রাতের সংঘর্ষ রাজপথে, ডিম-বোতল ছোড়াছুড়ি ও পতাকায় আগুনে রণক্ষেত্র যাদবপুর

যা জানা জরুরি
- নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে বুধবার গভীর রাতে শুরু হওয়া ছাত্র সংঘর্ষ বৃহস্পতিবার ছড়িয়ে পড়ল ক্যাম্পাসের বাইরেও।
- অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মিছিল-পাল্টা মিছিল ঘিরে যাদবপুর থানা ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়।
- ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পুলিশকে লক্ষ্য করে ডিম ও জলের বোতল ছোড়া, সংগঠনের পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া এবং ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে বুধবার গভীর রাতে শুরু হওয়া ছাত্র সংঘর্ষ বৃহস্পতিবার ছড়িয়ে পড়ল ক্যাম্পাসের বাইরেও। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মিছিল-পাল্টা মিছিল ঘিরে যাদবপুর থানা ও বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পুলিশকে লক্ষ্য করে ডিম ও জলের বোতল ছোড়া, সংগঠনের পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া এবং ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সকে লাঠি উঁচিয়ে বিক্ষোভকারীদের তাড়া করতে হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। গোটা ঘটনার নিন্দা করে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য।
অশান্তির সূত্রপাত বুধবার রাতে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র সংসদ ফেটসু-র একটি সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। তা সত্ত্বেও কোন এক্তিয়ারে সাধারণ সভা ডাকা হয়েছে, সেই প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি। সংগঠনের কয়েকজন সদস্য সভাস্থলে গিয়ে আপত্তি জানানোর পরেই বচসা শুরু হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তা হাতাহাতিতে গড়ায়।
এবিভিপির অভিযোগ, সাধারণ সভার নামে তাদের সদস্যদের পরিকল্পিত ভাবে ডেকে এনে ঘিরে মারধর করা হয়। সংগঠনের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নিখিল রায়-সহ কয়েকজন আক্রান্ত হন। এবিভিপির আরও দাবি, তাদের কয়েকজন সদস্যকে জাতপাত তুলে অপমান করা হয়েছে। আহতদের কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে তাঁদের দেখতে যান যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। তাঁর প্রশ্ন, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকলে সাধারণ সভা ডাকার বৈধতা কোথায়?
ফেটসু এবং বামপন্থী সংগঠনগুলি সম্পূর্ণ বিপরীত বিবরণ দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রথমে সভা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবিভিপির সদস্যেরা। পরে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে যাদবপুর থানা ও সংলগ্ন এলাকায় জমায়েত করা বিজেপি-এবিভিপি সমর্থকদের একটি বড় দল চার নম্বর ফটকের দিকে এগোয়। বন্ধ ফটক ঠেলে তারা ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ। এর পর বাম ছাত্র সংগঠনগুলির পতাকা, পোস্টার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং কয়েকটিতে আগুন ধরানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তিও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
সিপিএম নেতা এবং এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য দাবি করেন, প্রথম বচসার সময় এসএফআই সেখানে ছিল না। ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রদের সভা ঘিরেই বিরোধের সূত্রপাত। পরে বিজেপি ও এবিভিপি বহিরাগতদের এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালায় বলে তাঁর অভিযোগ। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, কয়েকজন পড়ুয়া একটি ভবনের ভিতরে আটকে পড়েছিলেন। বাইরে তখন ইট-পাথর ছোড়া, আগুন জ্বালানো এবং দরজা ভাঙার চেষ্টা চলছিল।
অন্য দিকে এবিভিপি অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, বামপন্থী সংগঠনের ৭০ থেকে ৮০ জন সদস্য তাদের অল্প কয়েকজন কর্মীকে আক্রমণ করেছিলেন। আত্মরক্ষার জন্যই তারা প্রতিরোধ করে। দু’পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আনার অভিযোগ তুলেছে। সংঘর্ষে উভয় শিবিরের কয়েকজন আহত হলেও মোট আহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
রাতে জরুরি পরিষেবার নম্বরে ফোন এবং সহ-উপাচার্যের অনুরোধ পাওয়ার পরে পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। দীর্ঘক্ষণ চেষ্টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কিন্তু বুধবার রাতের সংঘর্ষের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দুই শিবির পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করায় ফের উত্তেজনা বাড়ে। এবিভিপি ‘যাদবপুর চলো’ কর্মসূচির ডাক দেয়। তাদের কর্মী-সমর্থকেরা গোলপার্কের দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে মিছিল শুরু করেন। পাল্টা বাম ছাত্র সংগঠনগুলি এইট বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে জমায়েত করে।
দু’টি মিছিলকে মুখোমুখি হতে না দেওয়ার জন্য যাদবপুর থানা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফটক, এইট বি বাসস্ট্যান্ড এবং ঢাকুরিয়া সেতু-সহ একাধিক জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়। মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশবাহিনী ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স। তা সত্ত্বেও কয়েক দফায় ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা হয়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হলে ডিম ও জলের বোতল ছোড়া হয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকেরা পরস্পরের সংগঠনের পতাকা ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেন বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের তাড়া করে সরিয়ে দেয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এবিভিপি সমর্থকদের একাংশ ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফটকে লাগানো কাঠের প্রতীকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, কয়েকজন বহিরাগত প্রতীকের উপর পা দেওয়ায় পদ্মপাপড়ির আদলে তৈরি বাইরের অংশটি খুলে পড়ে যায়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাক্তনীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। অভিযোগকারী অরিত্র সরকার এবিভিপি সমর্থক বলে জানা গিয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারার পাশাপাশি তফসিলি জাতি ও জনজাতির উপর অত্যাচার প্রতিরোধ আইনেও অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে। হামলা, বেআইনি জমায়েত, হুমকি এবং জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয় বলে পুলিশ সূত্রের বক্তব্য।
বুধবারের ঘটনাকে একটি পুরনো মামলার সঙ্গে যুক্ত করে জরুরি শুনানির জন্য কলকাতা হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ না করে নতুন মামলা দায়ের করার পরামর্শ দিয়েছে।
উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের নিন্দা করে জানিয়েছেন, ঘটনাক্রম জানতে বিশ্ববিদ্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, নজরদারি ক্যামেরার ছবি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতিবেদন খতিয়ে দেখা হবে। কারা বাইরে থেকে ক্যাম্পাসে ঢুকেছিল এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায় ব্যর্থ হল, তা-ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন থাকলেও উত্তেজনা কাটেনি। বুধবারের সংঘর্ষ যে ভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পেরিয়ে ব্যস্ত রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে যাদবপুরের নিরাপত্তা, ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ—এই তিনটি প্রশ্ন ফের সামনে এসেছে। আপাতত প্রশাসনের প্রধান উদ্বেগ, নতুন কোনও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যাতে দুই শিবির ফের মুখোমুখি না হয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



