের একটি দায়বদ্ধতা আদালত ইমরানকে ১৪ বছরের এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়।

পাকিস্তানের জাতীয় দায়বদ্ধতা দপ্তরের অভিযোগ, ইমরানের সরকার ব্রিটেন থেকে ফেরত পাওয়া ১৯ কোটি পাউন্ড সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আবাসন ব্যবসায়ী মালিক রিয়াজের জরিমানা মেটাতে ব্যবহার করেছিল। বিনিময়ে ইমরান ও বুশরার প্রতিষ্ঠিত আল-কাদির ট্রাস্ট বহুমূল্য জমি পেয়েছিল। সেই জমির মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি পাকিস্তানি টাকা বলে তদন্তকারীদের দাবি।

ইমরান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ট্রাস্টের মালিক নন, কেবল অছি; ওই লেনদেন থেকে তাঁর পরিবার ব্যক্তিগত ভাবে লাভবান হয়নি। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ হাই কোর্টে আবেদন বিচারাধীন। শুনানিতে বারবার বিলম্বের অভিযোগ করেছে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ। এই সাজা স্থগিত বা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত অন্য মামলায় জামিন পেলেও তাঁর মুক্তি সম্ভব নয়।

তোশাখানা বা সরকারি উপহার মামলা

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের কাছ থেকে পাওয়া দামি ঘড়ি, অলঙ্কার ও অন্যান্য উপহার কম দামে সরকারি ভান্ডার থেকে কিনে বেশি দামে বিক্রি এবং সেই আয়ের তথ্য গোপন করার অভিযোগ ওঠে ইমরানের বিরুদ্ধে।

প্রথম তোশাখানা মামলায় ২০২৩ সালে তাঁর তিন বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। পরে সেই সাজা স্থগিত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পৃথক দুর্নীতি মামলায় ইমরান ও বুশরাকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সেই দণ্ডও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে।

কিন্তু দ্বিতীয় তোশাখানা মামলায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইমরান ও বুশরাকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ, সৌদি যুবরাজের দেওয়া বহুমূল্য বুলগারি অলঙ্কারসামগ্রী প্রকৃত মূল্যের সামান্য অংশ দিয়ে কেনা হয়েছিল। এই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধেও ইসলামাবাদ হাই কোর্টে আপিল ও সাজা স্থগিতের আবেদন করা হয়েছে। ফলে আল-কাদির মামলায় স্বস্তি পেলেও দ্বিতীয় তোশাখানা মামলাটি মুক্তির পথে আলাদা বাধা হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রীয় গোপন নথি বা সাইফার মামলা

ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের পাঠানো একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তার বিষয়বস্তু তিনি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছিলেন। ইমরান দাবি করেন, ওই বার্তা তাঁর সরকারকে উৎখাতের বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ। আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

২০২৪ সালে বিশেষ আদালত এই মামলায় তাঁকে দশ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত দণ্ডাদেশ বাতিল করে। ফলে বর্তমানে এই মামলা তাঁর কারাবাসের প্রধান কারণ নয়।

‘ইদ্দত’ বা বেআইনি বিবাহ মামলা

বুশরা বিবি আগের স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ইসলামি বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত অপেক্ষার সময় শেষ হওয়ার আগেই ইমরানকে বিয়ে করেছিলেন—এই অভিযোগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দু’জনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জুলাইয়ে একটি আদালত তাঁদের খালাস দেয়। এই মামলাতেও বর্তমানে কোনও কার্যকর সাজা নেই।

৯ মে-র হিংসা ও সন্ত্রাসবিরোধী মামলা

২০২৩ সালের ৯ মে আল-কাদির মামলায় ইমরান গ্রেফতার হওয়ার পরে পাকিস্তানজুড়ে হিংসা ছড়িয়েছিল। সেনা সদর দপ্তর, লাহোরের কোর কমান্ডারের বাসভবন এবং অন্য সরকারি ও সামরিক প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। ওই হিংসায় প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ইমরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলা চলছে। কয়েকটিতে জামিন মিললেও মূল বিচার এখনও শেষ হয়নি। তাঁর বহু সমর্থক ইতিমধ্যে সামরিক আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন।

এর পরে কী

ইমরানের আইনজীবীদের প্রথম লক্ষ্য আল-কাদির এবং দ্বিতীয় তোশাখানা মামলায় সাজা স্থগিত করানো। তাতে সাফল্য এলেও ৯ মে-র মামলাগুলিতে জামিন নিশ্চিত করতে হবে। সরকার প্রয়োজনে নতুন কোনও মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখাতে পারে—আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যেই তাঁর চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার নিয়ে নতুন আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বেসরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসকের উপস্থিতির নির্দেশ দিলেও তাঁকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারাগারে ফেরানো হয়েছে। আদালত অবমাননার আবেদন করার কথা জানিয়েছে পিটিআই। অতএব ইমরানের মুক্তি এখন একটি রায়ে নয়, পরস্পর জড়ানো কয়েকটি আপিল, জামিনের আবেদন এবং চলতি বিচারের ফলের উপর নির্ভর করছে। তাঁর মামলাগুলি তাই নিছক আইনি প্রশ্ন নয়—পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থা, সরকার, সেনাবাহিনী এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরোধী নেতার মধ্যে বৃহত্তর ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু।