মানুষকে আক্রমণ করলেই ‘মানুষখেকো’ নয়, কোন আচরণে বদলায় পরিচয়

যা জানা জরুরি
- বন্যপ্রাণীর আক্রমণে মানুষের মৃত্যু হলেই সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিকে ‘মানুষখেকো’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
- কিন্তু পরিবেশবিদদের মতে, একটি বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক বা কুমিরের হাতে মানুষের মৃত্যু এবং মানুষের মাংসের জন্য পরিকল্পিত শিকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।
- আক্রমণের পরিস্থিতি, কারণ এবং একই আচরণের পুনরাবৃত্তি বিচার না করে কোনও প্রাণীকে মানুষখেকো বলা উচিত নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বন্যপ্রাণীর আক্রমণে মানুষের মৃত্যু হলেই সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিকে ‘মানুষখেকো’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু পরিবেশবিদদের মতে, একটি বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক বা কুমিরের হাতে মানুষের মৃত্যু এবং মানুষের মাংসের জন্য পরিকল্পিত শিকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। আক্রমণের পরিস্থিতি, কারণ এবং একই আচরণের পুনরাবৃত্তি বিচার না করে কোনও প্রাণীকে মানুষখেকো বলা উচিত নয়।
বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও পরিবেশবিদ ইন্দ্রজিৎ ঘোরপাড়ে জানিয়েছেন, যে প্রাণী নিয়মিতভাবে মানুষকে খাদ্য হিসেবে শিকার করে, তার আচরণের একটি নির্দিষ্ট ছক তৈরি হয়—একমাত্র তাকেই প্রকৃত অর্থে মানুষখেকো বলা যায়। কোনও একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় মানুষ আক্রান্ত বা নিহত হলে সেই প্রাণী মানুষখেকো হয়ে যায় না।
বন্যপ্রাণীর আক্রমণের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। আচমকা মানুষের মুখোমুখি হয়ে প্রাণীটি ভয় পেতে পারে। নিজের জীবন, শাবক কিংবা বিচরণক্ষেত্র রক্ষার জন্যও সে আক্রমণ করতে পারে। খুব কাছ থেকে চমকে দেওয়া ভালুক, আত্মরক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়া চিতাবাঘ কিংবা নদীর ধারে কুমিরের আক্রমণ—প্রতিটি ঘটনাই বিপজ্জনক। কিন্তু এগুলি মানুষের মাংসের জন্য শিকার, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর পক্ষে যথেষ্ট নয়।
কোনও প্রাণীর আহত বা অসুস্থ হয়ে পড়া, বয়সের কারণে স্বাভাবিক শিকার ধরার ক্ষমতা হারানো কিংবা তার পরিচিত খাদ্যের অভাব মানুষের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হতে পারে। বন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে জনবসতির সঙ্গে বন্যপ্রাণীর যোগাযোগ বাড়ছে। ফলে সংঘাতও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এর বহুল আলোচিত উদাহরণ চম্পাবতের বাঘিনী। তার আক্রমণে কয়েকশো মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়। শিকারি ও সংরক্ষণবিদ জিম করবেট শেষ পর্যন্ত বাঘিনীটিকে হত্যা করেন। পরে দেখা যায়, তার উপর ও নীচের শ্বদন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে হরিণের মতো দ্রুতগামী স্বাভাবিক শিকার ধরা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তুলনায় ধীরগতির ও কম প্রতিরোধক্ষম মানুষকে সে খাদ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
আবার মানুষের মৃতদেহ খাওয়া এবং জীবিত মানুষকে খাদ্যের জন্য শিকার করাও এক নয়। কোনও মৃতদেহ খেয়ে ফেললেই প্রাণীটি জীবিত মানুষকে নিয়মিত শিকার করতে শুরু করেছে, এমন প্রমাণ হয় না।
ঘোরপাড়ের মতে, প্রতিটি সংঘাতের আলাদা করে অনুসন্ধান প্রয়োজন। আক্রমণটি আত্মরক্ষামূলক, আকস্মিক না কি খাদ্যের উদ্দেশ্যে ঘটেছে, তা নির্ণয় করতে হবে। একই প্রাণী বারবার মানুষকে অনুসরণ ও শিকার করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাণীটি জনবসতির পক্ষে ধারাবাহিক বিপদ হয়ে উঠলে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। তবে হত্যা হওয়া উচিত একেবারে শেষ ব্যবস্থা। কারণ ভুলভাবে ‘মানুষখেকো’ তকমা দিলে একটি বন্যপ্রাণীর প্রাণহানি যেমন ঘটে, তেমনই মানুষের অনুপ্রবেশ, শিকারের ঘাটতি ও আবাসস্থল ধ্বংসের মতো সংঘাতের প্রকৃত কারণগুলি আড়ালেই থেকে যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



